প্রতীকী ছবি

স্টাফ রিপোর্টার, বাঁকুড়া: মা চণ্ডীর গাজন মেলাকে কেন্দ্র করে মেতে উঠেছে বাঁকুড়ার গ্রাম৷ মাত্র তিনদিনের এই মেলার জনপ্রিয়তা বলাই বাহুল্য৷ ইতিহাস ঘাটলে উঠে আসবে অনেক অজানা তথ্য৷ প্রায় দু’শো বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে বাঁকুড়ার বড়জোড়ার মালিয়াড়া গ্রামের মা চণ্ডীর গাজন মেলা। লোকসংস্কৃতি ও মানব বন্ধনের এই তিনদিনের মেলায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী জৈষ্ঠ্য মাসের পূর্ণিমা তিথিতে শুরু হয় ব্যতিক্রমী এই চণ্ডী মাতার গাজন উৎসব৷ নানা ধরনের লোকসংস্কৃতি মূলক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ভক্তদের আচার অনুষ্ঠান, কুচ্ছ্রসাধন, উপবাসের মধ্য দিয়ে গাজন উৎসব উপভোগ করেন অসংখ্য মানুষ। পূরাণে কথিত আছে, কোনও মনষ্কামনা পূরণ করতে চাইলে ছাগ বলি দিলে মনষ্কামনা পূরণ হয়৷ তবে সেই নিয়ম বর্তমানেও বেশ রমরমিয়ে নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে৷ এখনও মনষ্কামনা পূরণের জন্য অনেকে এখানে ছাগ বলি দেয়৷

আরও পড়ুন: আমেরিকার সঙ্গে ‘বাণিজ্যযুদ্ধে’র মধ্যেই বাংলাদেশকে খুশি করল চিন

সাধারণভাবে শিব বা শনি ঠাকুরের গাজন উৎসব দেখতে অভ্যস্ত বাঙালি। কিন্তু প্রতি বছরই সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ছবি ধরা পড়ে বড়জোড়ার এই মালিয়াড়া গ্রামে। কিভাবে এই গাজন উৎসবের সূচনা? স্থানীয়রা জানালেন, বহু বছর আগে এই মালিয়াড়া এলাকার মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হতে শুরু করেন। বর্তমান সময়ের মতো সেই সময় চিকিৎসা বিজ্ঞানের এত সুবন্দোবস্ত ছিল না। দু’পা অন্তর ছিল না ডাক্তার কিংবা ওষুধও।

স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষকে ওঝা, গুণীন, কবিরাজ বা গাছ-গাছালির উপর নির্ভর করে থাকতে হত। ঠিক সেই সময় বসন্ত ও কলেরা রোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে মা চণ্ডীর আরাধনা শুরু করেন গ্রামের বাসিন্দারা। পরে মালিয়াড়া রাজবংশের তৎকালীন রাজা রাজনারায়ণের রাজত্বকালে বাগদী চণ্ডীর গাজনোৎসবের সূচনা হয়। মাত্র সাতটি ঢাক দিয়ে জনৈক গুলু বাগদী মেলার সূচনা করেন৷ তার কয়েক বছর পর দীনু ধীবর নামে অন্য একজন মা চণ্ডীর গাজনোৎসবের সূচনা করেন। সঠিক সাল-তারিখ কেউ বলতে না পারলেও সেই থেকে ধারাবাহিকভাবে এই গাজনোৎসব চলে আসছে।

আরও পড়ুন: একই দিনে উদ্ধার বিরল প্রজাতির ক্যামেলিয়ন ও প্যাঙ্গোলিন

প্রাচীন প্রথা মেনে এখনও দেবী চণ্ডী গাজনোৎসবের সময় গ্রাম পরিক্রমায় বের হন। ঢাক, ঢোল, কাঁসর আর আধুনিক সব বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখরিত হয় মালিয়াড়ার আকাশ-বাতাস। শোভাযাত্রায় অংশ নেন অসংখ্য ভক্ত ও সাধারণ মানুষ। গাজনোৎসবে অংশ নেওয়া এক সন্ন্যাসী বলেন, ‘‘আমরা কয়েক পুরুষ ধরে এই চণ্ডী মাতার গাজনে অংশ নিচ্ছি। পূর্ব-পুরুষদের পর আমি যেমন অংশ নিচ্ছি আমার পরবর্তী প্রজন্ম সেভাবেই অংশ নেবে।’’

মেলায় অংশ নেওয়া দর্শনার্থী রামদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বাঁকুড়া জেলার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী মালিয়াড়ার চণ্ডী মাতার এই গাজনোৎসব। সাধারণভাবে শিবের গাজন দেখতেই অভ্যস্ত আমরা। কিন্তু আমাদের জেলায় এভাবে দেবী চণ্ডী বা কোনও নারী দেবতার গাজন সেভাবে নজরে আসেনি। সেই হিসেবে যথেষ্ট ব্যতিক্রমী এই গাজনোৎসব৷’’