বিশেষ সংবাদদাতা, ঝাড়গ্রাম: তবে কি ১০ বছরের ব্যবধানে ফের একই চেহারায় ফিরছে জঙ্গলমহল? প্রশ্ন উঠছে৷ কারণ, ইতিমধ্যেই পাহাড়ে জঙ্গলে ঘেরা ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ি, বিনপুর থানা এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রামে আদিবাসী সমাজের তরফে ফতোয়া জারি করা হয়েছে, তৃণমূল করলে এলাকায় থাকা যাবে না৷ শুধু ফতোয়া জারি নয়, সদ্য সমাপ্ত পঞ্চায়েত ভোটে শাসকদলকে ভোট দেওয়ার ‘অপরাধে’ বেশ কয়েকজন তৃণমূল কর্মীকে বয়কট করার অভিযোগও উঠেছে আদিবাসী সমাজের বিরুদ্ধে৷ এমনকি বিয়ে ভেঙে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে৷

তাৎপর্যপূর্ণভাবে সদ্য সমাপ্ত পঞ্চায়েত নির্বাচনে রাজ্যজুড়ে ঘাসফুলের রমরমা অব্যহত থাকলেও তা ভীষণভাবেই ধাক্কা খেয়েছে জঙ্গলমহলে৷ সূত্রের খবর, জঙ্গলমহলের গ্রামে গ্রামে শাসকদলের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছে আদিবাসী সমন্বয় মঞ্চ৷ গোয়েন্দা সূত্রের খবর, পার্শ্ববর্তী ঝাড়খন্ড থেকে ইতিমধ্যেই বহিরাগতদের আনাগোনা শুরু হয়েছে৷ এই বহিরাগতরা মাওবাদী কি না এবিষয়ে গোয়েন্দারা নিশ্চিত না হলেও তাঁরা সন্দেহ করছেন, ১০ বছর আগে যেভাবে মাওবাদীরা জঙ্গলমহলের বিস্তৃর্ণ এলাকার দখল নিয়েছিল সেই একই কায়দায় আদিবাসী মঞ্চের আড়ালে বহিরাগতরা জঙ্গলমহলের কর্তৃত্ব নিতে চাইছে৷ ইতিমধ্যে তাঁরা জঙ্গলমহলের একাধিক পঞ্চায়েতের দখলও নিয়েছে৷ সূত্রের খবর, কোথাও সিপিএম, কোথাও বা বিজেপির হাত ধরে এলাকার কর্তৃত্ব নিতে মরিয়া এই বহিরাগতরা৷

তারই জেরে ১০ বছর আগে জঙ্গলমহলের গ্রামের পর গ্রামে যেভাবে ‘সিপিএম করা চলবে না’ বলে মাওবাদীরা ফতোয়া জারি করেছিল, ঠিক সেই একই কায়দায় ঝাড়গ্রামের বেলপাহড়ি, বিনপুর সহ একাধিক এলাকার গ্রামের পর গ্রামে আদিবাসী সমাজের তরফে ফতোয়া জারি করা হয়েছে-‘তৃণমূল করা চলবে না’৷ এহেন ফতোয়ার জেরে সংশ্লিষ্ট গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে৷ অভিযোগ, নির্যাতিত পরিবারগুলির পাশে তৃণমূল কংগ্রেসের কোন নেতার দেখা মেলেনি৷

সূত্রের খবর, বিনপুর থানার মাধবপুর গ্রামে তৃণমূল কংগ্রেস করার ‘অপরাধে’ শাস্তিস্বরূপ একটি বিয়ে যেমন ভেঙে দেওয়া হয়েছে৷ কাঁকো গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল যুব কংগ্রেসের বেলপাহাড়ি ব্লক কমিটীর কার্যকরী সভাপতি হেমলেট মান্ডিকেও সামাজিক বয়কটের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। হেমলেটের মা এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনে গ্রাম পঞ্চায়েতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হয়েছিলেন৷ অভিযোগ, সামাজিক বয়কটের হুমকির মুখে পড়ে বাধ্য হয়ে তিনি মনোনয়ন প্রত‍্যাহার করে নেন৷ বিনপুরেরই কুড়চিবনী গ্রামেও একটি বিয়ে ভেঙে দিয়ে পরিবারটিকে একঘরে করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ৷

একইভাবে বেলপাহাড়ি থানার কাশিজড়া-জয়পুর গ্রামে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দেওয়ার অপরাধে শাস্তিস্বরূপ একটি বিয়ে ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি তিনটি পরিবারকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়েছে বলেও অভিযোগ৷ তবে ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে বেলপাহাড়ির বাঁকশোল গ্রামে৷ এখানে আদিবাসী সমাজের তরফে একটি বিয়ে ভাঙ্গার চেষ্টা করা হলেও গ্রামবাসীদের প্রতিরোধে তা ব‍্যর্থ হয়৷ যদিও তৃণমূল করার অপরাধে বেলপাহাড়ির এঁঠেলা গ্রামের তিনটি পরিবারকে সামাজিক বয়কট ঘোষণা করা হয়েছে৷ প্রয়াত তৃণমূল করার ‘অপরাধে’ বিনপুরের ঢুয়াপাহাড়ি গ্রামে বয়কটের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে কংগ্রেসের প্রাক্তন বিধায়ক মঙ্গল সরেনের নাতি ঝন্টু সরেনকেও৷

সুত্রের খবর, সম্প্রতি বিনপুর থানার লালডাঙা গ্রামে এক গোপন বৈঠকে ওই তালিবান সমাজপতিরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিনপুর-২ ব্লকে সাঁওতাল সমাজের যারা গ্রাম পঞ্চায়েত বা পঞ্চায়েত সমিতির আসনে ভোটে জিতেছেন, তারা যে দলের টিকিটেই জিতুন, তাদের প্রত‍্যেককে সমাজের কথামত কাজ করতে হবে৷ কেউ কথা না শুনলে তাদেরকেও সামাজিক বয়কটসহ কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। এবিষয়ে তৃণমূলের বিনপুর-২ ব্লকের সভাপতি বংশীবদন মাহাতোর সতর্ক মন্তব্য, ‘‘ওসব সাঁওতালদের সামাজিক ব‍্যাপার। তাছাড়া আমি এখন প্রধান, উপপ্রধান, সভাপতি নির্বাচন নিয়ে ব‍্যস্ত আছি৷’’পুলিশের দাবি, লিখিত কোনও অভিযোগ জমা পড়েনি৷ তাই আদিবাসীদের সামাজিক ব‍্যাপারে পুলিশ নাক গলাবে না৷

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আদিবাসী সমন্বয় মঞ্চ এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ছত্রছায়া থেকে সিংহভাগ আদিবাসীদের সরিয়ে ফেলতে সফল হয়েছে। তারই জেরে পঞ্চায়েত নির্বাচনে জঙ্গলমহলে ধাক্কা খেতে হয়েছে শাসকদলকে৷ স্বভাবতই, বহিরাগতদের এই এলাকা দখল শাসকদল এখন কিভাবে আটকায়, লাখ টাকার এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছে জঙ্গলমহলের আনাচে কানাচে৷