স্টাফ রিপোর্টার, হাওড়া: যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রমেই পাল্টেছে শহরের পুজো কালচার। সাবেকি পুজোর বদলে এসেছে থিমের পুজো। আর এবার হাওড়া মধ্য, হাওড়া দক্ষিণ, শিবপুর, দাশনগর থেকে শুরু করে উত্তর হাওড়ার কিছু পুজোয় তাদের ভাবনা কি সেটাই দেখে নেওয়া যাক।

উনিশ তম বর্ষে ইছাপুর মিতালী সংঘের নিবেদন ‘ও মা- তুমি কার!’ শারীরিক প্রতিবন্ধী, দৃষ্টিহীন, শ্রবণশক্তিহীন, চলনশক্তিহীন মানুষের মনের ভাষা মনের আর্তি থিমের মাধ্যমে এবার ফুটিয়ে তুলেছেন তারা। তারাও যেন মাথা উঁচু করে সদর্পে বলে, ‘আমাদেরও সমান অধিকার এ পৃথিবীর বুকে। কোনও কিছুতেই পিছিয়ে নেই আমরা। মা দূর্গার সন্তান আমরা। তাই আমাদের নির্ভয় হৃদয় দিয়ে সব বাধা প্রতিবন্ধকতাকে আমরা জয় করব। সহানুভূতি নয়, আমাদের সম্মান করুন। আসুন একে অপরের প্রতি বিশ্বাস রেখে এক সুন্দর সমাজ গড়ে তুলি।’ থিমের মাধ্যমে এই সংঘ তুলে ধরতে চেয়েছেন যেখানে সমাজের অসহায় সন্তানেরা মাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘মা তুমি কার?’ এই অভিনব থিমের ভাবনা এদের নিজস্ব বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা৷

হাওড়ার বেতড় ৪১-এর পল্লীর সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে এবারের আকর্ষণ ‘ঝুলন্ত মন্ডপ’। আর থিমের নাম ‘আনন্দধারা’। এছাড়াও এবার অন্যতম আকর্ষণ দেবী প্রতিমাকে সাজানো হচ্ছে এক নামী অলংকার সংস্থার বিপুল স্বর্ণালঙ্কার দিয়ে। যা হাওড়া শহরে এই প্রথম বলে উদ্যোক্তারা দাবি করেছেন। উদ্যোক্তারা জানান, মন্ডপের চূড়া থেকে রঙিন আলোর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে আনন্দের ধারা। মন্ডপের রঙিন আলো ও শব্দ তরঙ্গের খেলায় মেতে উঠবে মন।

হাওড়া শিবপুর এলাকার বিনোদ বিহারী হালদার লেনের টর্পেডো ওয়েলফেয়ার সোসাইটি এবার তাদের সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে থিম হিসেবে তুলে ধরেছে এক অভিনব ভাবনা৷ ‘পঞ্চভূতে সৃষ্টি মোদের পঞ্চভূতে লীন, মায়া জগতের গোলক ধাঁধায় ভাববেন রাতদিন’। শিল্পী তরুণ দাসের ভাবনায় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে এই থিম। জীব জগতের সৃষ্টি থেকে ধ্বংস সর্বত্রই বিরাজমান এই দেবীশক্তি। তিনিই জননী, তিনিই প্রলয়শক্তি। বিজ্ঞান ও পুরাণের মেলবন্ধনে এদের থিম।

আরও পড়ুন : বর্ধমান শহরের নাম করা পুজো খাজা আনোয়ার বেড়ের জমিদার দাসবাড়ির পুজো

অন্যদিকে, ৭৩ তম বর্ষে মধ্য হাওড়ার যোগীন মুখোপাধ্যায় লেনের হাওড়া ৬-এর পল্লীর পুজোর বর্তমান বছরের ভাবনা ‘কানে কানে অন্তরালে পক্ষীকুল’। কানে কানে অর্থাৎ মোবাইল ফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু বড় বড় অট্টালিকার মাথায় শোভিত মোবাইল টাওয়ার থেকে বিচ্ছুরিত রশ্মি আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করছে। এর প্রভাব পড়ছে পক্ষীজগত থেকে শুরু করে উদ্ভিদ জগতের উপর। সচেতন নাগরিক হিসেবেই এই সতর্কতা তুলে ধরা হচ্ছে অভিনব থিমের মাধ্যমে।

