স্টাফ রিপোর্টার, জলপাইগুড়ি: গত ৩০ অগস্ট কেন্দ্রীয় সরকার অসমে চালু করে এনআরসি। যার জেরে অসমের প্রায় উনিশ লাখ মানুষ বাদ পড়ে যায় নাগরিকত্বের তালিকা থেকে। এরফলে এনআরসি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও।

এনআরসি নিয়ে গুজবে কান দেবেন না বলে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজ্যের রাজ্য সরকারগুলি সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে নানা জন সচেতনতা মূলক প্রচার শুরু করেছে। যদিও সরকারের এই প্রচার খুব একটা কাজে আসছেনা বলে দাবি করছে দেশের অন্যান্য এনআরসি বিরোধিতাকারি দলগুলি।

আর এই এনআরসি আতঙ্ক এখন শুধু অসমবাসীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ্ব নেই তা ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাতেও। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী যতই বলুক তিনি এই রাজ্যে এনআরসি করতে দেবেন না। কিন্তু যা পরিস্থিতি তাতে বাংলার মানুষদের মনেও এনআরসি আতঙ্ক যে ঢুকিয়ে ফেলেছে মোদী সরকার তা বেশ ভালো করে বুঝতে পারছেন মুখ্যমন্ত্রী। কারন গত কয়েকদিনে এনআরসি আতঙ্ক নিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন করতে গিয়ে মানসিক চাপে ভয়তে হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে এমন খবরও উঠে এসেছে সংবাদ মাধ্যমের শিরোনামে। সূত্রের খবর এই এনআরসি আতঙ্ক সব থেকে বেশি গ্রাস করেছে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার সাধারণ মানুষদের। যার জেরে প্রতিদিন নিজের কাজকর্ম ফেলে ভোটার তালিকা সংশোধনে বা অন্য কোনও দরকারি কাগজপত্র যাচাই করতে দৌড়াতে হচ্ছে জেলা প্রশাসনের অফিসে।

সূত্রের খবর, ডি ভোটার হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে নাওয়া খাওয়া ভুলে গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে আধার কার্ড লিংক করানোর হিড়িক পড়ে গিয়েছে জলপাইগুড়ি জেলার বিভিন্ন গ্রামপঞ্চায়েতের অফিসে। শুধু তাই নয় মানুষকে যাতে নাকাল হতে না হয় সেই কথা মাথায় রেখে সরকারি দফতরের পাশাপাশি পরিষেবা দিচ্ছে বিভিন্ন স্বেছাসেবী সংগঠন গুলিও। জানা গিয়েছে, আগে সাধারনত বিডিও অফিস ও জেলাশাসকের অফিসে এই কাজ করা হত। এবার গ্রামপঞ্চায়েত অফিস গুলিতেও এই কাজ করা হচ্ছে।

সরকারী দফতরের পাশাপাশি জলপাইগুড়িতে ‘প্রকাশ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি স্বেছাসেবী সংগঠন এই পরিষেবা দিচ্ছে। ভিড় সামলাতে বেশ কয়েকটি ল্যাপটপ নিয়ে তাদের সদস্যরা সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে এই কাজ করছে বলে জানা গিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মলিনা বেগম জানান, ‘শুনতে পাচ্ছি আমার আধার কার্ড কে যদি ভোটার কার্ডের সঙ্গে লিংক না করাই তবে আমাদের এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে’। তিনি আরও বলেন ‘মনে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তাই এখানে এসেছি কার্ড লিংক করাতে’। কোলে বাচ্চা হাতে ভোটার কার্ড আর আধার কার্ড। উপচে পড়েছে ভিড় জলপাইগুড়ি পাটকাটা গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে। পাছে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ে যায়। যদি তাড়িয়ে দেওয়া হয় এই দেশ থেকে। এইরকম একরাশ আতঙ্ক নিয়ে ভোটার তালিকায় আধার কার্ড এর সংযুক্তিকরন করানোর হিড়িক পড়ে গেছে জলপাইগুড়ি তে। সারা জেলা ঘুরলে দেখা যাবে এই একই চিত্র বলে জানিয়েছেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা স্থানীয় মানুষেরা।

সূত্রের খবর, জলপাইগুড়ি রংধামালী এলাকার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ দত্ত মনে করেন এই লিংক এর প্রক্রিয়া এনআরসি’এর প্রথম ধাপ। এটা যদি এখন না করা হয় তবে ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব প্রমানে অসুবিধা হতে পারে তাই তিনি এখানে এসেছেন। এদিকে জলপাইগুড়ি জেলার পাটকাটা গ্রামপঞ্চায়েত’এর প্রধান হেমব্রম বাবু জানিইয়েছেন, বেশিরভাগ মানুষের মনে ঢুকে গেছে এটা এনআরসি’এর জন্যই হচ্ছে। তাই এখন প্রচুর ভিড় হচ্ছে অঞ্চল অফিসে। যদিও গ্রামে আমরা এই সংযুক্তিকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রচার চালাচ্ছি৷ গুজবে কান দিতে না করছি বলে জানান ওই পঞ্চায়েত প্রধান।

জলপাইগুড়ি জেলার পাটকাটা গ্রামপঞ্চায়েত’এর নির্বাহী সহায়ক শুভ্রজিৎ রায় জানান, এই কাজ গুলি আগে বিডিও অফিসে বা বাড়িতে লোক গিয়ে করতো। এইসবের পাশাপাশি এবার প্রথম এই কাজ গ্রামপঞ্চায়েত অফিস গুলিতেও করা হচ্ছে। এখানে ভোটার ভেরিফাই করে একটি পরিবার পিছু একটি গ্রুপ গঠন করে দেওয়া হচ্ছে। এর সাথে এন আর সি এর কোনো ব্যাপার নেই বলে তিনি জানিয়েছেন।যদিও এখনও পর্যন্ত এনআরসি জুজুর আতঙ্ক পুরোপুরি ভাবে দূর করা যায়নি জলপাইগুড়ির মানুষের মন থেকে তা মানছেন জেলা প্রশাসনের কর্তা- ব্যক্তিরা।