সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: ১৯৫৯ সালে কেরলে কমিউনিস্ট সরকারকে ফেলে দিয়ে যেভাবে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছিল তা একেবারেই গ্রহণযোগ্য় বলে মনে হয়নি ফিরোজ গান্ধীর। এই নিয়ে নিয়ে রীতিমতো ঝগড়া হয়েছিল স্বামী-স্ত্রী ফিরোজ এবং ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে। কথিত আছে ওই সময় ফিরোজ গান্ধী ইন্দিরাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় কেরলে যাতে কোনও ভাবেই কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় না আসতে পারে তারজন্য তখন ইন্দিরার সভাপতিত্বে থাকা কংগ্রেস মুসলিম লিগ সহ অন্যান্য বিতর্কিত দলের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট বাঁধে৷ যা দেখে একজন কংগ্রেস প্রতিনিধি হিসেবে ফিরোজ কংগ্রেসের এমন নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন৷ সেদিন আশংকা প্রকাশ করেছিলেন, ক্রমশ ধর্ম জাতি কংগ্রেসের আদর্শ কলুষিত করবে, দলটি হারাবে তাঁর গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা।

তখন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু হলেও ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি( এআইসিসি)-র সভাপতি৷ আর কেরলে ইএমএস সরকারে বিরুদ্ধে কোনও রকম পদক্ষেপ নিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দ্বিধান্বিত হলেও বরং একেবারে দৃঢ়চেতা ছিলেন কংগ্রেস সভানেত্রী৷ একেবারে স্বাধীনতার সময় থেকে কেরলে কমিউনিস্ট এবং মুসলিম লিগের ভালই অস্তিত্ব ছিল৷ ১৯৫৭ সালের নির্বাচনে কেরলের জনগণ কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়াকে ক্ষমতায় আনে৷ স্বাধীন ভারতে সেটাই ছিল কোনও রাজ্যের প্রথম কমিউনিস্ট শাসন৷ তবে সেবার কেরলে কোনও একক দল সংখ্যা গরিষ্ঠতা না পেলেও কমিউনিস্ট পার্টি আসনের দিক থেকে সর্ববৃহৎ দল হওয়ায় ডাকা হয়েছিল সরকার গড়তে ৷

১২৬ আসন বিশিষ্ট বিধানসভায় সি পি আই ১০১টি আসনে লড়ে ৬০টি আসন পেয়েছিল। একক বৃহত্তম দল হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৫টি নির্দল বিধায়কের সমর্থন নিতে হয় সরকার গড়ার জন্য। অন্যদিকে কংগ্রেস ১২৪টি আসনে লড়ে পেয়েছিল ৪৩টি আসন। তবে শতাংশের নিরিখে সি পি আই পেয়েছিল ৩৫ শতাংশ ভোট যা কংগ্রেসের থেকে ২ শতাংশ কম।

এরপর ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ মুখ্যমন্ত্রীতে যে সরকার গড়ে ওঠে তা ক্ষমতায় এসে একেবারে কমিউনিস্ট সুলভ আদর্শে কাজ শুরু করে দেয়৷ আগের সরকার ভূমি সংস্কারে প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতা এসে এই কমিউনিস্ট সরকার তা রূপায়ণে সক্রিয় হয়৷ স্বাধীনতার পর থেকে কেরলের ছাত্র ফেডারেশন শিক্ষক এবং ছাত্রদের বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে দাবি তোলে। কেরলে কমিউনিস্ট সরকার এসে সেই সব দাবি পুরনো উদ্যোগী হয়।

তাছাড়া ক্ষমতায় এসে ইএমএস সরকার নজর দেয় কৃষক ও শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে। কাজের নিরাপত্তা এবং ন্যূনতম বেতন বাড়ানো হয়। শিল্পে নজর দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ছোট ছোট শিল্পকে উৎসাহিত করা হয় এবং বেসরকারি পুঁজিকেও আহ্বান জানানো হয়। ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৯ সালের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ফ্যাক্টরি ইউনিট বেড়েছিল। ১৯৫৭ সালে ছিল ১৬১৩ ইউনিট সেখানে১৯৫৯ সালে হয় ২২৭৫ ইউনিট। আর্থ সামাজিক উন্নতি ঘটেছিল।

এই সময় কেরলের নাম্বুদিরিপাদ সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার আনতে ‘এডুকেশন বিল’ নিয়ে আসে৷ যার উদ্দেশ্য ছিল বেসরকারি পরিচালিত স্কুল কলেজগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা৷ আর তার জন্যই রুষ্ট হতে থাকে খ্রিস্টান চার্চ,মুসলিম লিগ, এবং নায়াররা- যাদের হাতে ছিল বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং তৎসংলগ্ন বহু জমি৷ ফলে এরাই মূলত ছিল রাজ্য সরকারের বিরোধিতায় প্রথম সারিতে৷ সেই ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দিল কমিউনিস্ট ধ্যানধারণা জনগণের জীবনযাত্রায় ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রবণতা৷ কারণ সেই সময় কিছু স্কুলে মহাত্মা গান্ধীর ছবি সরিয়ে দিয়ে মার্ক্স-লেনিন-স্টালিনের ছবি বসান শুরু হয়৷ ফলে ওই বিরোধিতার পরিধি বাড়ে এবং ক্রমশ তা ক্ষোভে রূপান্তরিত হতে থাকে৷ পাশাপাশি সেখানে তখন আওয়াজ ওঠে এই কমিউনিস্ট সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার৷

এদিকে পুরো ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুরও উদ্বেগ বাড়ে ৷ যদিও তিনি ওই মূহুর্তে একটা রাজ্যে ভোটে জেতা সরকার ফেলে দেওয়া উচিত মনে করেননি কারণ তা ছিল গণতন্ত্র বিরোধী ৷ ১৯৫৭ সালে নির্বাচনের পরে কেরলে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় এলে একদিক দিয়ে খুশিই হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী৷ কারণ একদিকে বিশ্বের কাছে বার্তা দেওয়া গিয়েছিল ভারতে প্রকৃত গণতন্ত্র রয়েছে তাই বিরোধী হলেও কমিউনিস্টরা একটা রাজ্য শাসন করতে পারছে ৷ অন্যদিকে এর মাধ্যমে বিশ্বের কমিউনিস্ট দেশগুলির কাছে বার্তা পাঠান গিয়েছিল এদেশ তাদের বন্ধু বলে৷

কিন্তু কেরলে সরকার ফেলার ব্যাপারে তাঁর বাবার মতো গণতন্ত্র সুরক্ষিত থাকছে কি থাকছে না এ নিয়ে কোনও রকম দ্বিধা ছিল না এআইসিসি সভাপতি প্রিয়দর্শিনীর৷ ফলে তিনি তৎকালীন কেরল সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠায় তখন তা কাজে লাগিয়ে সরকার ফেলার সুযোগ নিতে উদ্য়োগী হন৷ তিনি তখন কেরলে সাম্প্রদায়িক হিন্দু ও মুসলিম লিগের ক্ষোভকে আরও ইন্ধন জোগাতে তাঁর অনুগত রাজ্য কংগ্রেসের নেতাদের কাজে লাগান সরকার বিরোধিতায় ৷ সেই ক্ষোভ এমনই আকার নেয় যে পুলিসের গুলি চলে এবং মানুষের মৃত্যু হয়৷ রক্ত ঝরায় স্বভাবতই কমিউনিস্ট রাজ্য সরকারের দিকে আঙুল ওঠে৷ ওই পরিস্থিতিতে সরকার ফেলা নিয়ে নেহরুর দ্বিধা দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ইন্দিরা৷ যার জন্য তিনি ওই সময় তাঁর বাবাকে ‘দুর্বল’ এবং ‘সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন’ বলে মনে করছিলেন৷

অবশেষে ১৯৫৯ সালের ৩১ জুলাই সংবিধানের এই বিতর্কিত ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করে কেরলে কমিউনিস্ট সরকার ফেলে দেওয়া হয়েছিল৷ তবে এমন সিদ্ধান্তে স্বামী ফিরোজ যে ক্ষুব্ধ হয়েছেন তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন ‘এশিয়ার মুক্তি সূর্য’৷ এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাওয়ার আগেই তিনমূর্তি ভবনে প্রাতরাশের টেবিলে রীতিমতো উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছিল ইন্দিরা-ফিরোজের মধ্যে৷ সেদিন অগণতান্ত্রিক ভাবে সরকার ফেলার জন্য ফিরোজ ইন্দিরাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলেছিলেন৷

সেটা শুনে ক্ষুব্ধ ইন্দিরা রেগে টেবিল থেকে উঠে ঘরের বাইরে চলে যান৷ মেয়ে -জামাইয়ের মধ্যে এমন ঝগড়া দেখে বড় অসহায় বোধ করেছিলেন সেদিন নেহরু৷ শেষমেশ কেরলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হওয়ার কংগ্রেসের ভিতরের এই লড়াইয়ে হার হয়েছিলেন ঠিকই ফিরোজ গান্ধীর, তবুও তার পরেও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য তিনি তাঁর সংগ্রাম চালিয়ে যান৷ যদিও কেরলে যাতে কোনও ভাবেই কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় না আসতে পারে তার ব্যবস্থা করতে ইন্দিরার সভাপতিত্বে থাকা কংগ্রেস উঠে পড়ে লাগে। তখন সেখানে কমিউনিস্টদের আটকাতে মুসলিম লিগ সহ অন্যান্য বিতর্কিত দলের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট বাঁধে৷ যা দেখে একজন কংগ্রেস প্রতিনিধি হিসেবে ফিরোজ কংগ্রেসের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন৷ আশংকা প্রকাশ করেন, ক্রমশ ধর্ম জাতি কংগ্রেসের আদর্শ কলুষিত করবে, দলটি হারাবে তাঁর গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা।

তথ্য ঋণ

১)Feroze the forgotten Gandhi :Bertil Falk

২)৬০-৭০এর ছাত্র আন্দোলন : শ্যামল চক্রবর্তী

৩) 60th anniversary of EMS’s govt, some lessons : Amrith Lal

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

করোনা পরিস্থিতির জন্য থিয়েটার জগতের অবস্থা কঠিন। আগামীর জন্য পরিকল্পনাটাই বা কী? জানাবেন মাসুম রেজা ও তূর্ণা দাশ।