৩৪ তম বর্ষে কামারডাঙা শীতলাতলা বারোয়ারির এবারের ভাবনা, ‘আদি থেকে অনন্ত, গতিতেই চূড়ান্ত’। সেই আদি অনন্তকাল থেকে পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। আসছে এক যুগ থেকে আর এক যুগ। মানুষের প্রথম আবিষ্কার চাকা থেকে শুরু করে বর্তমানে স্মার্টফোন সবই পরিবর্তন হয়ে চলেছে এক চিরাচরিত গতির হাত ধরে। কিন্তু আদি যুগের সেই চলমান জীবন আমরা হারিয়ে ফেলছি এই গতির প্রভাবেই। এমনকি ছোট শিশুরাও তার প্রকৃতিশীলতা হারিয়ে হয়ে উঠছে যান্ত্রিক। এই নিয়েই এদের এই বছরের থিম আদি থেকে অনন্ত, গতিতেই চূড়ান্ত৷

হাওড়ার বলাই মিস্ত্রী লেনের কল্যাণ পল্লী ইউথ ক্লাবের এবারের থিম ‘মা, তুমি পাথরে না ফুলে’। ক্লাবের কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘‘মা দুর্গাকে আমাদের এটাই প্রশ্ন যে যদি প্রকৃতির ফুল দিয়ে আমরা পুজো করি, সেই প্রকৃতিকেই আমরা ধ্বংস করতে চলেছি কেন। প্রকৃতিই তো আমাদের মা৷ নাকি শুধু সেই দৃশ্যময়ী পাথরের মূর্তি আমাদের মা। কোথায় পাব আমাদের মাকে। পাথরে না ফুলে। সমসাময়িক জীবনের প্রতিটা জিনিসের চাহিদা মেটানোর জন্য আমরা পরিস্থিতির সঙ্গে শুধু লড়াই করে যাই৷ কিন্তু এটা কোনও ভাবেই মনে রাখি না যে সর্বস্বই প্রকৃতির দান।’’ গ্লোবাল ওয়ার্মিং-কে কেন্দ্র করে এদের এই বছরের থিম।

এবার ৪৭ তম বর্ষে ইছাপুর ক্যানেল সাইড সংঘ মিত্র ক্লাবের নিবেদন ‘আগমনীর আগমনে আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’। এই থিমের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে এক টুকরো প্রকৃতির শোভাকে। পুজো আসার সঙ্গে সঙ্গেই মানব জীবন যেমন নতুন পোশাকে নতুন সাজে সেজে ওঠে, তেমন প্রকৃতিও সেজে ওঠে এক নতুন রূপে। নীল আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলা। সবুজ ঘাসের ডগা ভিজে যায় শিশির কণায়। তার উপরে মিঠে রোদ ছুঁয়ে যায় আলতো স্পর্শে। মৃদুমন্দ বাতাসে দুলে ওঠে শিউলি, কাশ, পদ্ম। চারদিকে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। এই নিয়েই এই বছরের কবির কল্পনায় এই থিম ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

