সুমন ভট্টাচার্য: ডেনমার্কের সাড়া ফেলে দেওয়া সিরিজ বর্গেন সেদেশের টেলিভিশনে দেখানোর দেড় বছরের মাথায় ইউরোপের এই দেশ প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী পেয়েছিল| হেলা সেমেট|

তাহলে আমাজন প্রাইমের জনপ্রিয়তম সিরিজ ফ্যামিলি ম্যান সিজন টুতে একজন মহিলা প্রধানমন্ত্রীকে দেখানোর কতদিনের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লির কুর্সিতে বসবেন?

২ জুন ফ্যামিলি ম্যান সিজন ২ স্ট্রিমিং শুরু হওয়ার পর এইটা যেমন অন্যতম চর্চার বিষয়, তেমনই এই পপুলার ওয়েব সিরিজ গেরুয়া শিবিরের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে| এমনিতেই পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে দুরমুশ করার পর থেকে গোটা দেশের রাজনৈতিক চর্চায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সবসময় চর্চার মধ্যে রয়েছে,তারপরে এই ওয়েব সিরিজে একেবারে সরাসরি মহিলা প্রধানমন্ত্রী দেখানো?

ভক্তকুল এবং দিল্লির বিজেপি নেতৃত্ব যে এর পিছনে গভীরতম ষড়যন্ত্র দেখছেন এবং দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাজন প্রাইম আর এই সিরিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো শুরু হয়ে গিয়েছে, তার পিছনে অনেকগুলো কারণ আছে| প্রথমত, আমাজনের মালিক জেফ বেজোর সঙ্গে বিজেপির সরকারের সম্পর্ক অত্যন্ত তিক্ত| কারণ বেজো শুধু আমাজনের সিইও নন, তিনি আমেরিকার অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টের ও মালিক| ওয়াশিংটন পোস্ট দক্ষিণপন্থী রাজনীতির কট্টর সমালোচক,আর সেই সূত্রে তাঁর কাগজ প্রায়ই ভারতের বিষয় এলে বিজেপি সরকারকে বেঁধে| পাল্টা হিসেবে বিজেপি শুধু জেফ বেজোর সমালোচনা করেনি, ভারতে আমাজনের ব্যবসাতেও কাঁটা বিছিয়েছে|

সেই আমাজনের ওয়েব সিরিজে একজন মহিলা প্রধানমন্ত্রী? যে প্রধানমন্ত্রী আবার দেশের সুরক্ষায়, জঙ্গিদের মোকাবিলায় কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বিন্দুমাত্র দেরি করেন না? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রতিস্পর্ধী হিসেবে মহিলা প্রধানমন্ত্রীর যে নির্মাণ, ফ্যামিলি ম্যান টু যেভাবে নামে B দেখিয়ে দিয়েছে, তাকে গেরুয়া শিবির কিভাবে গলাঃধকরণ করবে? মনে করবে না যে এই সবই মোদীর সমালোচক বলে পরিচিত জেফ বেজোর আমাজনের ষড়যন্ত্র? আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তিকে একেবারে ঘরে ঘরে পৌছে দেওয়ার চেষ্টা?

তাহলে অতঃপর?

নিশ্চিন্ত থাকুন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়ের টুইট এল বলে| ওয়েব সিরিজের অপকারিতা এবং কেন ওয়েব সিরিজ বয়কট বা নিষিদ্ধ করে দেওয়া উচিত সেই বিষয়ে রাজনীতির এই বিদূষকের সুচিন্তিত অভিমত| আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে শায়েস্তা করতে আরো কড়া চিঠি তো বটেই, প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় বাহিনীও পাঠানো হতে পারে| সিবিআই,ইডি বা আয়কর এর সব অফিসারদের কাজ দেওয়া হবে তৃণমূলের নেতাদের জেলে ভরো| আর মুকুল রায়ের ঘর ওয়াপসি ঠেকাতে যদি তাঁর অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে হাসপাতালের ছাদে এসে প্রধানমন্ত্রীর হেলিকপ্টার এসে নামে,তাহলেও চমকানো যাবে না|

যদি এই সব কিছুকে অতিশয়োক্তি মনে হয় বা অলীক কল্পনা, তাহলে জেনে রাখুন, অমিত শাহ এন্ড কোং এর একমাত্র লক্ষ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঠেকাও|

বিজেপি বা আরএসএস এ যদি একটু সত্যিকারের শিক্ষিত লোকরা থাকতেন, স্বপন দাশগুপ্তর মতো লোকরাও যদি সাহস করে শাহদের সুপরামর্শ দিতেন, তাহলে গেরুয়া শিবির আরও কিছু সত্যকে চিনতে পারত, বাস্তবকে বুঝত| ডেনমার্কের যে সিরিজ বর্গেন থেকে এই সবকিছুর শুরু,তার সঙ্গে ভারতীয় রাজনীতির মিল খুঁজে পেতেন| বর্গেন এ যা দেখানো হয়েছিল,অর্থাৎ একজন মহিলা রাজনীতিকের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার গল্প, সেখানেও বিরগিট নাইবর্গ আসলে একটা জোট সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন| আর বাস্তবেও ডেনমার্কে তাই হয়েছিল| কেউ যদি মন দিয়ে বরগেন দেখেন, তাহলে মনে পড়ে যাবে শুরুটা হয়েছিল ডেনমার্কে এসে পড়া উদ্বাস্তুদের সঙ্গে কি আচরণ করা হবে তা দিয়ে| সেই থেকেই নাইবর্গের উত্থান| আর বর্গেন ওয়েব সিরিজে ওই মহিলা রাজনীতিকের একজন রাজনৈতিক কুশলী ছিলেন, বা পলিটিকাল স্ট্র্যাটেজিস্ট|

এরপরে ভেবে দেখুন ফ্যামিলিম্যান টু তে মহিলা প্রধানমন্ত্রীকে দেখানো হলে গেরুয়া শিবিরের রক্তচাপ বেড়ে যাবে না? স্বপ্নেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর প্রশান্ত কিশোরকে ভেবে শিউরে উঠবেন না?

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.