বিপন্ন বোধ করছি। একজন মানুষ হিসাবে, একজন চিকিৎসক হিসাবে বিপন্ন বোধ করছি। সামনে রুগি এসে দাঁড়ালে বিপন্ন বোধ করছি, রুগির চিকিৎসা করতে করতে বিপন্ন বোধ করছি, এমনকি রুগিকে সুস্থ করে বা সুস্থ করার চেষ্টা করে যখন বিদায় জানাচ্ছি তখনও বিপন্ন বোধ করছি। সে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে দুটো ট্রাকে করে দুশো লোক নিয়ে আমাকে মারতে ফিরতে আসবে না তো? অদ্ভুত এই মব সাইকোলজি, অদ্ভুত এই হিংস্রতা। পৃথিবীর কোথাও এর কোনো তুলনা আছে কিনা জানি না। এমনকি ভারতবর্ষেরও অন্য কোনো রাজ্যে, কোনো শহরে এর কোনো উদাহরণ নেই।

দুশো লোক-তিনশো লোক লরিতে করে, ডাক্তার মারার জন্য একটা হাসপাতালে এসে জড়ো হচ্ছে, এই অকল্পনীয় অভিজ্ঞতা বোধহয় একমাত্র এই অভাগা পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তারদেরই হয়। হ্যাঁ গুণ্ডারা গুণ্ডাই, তাদের ধর্ম নিয়ে কারো মাথা ঘামানোর দরকার নেই। কিন্তু এটাই বা কেন হবে যে ধর্মের সাহসে ভর করে, ছাড় পেয়ে যাবে এই বিশ্বাসে, অজস্র লোককে জড়ো করা যাবে ডাক্তারদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য।

মৌমিতা
চিকিৎসক ও লেখিকা

কলকাতা শহর এরকম গুন্ডামি কিন্তু আগেও দেখেছে। ছেচল্লিশ সালের কথা বাদ দিলাম, ২০০৭ সালেই এক লেখিকাকে তাড়াতে এক ধর্মের লোক পথে নেমে এসেছিল (সে লেখিকা ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দের না অপছন্দের সে প্রসঙ্গ অপ্রাসঙ্গিক)।

আমরা যখন ধর্মের বিচার করি তখন বিচারটা অনেক সময়ই একপাক্ষিক হয়ে যায়। কারণ সফট টার্গেটে ঢিল মারতে কে না ভালবাসে। কিন্তু এটা ভেবে দেখার আজকে সময় এসেছে কেন বারবার এই গুন্ডামিটা রাজাবাজার, পার্ক সার্কাস, উল্টোডাঙা, ধর্মতলা, বেলেঘাটা, কসবা এই অঞ্চল থেকেই জন্ম নেয় এবং দানা বাঁধে। কী আছে এই অঞ্চলের মব সাইকোলজিতে? এটা সমাজ বিজ্ঞানীদের ভাবতে হবে এবং প্রশাসনকে কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে। ডাক্তারদের জীবন খোলামকুচি নয় যে রাত জেগে নাইট ডিউটি দেওয়ার সময় তাকে এসে ঢিল মেরে যাবে কতগুলো অসভ্য গুন্ডা আবং পরদিন কোমাতে চলে যাবে সেই মানুষটা।

অধ্যাপকরা কুড়ি দিনের ওপর ক্লাস বয়কট করেছিল এই ক বছর আগেই, কিছু এসে যায়নি। কুড়ি দিন পর আবার ক্লাস শুরু হয়েছিল। ‘ডাক্তাররা কুড়ি দিন কাজ বন্ধ করলে পুরো সমাজটা রাজ্যটা রসাতলে যাবে’, সেটা যারা বলছেন, তাদের ডাক্তারদের নিরাপত্তাও সুনিশ্চিত করতে হবে। গোল গোল কথা বলে, কোথায় কোন ডাক্তার কবে কী দুর্নীতি করেছে সেই গল্প দিয়ে এখন এই ঘৃণ্য মব সাইকোলজিকে আড়াল করা যাবে না। একজন দোষী ডাক্তারও জীবনে অন্তত পঞ্চাশ জন লোককে সুস্থ করে তোলে, দশটা লোককে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচায়। যারা মানুষ খুন ছাড়া কিছুই করতে পারে না তাদের মুখে ডাক্তারের নিন্দে মানায় না।

কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্নের সম্মুখে সমাজ আজ এসে দাঁড়িয়েছে কোন অধঃপতনে গিয়ে পৌঁছলে একটা কিশোর (বালক বলতে অসুবিধে হচ্ছে) দুষ্কৃতি, ফেসবুক প্রোফাইলে পাকিস্তানের পতাকা তুলে, আরও অজস্র লোককে জড়ো করতে পারে তার পঁচাশি বছরের দাদুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে, ‘ইঞ্জেকশন’ শব্দটা পর্যন্ত ভুল বানানে লিখে। যে ইঞ্জেকশন শব্দটা বানান করতে জানে না, সেও জানে ডাক্তারদের ওপর হামলা করলে কোনো শাস্তিই হয় না। এই নারকীয়তা থেকে শুধু ডাক্তারদের নয়, গোটা সমাজের মুক্তি চাই আজকে। একটা সভ্য সমাজ ততক্ষণই সভ্য থাকে যতক্ষণ সেখানে ডাক্তাররা কাজ করতে পারেন। সম্পূর্ণ অচেনা অজানা একজন মানুষকে পরিষেবা দিয়ে মৃত্যু থেকে জীবনে ফিরিয়ে আনেন ডাক্তাররাই।

তাই ডাক্তারদের ওপর হামলা করছে যারা তাদের কঠিন কঠোর শাস্তি দেওয়াই একমাত্র রাস্তা। এটা বলতে বাধ্য হচ্ছি সরকার কিন্তু সঠিক পদক্ষেপ সঠিক সময়ে নিচ্ছে না। যারা বলছেন ধর্ম বিচার করতে না, তারা সেই কথাটা সরকারকে গিয়ে বলুক। ডাক্তারের দিকে ঢিল যারা ছুঁড়ছে, ধর্ম বিচার করে তাদের প্রতি নরম মনোভাব দেখানো হবে না তো? এই কাজটা যদি অন্য ধর্মের কোনো লোক করত, যে নৃশংসতার সঙ্গে তাদের ধরপাকড় করা হত, এক্ষেত্রেও তাই করা হবে তো? তাহলেই বোঝা যাবে ধর্মটা কোনো ব্যাপার নয়, যে অন্যায় করবে সেই শাস্তি পাবে, আইনের শাসন বলবত রাখতে প্রশাসন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

কিন্তু পশ্চিম বাংলায় তো সেটা হচ্ছে না। এখানে কোনো কোনো মানুষ ধর্মের কারণেই কম শাস্তির হকদার, ধর্মের কারণেই অতিরিক্ত শাস্তির হকদার, আর কোনো কোনো মানুষ আবার উচ্চস্তরীয় গরুর পর্যায়ে উঠে যাওয়ার ফলে তাদের শাস্তির বিচার অন্য মাপকাঠিতে হতে শুরু করেছে। এরকম যদি হয় তাহলে তাতে মেরুকরন এবং সাম্প্রদায়িকতা আরও বৃদ্ধি পাবে। গুন্ডার ধর্ম বিচার লোকে ততক্ষণ করবে না যতক্ষণ ধর্মের বিচারে গুন্ডা কোনো আলাদা নিরাপত্তা পাবে না। এবং একই সঙ্গে যারা চাইছেন এমারজেন্সি থেকে আরম্ভ করে সব রকম সার্ভিসে ডাক্তাররা ফিরে আসুক এবং ডাক্তাররা রাত দিন কাজ করুক, তাদের ডাক্তারদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে হবে। সেরকম হলে মিলিটারিকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হোক, র‍্যাফকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হোক, লোকে বলবে এ কী কাশ্মীর। আমি বলব কাশ্মীরের থেকেও খারাপ।

কারণ কাশ্মীর উপত্যাকাতেও সন্ত্রাস হয়, সেনাবাহিনীর ওপর আক্রমন হয়, পুলিশ খুন হয় কিন্তু কাশ্মীর উপত্যকাতেও ডাক্তারদের ওপর এরকম নির্লজ্জ নৃশংস আক্রমণ হয় না, যা কলকাতাতে গত দুদিন আগে ঘটে গেল। আমাদের এই শহরের লজ্জা থেকে যদি উঠে দাঁড়াতে হয় তাহলে আজ আর মিনমিন গুনগুন করলে হবে না, ‘আজ নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমের’ দিয়ে এই এতবড় নারকীয়তাকে সামলানো যাবে না, অন্যায় যেখানে চরম শাস্তি সেখানে, এই কথা মাথায় রাখতে হবে। সমস্ত রকম ভোট ব্যাঙ্ক রাজনীতির ঊর্ধে উঠে, সমস্ত রকম ভোট ব্যাঙ্ক রাজনীতিকে লাথি মেরে চূর্ণ করে অন্যায় যেখানে প্রতিরোধ সেখানে এই মন্ত্র নিয়ে প্রশাসনকে কড়া ভাবে এগিয়ে যেতে হবে এই সমস্ত দুষ্কৃতিদের কান্ডকারখানা মোকাবিলা করতে। তা না হলে পরোক্ষে এই ধর্মীয় বিভাজনকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হবে।