গৌতম রায়: আড়ম্বরহীন, নীরব নিভৃত সাধন বাঙালি জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ভারতের মানুষদের কাছে বাবা, মা, প্রিয়জনদের ভালোবার জন্যে, শ্রদ্ধা করার জন্যে আলাদা করে একটি বিশেষ দিন ধার্য করা– এটা কি বিশ, পঁচিশ বছর আগেও ভাবা যেত? পশ্চিমি মূল্যবোধে সন্তানের প্রৃপ্তবয়স প্রাপ্তির সাথে সাথে জীবন-জীবিকার তাগিদে বাবা মায়ের সঙ্গে যে সম্পর্কের নোতুন বনিয়াদ তৈরি হয়, সেই বনিয়াদের ভিত্তিতে আমরা ভারতীয়রা, বিশেষ করে বাঙালিরা বিশ্বাস করি না।

বিশ্বায়নের আগের যুগ পর্যন্ত আমাদের এই পোড়া দেশে যোগ্য-অযোগ্য কোনো সন্তানের কাছেই বাবা, মা লায়াবিলিটি বা বোঝা ছিলেন না, যেমনটা পশ্চিমি দেশে বহুকাল থেকেই দেখতে পাওয়া যায়। হ্যাঁ, একটা কাল ছিল বাঙালি সমাজে বার্ধক্যে বারাণসী। বৃদ্ধ মায়েদেরই বিশেষ করে কাশীতে পাঠাবার যে রেওয়াজ সাতের দশক পর্যন্ত বাঙালি সমাজে ছিল, তার পিছনে বাবা, মাকে বোঝা ভাবার থেকে অনেক বেশি কার্যকরী ছিল উনিশ, বিশ শতকের ক্ষয়িষ্ণু নেতিবাচক সামাজিক মূল্যবোধ, কুসংস্কার।

হ্যাঁ, একটা বড়ো অংশের স্বামী পরিত্যক্তা, নিঃসন্তান বিধবাদের কাশীতে চালানের যে রেওয়াজে আম বাঙালি অভ্যস্থ হয়ে উঠেছিল, তার পিছনে কিন্তু বাবা, মা ব্যাতীত মাসী, পিসী, জ্যেঠী, খুঁড়ির দায়িত্ব না নেওয়ার মানসিকতাই সবথেকে বেশি সক্রিয় ছিল। বাবা, দিবস বা মা দিবসের আদিখ্যেতা ছিল না।

আজ যখন আমরা যতো বেশি করে বাবা, মায়ের থেকে মানসিক ভাবে, আর্থিক ভাবে তো বটেই, মানে, তাঁরা যদি, আর্থিক ভাবে কমজোরি হন– তাহলে তো তাঁদের সঙ্গে বাবা দিবস, মা দিবসের ঘনিষ্ঠতাই বেশি করি। জানি না কবার খোঁজ নিই, বাবা, তুমি যে বলেছিলে তোমার সুগারটা খুব ফ্রাকচুয়েট করছে, কই তুমি তো ডায়গনেস্টিকের ছেলেটাকে দিয়ে সুগারটা মাপালে না?

বাবার একটু লাজুক মুখ দেখে কপট রাগে হয়তো আমি বলে উঠলাম, আরে আমি সাত কাজে থাকি। ডায়নেস্টিকের ছেলেটাকে তুমিও তো একবার নিজে ফোন করতে পারতে?

বাবা ও সলজ্জ উত্তর দিলেন; আসলে আজ মাসের বাইশ তারিখ। জানি তোর পকেটের কি অবস্থা। তাই….।

পকেটের তোয়াক্কা না করেই সেই রাতে আপনি একটা লিরাগ্লুটাইডের পেন আর হ্যাঁ, পেলে কে নিয়ে যে বইটা আপনার বাবা পড়তে চেয়েছিলেন,আপনি অর্ডার ও দিয়ে রেখেছিলেন সরস্বতী বুক স্টলে। কিন্তু সেই মাসের কত তারিখ ভেবে আর আনেননি। সেই বইটাই নির্দিধায় ধারে বইয়ের দোকানের মালিক অসীমদার কাছ থেকে আপনার বইয়ের দোকানের মাস কাবারি খাতায় লিখিয়ে নিয়ে এসে তুলে দিলেন বাবার হাতে।

এমন বাবা দিবস, এমন মা দিবস আমরা বাঙালিরা, ভারতীয়রা প্রতিদিন পালন করি। এ জন্যে আমাদের আলাদা করে দিবসের দরকার হয় না।