হিটলার! সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তিদের মাঝে একজন।  যদিও জার্মানদের কাছে এখনও হয়ত বেশ জনপ্রিয় এই মানুষটি। কারণ তিনিই ছিলেন তাদের প্রিয় ফিউরার।১৮৮৯ আজকের দিনে অর্থাৎ ২০এপ্রিল তিনি জন্ম গ্রহণ করেন৷  তবু এই বিতর্কিত রাষ্ট্রনায়ককে বার বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল যার সংখ্যা কারও মতে ২৩ কারও মতে ৫০ হতে পারে। তবে কোনও বারই সফল হয়নি আততায়ী। তাঁকে মারতে একমাত্র সক্ষম হয়েছিলেন হিটলার নিজেই৷ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে হেরে ১৯৪৫ সালের ৩০এপ্রিল হিটলার শত্রুর হাতে নিজেকে সপে দেওয়ার বদলে আত্মহত্যার পথই বেছে নিয়েছিলেন। গত শতাব্দীতে তাঁকে হত্যার প্রধান তিনটি ব্যর্থ চেষ্টার ঘটনা তুলে ধরা হল৷

১)হিটলারকে হত্যার প্রথম চেষ্টা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় বছর ২০ আগে বলে শোনা যায়। ১৯২১ সালে তখন হিটলার একেবারে তরুণ। মিউনিখের বিয়ার হলে হিটলার বক্তৃতা করছিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন নতুন গড়া নাৎসি পার্টির বেশ কয়েকজন সদস্য৷ আবার সেখানেই হাজির ছিলেন সোস্যাল ডেমোক্র্যাট, কমিউনিস্ট এবং আরও কিছু রাজনৈতিকভাবে তাঁর বিরোধী ব্যক্তিরাও। হিটলারের আগুনের গোলার মতো বক্তৃতা তাদেরকে আঘাত করল। তারা তাঁর অমন সাহসী বক্তৃতা শুণে প্রায় পাগলামি করতে থাকে অনেকে, শুরু হয় চেয়ার ছোঁড়াছুড়ি। ওখানে একদল বন্দুকধারী তাদের পিস্তল থেকে মঞ্চের দিকে হিটলারকে তাক করে বেশ কয়েকবার গুলি চালায় কিন্তু হিটলারের কোনও রকম ক্ষতি হয়নি। এমন পরিস্থিতির মাঝেই হিটলার আরও ২০ মিনিট ধরে তার বক্তৃতা চালিয়ে গিয়েছিলেন।  যতক্ষণ না পুলিশ এসে সম্পূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

২) ১৯৩৮ এর শেষের দিকে  মাউরিস বাভাউড নামের এক ছাত্র একটি পিস্তল কিনেন। এই পিস্তলটি নিয়েই তিনি সারা জার্মানি হিটলারের পিছনে ধাওয়া করেন। ব্রাভাউড নিশ্চিত ছিলেন যে, ফিউরার হিসেবে জনপ্রিয় হিটলার আসলে ক্যাথলিক চার্চগুলোর জন্য এক হুমকি এবং সে আসলে শয়তানেরই আরেক রুপ। সুতরাং তিনি হিটলারকে হত্যা করাটা ধর্মীয় দিক থেকে গুরুদায়িত্ব হিসেবেই ভেবে নিয়েছিলেন। অবশেষে একদিন এমন সুযোগ পেয়ে গেলেন বাভাউড। দিনটা হল ৯ নভেম্বর, ১৯৩৮। হিটলার এবং আরও কয়েকজন নাৎসি নেতা একটি মার্চে অংশ নেন। বাভাউড তাদের চলার পথের পাশেই গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডে জায়গা নিলেন। তিনি হিটলারের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। পিস্তলটি তার পকেটেই ছিল। কিন্তু যখন তিনি পিস্তলটি বের করে গুলি চালাতে যাবেন তখনই জনগণ হিটলারকে দেখে দিশেহারা হয়ে যেতে দেখলেন। সবাই তাদের হাত উঁচিয়ে তাকে নাৎসি স্যালুট জানাল। ফলে বাভাউডের চোখের সামনে দর্শকদের হাত এমন ভাবে এসে গেল যেন এক পর্দা তৈরি হয়ে গেল। বাভাউড হতাশ হয়ে পড়ল এবং তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হলো। পরে