আরও পড়ুন: Breaking: প্রতিপদেই ভারী বৃষ্টির খবর শোনাল হাওয়া অফিস

ইছাপুর শিবাজী সংঘের ৪৫তম বর্ষের থিম এবার ‘জীবন অঙ্ক’। উদ্যোক্তাদের কথায়, ‘‘আসলে জড় কেন্দ্রিক সভ্যতা আর দিশাহীন লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছি আমরা। নানা তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় মেলবন্ধনে সমৃদ্ধ কিছু আবিষ্কার মানুষ জীবনকে সংযুক্ত ও সমৃদ্ধ করেছে৷ কিন্তু সংযুক্ত করতে পেরেছে কি আমাদের আত্মার সম্পর্কগুলোকে? তাই বোধহয় এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে ভাবার সময় এসেছে কিসের বিনিময়ে কি পাচ্ছি আর কি হারাচ্ছি আমরা। এরই কোলাজে এদের পুজো ভাবনা ‘জীবন অঙ্ক’।

সালকিয়ার ত্রিপুরা রায় লেনে আলাপণীর থিম ভাবনায় এবার তুলে ধরা হচ্ছে ‘কাল মঙ্গলে গড়া তুমি দেবী তোমায় সবাই নমি’৷ ৭১ তম বর্ষে দেবীর বহুরূপা রূপের মাহাত্ম্য তুলে ধরেছে এই সমিতি৷ সালকিয়া অঞ্চলের ছাত্র ব্যায়াম সমিতির পুজোয় এই বছরের ভাবনা স্নায়ুর উল্লাস। ‘যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ স্নায়ুযুদ্ধ’। মহামায়ার কৃপা ছাড়া আনন্দের সন্ধান মেলে না। নিয়ন্ত্রণ আসে না স্নায়ুর উপর। জেতা যায় না স্নায়ু যুদ্ধে। এই নিয়েই তাদের থিম ‘স্নায়ুর উল্লাস’।

আরও পড়ুন: আজ পুজোয় সরকারি অনুদান নিয়ে মামলার শুনানি

হাওড়ায় বেতড় সার্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির এবারের ভাবনায় তুলে ধরা হচ্ছে ‘পরিত্রাণ’। ৭৭ তম বর্ষের পুজোয় মায়ের মূর্তি গড়েছেন কুমোরটুলির প্রখ্যাত ভাস্কর প্রদীপ রুদ্র পাল। অন্যদিকে, মধ্য হাওড়ার পঞ্চানবতলায় জাগ্রত সংঘের থিমে এবার তুলে ধরা হয়েছে ‘জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি’। এবার এদের ৭৪ বছরের পুজো। ২০১৮-য় পুজোয় নজর কাড়বে হাওড়া অ্যাডামস রিক্রিয়েশন ক্লাবের পুজোও। ডুমুরজলা স্টেডিয়ামের বিপরীতেই এদের মন্ডপ সজ্জা। মধ্য হাওড়ার মহিলা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অঙ্কুরের পুজোয় এই বছরেও সমাজসেবামূলক কাজকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। অনাথ ও বয়স্ক মানুষদের নিয়ে পুজো পরিক্রমা, টেরাকোটা মন্দির নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবার এদের অন্যতম আকর্ষণ৷

হাওড়ার নটবর পাল রোডে উত্তর ব্যাঁটরা জাগরনীর এবার ৫০ বছর৷ তবে সেখানে থিম নয়. থাকছে খাঁটি সাবেকিয়ানা৷ দেখা যাবে সাবেকি প্রতিমা ও মণ্ডপ৷ পাশাপাশি আলোক সজ্জায় থাকছে বিশেষ আকর্ষণ৷ অন্যদিকে, হাওড়ার ব্যাঁটরা রথতলায় গৌতম স্মৃতি সংঘের এই বছরের থিম ‘বাঁশ বেতের সাজে যামিনীরায়ের কাজে’৷ এই মণ্ডপে প্রবেশ করলেই দেখতে পাওয়া যাবে বাঁশের কারুকাজ৷ আর সেই বাঁশের কারুকার্যের মাঝে মাঝে থাকবে আলোর বিশেষ সজ্জা৷ সব মিলেয়ে বাঁশের কাজে মন কাড়বে দর্শনার্থীদের৷