কলকাতা: একদিকে শ্বশুর বাড়ির পণের চাহিদা পূরণ করতে না পারা, অন্যদিকে কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়া, এই দুই অপরাধেই অকালে চলে যেতে হলো মৌমিতাকে? শ্বশুর বাড়িতে প্রতিদিন অত্যাচারে পরেও বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মৌমিতা কোনদিন প্রতিবাদ করেনি সেকারণেই কি অকালে চলে যেতে হলো মৌমিতা কে? এখন এই প্রশ্নগুলিই এখন ঘুরছে মৌমিতার মৃত্যু রহস্যের কেসে। আর এই উত্তর খুঁজতে থানা থেকে আদালত ছুটে বেড়াচ্ছেন সন্তানহারা শংকর বাবু। বারবার পুলিশি দরজায় কড়া নেড়েও সাড়া পাননি, সিআইডি-র দরজায় দরজায় ঘুরেছেন মেয়ের সুবিচার চেয়ে। কিন্তু সেখানেও মেলেনি কোনও সুরাহা। অবশেষে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন বেলগাছিয়ার বাসিন্দার শংকর মন্ডল।

মামলার বয়ান অনুযায়ী, মামলাকারী শংকর মন্ডল এর আইনজীবী আশীষ কুমার চৌধুরী জানান, মৌমিতার মৃত্যু ঘিরে রয়েছে একাধিক প্রশ্ন। প্রথমত, মৌমিতা যে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে সেটা কেউই দেখেননি। দ্বিতীয়ত, মৌমিতা যে ঘরের মধ্যেই আত্মহত্যা করেছে, সেই ঘরের দরজা কে বা কারা ভাঙলো সেটা নিয়েও কিন্তু ধোঁয়াশা রয়েছে। তৃতীয়ত, বেলেঘাটা থানার পুলিশ এবং অভিযুক্ত মৌমিতার স্বামী কিভাবে একসাথে মৌমিতার দেহ কি ভাবে বাইরে আনতে পারেন?

আইনজীবী আশীষ কুমার চৌধুরী, ২০১৮ সালের ৬ ই জুলাই বেলগাছিয়ার বাসিন্দা মৌমিতা মন্ডলের সাথে বেলেঘাটার লেবু গোলার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ রায়ের সাথে দেখাশোনা করে বিয়ে হয়। কনের পরিবারের দাবি, বিয়েতে মৌমিতার বাবা শংকর মণ্ডল যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন শ্বশুরবাড়ির দাবি-দাওয়া পূরণ করার। যতটা সম্ভব শশুর বাড়ির লোককে খুশি রাখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

কিন্তু আজও পণ না দেওয়ায় কতটা নির্মম হতে পারে তারই নিদর্শন পাওয়া গেল আবারও। মৌমিতার জীবনে বিয়ের পর থেকেই তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোক তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছিল বলে অভিযোগ। তাঁর পরিবারের দাবি, সেটা কোনও রকম ভাবে মৌমিতা সামলে উঠতে পারলেও গত ১৮ মার্চ মৌমিতা একটি কন্যা সন্তান জন্ম দেয় এবং তার পর থেকেই মানসিক, এবং শারীরিক অত্যাচার দ্বিগুণ ভাবে বেড়ে যায় বলে অভিযোগ।

নিত্যদিন শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মৌমিতার ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছিল। সেই কারণে শংকর বাবু গত ২৬ সেপ্টেম্বর মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে উপস্থিত হন মেয়েকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনবেন বলে। কিন্তু যেহেতু সেদিন বৃহস্পতিবার ছিল, তাই সেদিন মৌমিতাকে তার বাবা নিয়ে যেতে পারবেন না বলে জানায় তাঁর শ্বশুর বাড়ির লোকজন। পরের দিন শুক্রবার সেদিনকে মৌমিতাকে বাড়ি নিয়ে যেতে কোন অসুবিধা নেই বলেও জানায় তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। সেই কথা মত শুক্রবার ২৭ সেপ্টেম্বর মেয়েকে নিয়ে আসার কথা থাকলেও ভোর সাড়ে ছটা নাগাদ শংকর বাবুর মোবাইলে তার মেয়ে মৌমিতা আর্তনাদ করে জানান “বাবা তুমি এসে আমায় নিয়ে যাও না হলে ওরা আমাকে শেষ করে ফেলবে”।

মেয়ের সেই আর্তনাদ আর এক জামাইকে নিয়ে বেলেঘাটার মৌমিতা শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে যান শঙ্কর বাবু। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখেন, ভিড়ের মাঝে মৌমিতার গলায় জড়ানো দড়িতে নিথর দেহ এবং পাশে রয়েছে তার ছোট্ট মাসের শিশুকন্যা সেও অনর্গল কেঁদে চলেছে।

শংকর বাবুর দাবি, তিনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি দেখতে পান বেলেঘাটা থানার তদন্তকারী আধিকারিকরা পৌঁছে যান মৌমিতার শ্বশুরবাড়িতে এবং মৌমিতা স্বামী বিশ্বজিৎ রায় এবং পুলিশ দুজনেই ধরাধরি করে মৌমিতার দেহ বাইরে বার করে নিয়ে আসছে।

কিভাবে মৌমিতা মারা গেলেন কেউই সেটা সঠিকভাবে জানেন না কারণ কেউ দেখেননি মৌমিতা গলায় দড়ি দিয়েছেন। ঘরের দরজা বন্ধ করে মৌমিতার দেহ বাইরে বার করে নিয়ে এসছে এতগুলো বিষয় নিয়েই তৈরি হয়েছিল ধোঁয়াশা এবং সে কারণেই পুলিশের দরবারে আবেদন জানিয়েছিল মৌমিতার বাবা শংকর মন্ডল।

মেয়ের মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েন শংকর বাবু তিনি জানান ঘটনার সঠিক তদন্ত হোক এবং সেই কারণেই ২৯ ই নভেম্বর ইন্সপেক্টর সিআইডি এবং এডিজি সিআইডি দপ্তরে অভিযোগ জানালেও সেই অভিযোগ নিতে অস্বীকার করেন বলে অভিযোগ শংকর বাবু র। পরবর্তী সময়ে তিনি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে এডিজি সিআইডি এবং ইন্সপেক্টর সিআইডি কাছেও আবেদন জানান যদিও সেই আবেদন গ্রহণ করেনি অবশেষে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন শংকর বাবু। আগামী সপ্তাহে মামলার শুনানি হাইকোর্টের বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্যের এজলাসে।