সে জার্মানি থেকে পালানোর সময় ধরা পড়ে যায়। গেস্টাপো (হিটলারের পুলিশ বাহিনী) তাকে গ্রেফতার করলে তার কাছে ম্যাপ এবং বন্দুক পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে সে হিটলারকে হত্যার পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে। ১৯৪১ সালে তাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়।

৩) আর একটি ঘটনা ঘটে ১৯৩৯ সালে ৷ জর্জ এলসারের বিয়ার হলে বোমা হামলা৷ জর্জ এলসার ছিলেন একজন জার্মান দক্ষ কাঠ ও ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রী এবং কমিউনিস্ট। তিনি ঘোরতর নাৎসি বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন হিটলার জার্মানিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে পৃথিবীকে ধ্বংস করে দেবে। সুতরাং তিনি এর সমাধান খুঁজতে থাকলেন।১৯৩৯ সালে ৮ নভেম্বর  মিউনিখে হিটলারের বক্তৃতা দেয়ার কথা। সেইসময় হিটলার পোল্যান্ড দখল করায় বেশ খোশ মেজাজেই ছিলেন। বক্তৃতাটি তাঁর বিয়ার হলে করার কথা। এক সপ্তাহ আগে থেকেই কড়া নজরদারীতে ছিল সবকিছুতে। সেই নিরপত্তার বেষ্টনী ভেদ করে জর্জ এলসার কিন্তু ঠিকই ওই বিয়ার হলে ঢুকে পড়েন।  হিটলার যেখানে বক্তৃতা দেবেন সেখানে এক বড় আকারের পিলারের গায়ে একটা ছোট্ট খুপরি তৈরি করেন৷ হিটলারের বক্তৃতা দেওয়ার সপ্তাহখানেক আগেই ওই খুপরির ভিতর একটি টাইম বোমা রাখেন যা ঠিক ১৪৪ ঘন্টা বা, ৬ দিন পর ৯ টা ২০ মিনিটে ফাটবে। কারণ কথা ছিল ৬ দিন পর ৯ টা ১০ মিনিটে হিটলার ওখানে বক্তৃতা করা শুরু করবেন। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা যে হিটলারের বক্তৃতার মাঝ পথেই বোমটির ফাটবে।সব কাজ সেরে এলসার খুশি মনে সুইজারল্যান্ডের দিকে রওনা হন। কিন্তু তার বক্তৃতা দেওয়ার সময় তাঁর  কারণে পাবলিক ট্রেন পরিষেবায় ব্যাঘাত ঘটবে এ কথা চিন্তা করে তিনি ১ ঘন্টা বক্তৃতার সময় এগিয়ে আনেন। যদিও মতান্তরে বলা হয় ২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় তিনি দ্রুত বার্লিনে ফিরতে চেয়েছিলেন বলেই ওই সময় পরিবর্তন করা হয়েছিল৷ আর ওইদিন সকালে হিটলার ৮ টায় বক্তৃতা শুরু করেন এবং তা ৯ টা বেজে ৭ মিনিটে শেষ করে ওই জায়গা ছেড়ে বেরিয়ে যান ৯ টা ১২ মিনিটে ৷ সেখান থেকে তিনি স্টেশনে পৌঁছলে ৯ টা ১৭ মিনিটে তার ট্রেনটি ছাড়ে।  তারও ৩ মিনিট পরেই সভাস্থবে বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটে। হিটলার বেচে গেলও ওই বিস্ফোরণে ৮ জন নিহত এবং ৩৬ জন আহত হয়। এদিকে পরে এলসার গেস্টাপোদের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন।