বিশেষ প্রতিবেদন: বাংলাদেশি নব্য জেএমবি সংগঠন অর্থ ছড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকেই নকল আধার কার্ড বানিয়ে নিচ্ছে৷ সেই পরিচয়পত্র দিয়েই তারা ভুয়ো ভারতীয় হয়ে নাশকতার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত৷ গুলশন হামলার অর্থ যোগানদাতা আকরাম হোসেন নিলয়ের স্বীকারোক্তিতে মিলেছে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য৷ জানিয়ে দিল বাংলাদেশের জঙ্গি দমন শাখা সিটিটিসি৷

গত ২২ মার্চ বগুড়ার শিবগঞ্জ এলাকা থেকে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা আকরাম নিলয়কে গ্রেফতার করা হয়৷ ধরা পড়ে সংগঠনের অপর শীর্ষ জঙ্গি নেতা হাদিসুর রহমান সাগর৷ দুই শীর্ষ নব্য জেএমবি নেতার দারা পড়ায় সংগঠনটি বর্তমানে কিছুটা অগোছালো বলেই মনে করা হচ্ছে৷ তবে নিলয়ের স্বীকারোক্তিতে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ জঙ্গি দমন শাখা সিটিটিসি (কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট)৷ যেভাবে দালাল চক্রের মাধ্যমে কলকাতাতে ভুয়ো আধার কার্ড বানিয়ে জঙ্গিরা নিশ্চিন্তে ভারতীয় নাগরিকের ছদ্মবেশ নিচ্ছে তা চিন্তার বিষয় বলেই মনে করা হচ্ছে৷

পড়ুন: ভয়ঙ্কর জঙ্গি সাগর ধৃত, তছনছ হবে নব্য জেএমবি ?

গতবছর কলকাতায় ধরা পড়ে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লা বাংলা টিমের (আনসার আল ইসলাম) কয়েকজন জঙ্গি৷ তারা কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় ঘাঁটি তৈরি করে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে নতুন করে ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তিবাদীদের উপর হামলার পরিকল্পনা করে৷ তখনই উঠে আসে, দালাল চক্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে নিশ্চিন্তে সীমান্ত পেরিয়ে জঙ্গিদের পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়ার বিভিন্ন তথ্য৷ এবার জঙ্গি নিলয়ের দেওয়া তথ্যে মিলেছে কলকাতার দালাল চক্রের সঙ্গে জঙ্গি যোগসূত্র৷

 

 

জেরায় জঙ্গি নিলয় জানিয়েছে, সে ২০১৭ সাল থেকে ভারতে ছিল৷ তার লক্ষ্য ছিল যে কোনও উপায়ে ভারতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে সিরিয়া চলে যাওয়া৷ সেখানে গিয়ে ইসলামিক স্টেট জঙ্গি সংগঠনের হয়ে সরাসরি ‘জিহাদ’ করা৷ বাংলাদেশে থেকে সিরিয়া যাওয়ার জন্য ঢাকাস্থিত ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তানি দূতাবাসে সে ভিসার জন্য আবেদন করে৷ কিন্তু কোনও দূতাবাসই তাকে ভিসা দেয়নি৷ পরে সংগঠনের নির্দেশে দালালের মাধ্যমে যশোরের বেনাপোল পেরিয়ে অবৈধ উপায়ে পশ্চিমবঙ্গের পেট্রাপোলে পৌঁছে যায়৷ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে কলকাতায় পৌঁছে সেখানকার একটি হোটেলে কিছুদিন কাটায়৷ কলকাতার কোন হোটেলে জঙ্গি নিলয় ছিল সে বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধান করছে সিটিটিসি৷

জেরায় নিলয় জানিয়েছে, সে ভারত থেকে ইরান বা তুরস্কে যাওয়ার পরিকল্পনা করে৷ দ্বিতীয় বিকল্প পথ হিসেবে লিবিয়ায় গিয়ে সেখান থেকে সিরিয়ায় প্রবেশ করার ছক করেছিল। তার তৃতীয় বিকল্প ছিল যেমন করেই হোক পাকিস্তানে প্রবেশ করা। সেখান থেকে গোপনে সীমান্ত পার করে আফগানিস্তান হয়ে সিরিয়া যাওয়া। এই পরিকল্পনা করা ও পাসপোর্ট তৈরি জন্য কলকাতা ছিল তার কাছে ‘সেফ জোন’৷

পড়ুন: খাগড়াগড় বিস্ফোরণ চক্রী নাসিরুল্লার পর টার্গেটে সালাউদ্দিন

নব্য জেএমবি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে ইসলামিক স্টেট সরাসরি জড়িত৷ ২০১৬ সালের ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশনের হোলি আর্টিজান ক্যাফে হামলা হয়৷ ঈদের আগে রমজান চলাকালীন এই নাশকতায় ভিনদেশিদের কুপিয়ে, গুলি করে খুন করা হয়৷ ভয়াবহ এই জঙ্গি হামলার দায় আইএস৷ পরে বাংলাদেশ সরকার জানায় হামলার পিছনে আছে নব্য জেএমবি৷ হামলার মাস্টার মাইন্ড তামিম চৌধুরী ওরফে ‘বাংলার বাঘ’-কে নিকেশ করা হয়েছে৷ গুলশন হামলা পরবর্তী একাধিক জঙ্গি দমন অভিযানে খতম হয়েছে শীর্ষ নব্য জেএমবি নেতৃত্ব৷ সর্বশেষ ধার পড়ে নিলয় ও সাগর৷

নিলয় জানিয়েছে, সে তার পুরো পরিবারকেই জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত করতে চেয়েছিল৷ যে কোনও উপায়ে পরিবার সমেত সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করে৷ কিন্তু ভিসা না মেলায় অবৈধ উপায়ে ভারতে ঢুকে কলকাতা থেকেই পাসপোর্ট বানিয়ে নেয়৷ নিলয় জানিয়েছে, এই জাল পাসপোর্ট চক্রের কয়েকজন ধরা পড়তেই সে আর রিস্ক নেয়নি৷ ফের সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছিল৷ সিটিটিসির উপ কমিশনার মহম্মদ মহিবুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, নিলয় দুর্ধর্ষ এক জঙ্গি। সে সর্বশেষ নব্য জেএমবির আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। তার কাছ থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তা যাচাই করে সংগঠনের পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানার চেষ্টা চলছে।’

২০১৪ সালে মালয়েশিয়াতে পড়তে গিয়েছিল নিলয়৷ সেখানে পরিচয় হওয়া কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই ঢাকায় আইএসের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে সে৷ শুরু হয় ধর্মীয় রীতি মেনে জীবন যাবন৷ পরবর্তী সময়ে নিলয় যোগ দেয় নব্য জেএমবি সংগঠনে৷ নব্য জেএমবির নিজস্ব নেটওয়ার্কে নিলয়ের পরিচয় ছিল ‘জ্যাক স্প্যারো’, ‘স্লেড উইলসন’ ও ‘ব্রুস ওয়েন’ ৷ জঙ্গি কর্মকাণ্ডে নিলয় তার বোন শুভ্রাকেও জড়িয়ে নেয়৷ নব্য জেএমবির মহিলা শাখা সিস্টার উইংয়ের শীর্ষ জঙ্গি শুভ্রাকেও বন্দি করা হয়েছে৷ বিভিন্ন সূত্র থেকে ধরা পড়েছে নিলয়ের বাবা ও মা৷ শুভ্রার পর ধরা পড়েছে নব্য জেএমবির মহিলা প্রধান হুমায়ারা৷