প্রসেনজিৎ চৌধুরী: জ্যোতি বসুর মন্ত্রিসভার দাপুটে কৃষিমন্ত্রী কমল গুহের বাল্য বন্ধু হুসেইন মহম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। স্বৈরশাসন দেখেছিল বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সেই প্রথম স্বৈর শাসন। গণতন্ত্র লুণ্ঠনের অভিযোগ ছিল তাঁকেই ঘিরে। বিতর্কিত সেই এরশাদের প্রয়াণ হল ঢাকায়। কয়েকদিন ধরেই তিনি প্রবল অসুস্থ ছিলেন। ঢাকার সেনা হাসপাতালে চিকিৎসা চলছিল। তাঁর প্রয়াণের সাথে সাথে বাংলাদেশের সবথেকে তথা দক্ষিণ এশিয়ার সক্রিয় প্রবীণতম রাজনীতিকের জীবনাবসান হল। একটি পর্বের শেষ হয়েছে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।

হুসেইন মহম্মদ এরশাদের জন্ম হয় ১৯৩০ সালে। কেউ বলেন তাঁর জন্ম অবিভক্ত ভারতের কোচবিহারের দিনহাটায়। পরে তাঁর পরিবার চলে যায় পূর্ব পাকিস্তানে। নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন- তার জন্ম কুড়িগ্রামে মামার বাড়িতে। আর তাঁর দল জাতীয় পার্টি জানাচ্ছে, প্রয়াত নেতার জন্ম ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রংপুর জেলায়। তবে তাঁর পৈত্রিক ভিটে রয়েছে ভারতের কোচবিহার জেলার দিনহাটায়। সেখানেই তাঁর বাল্য জীবন কেটেছে।

রাষ্ট্রপতি পদে থেকে বা তার পরেও বারে বারে দিনহাটায় এসেছেন তিনি। কমল গুহের মৃত্যুর পরেও এসেছেন। কমল পুত্র উদয়ন গুহ তাঁকে ‘কাকা’ বলেই ডাকতেন। এরশাদের পৈত্রিক ভিটে পরে দান করা হয় সামাজিক কাজে।

বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী অবস্থানে থেকেছেন এরশাদ। তবে তিনি বিরোধী হয়েও সরকারের সঙ্গে আপোষ নীতি নিয়ে চলেছেন। হয়েছিলেন সরকারি দূত। মৃত্যুর সময় তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী নেতা হিসেবেই ছিলেন। এরশাদের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরশাদ পত্নী তথা গতবারের বিরোধী নেত্রী রওশন এরশাদ জানিয়েছেন শোক।

একনজরে এরশাদ- সেনাপ্রধান থেকে স্বৈরশাসক

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সেনা জীবন শুরু হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে খুন করা হয়। এরপর ১৯৮১ সালে খুন হন অপর সেনা প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি হওয়া জিয়াউর রহমান। তারপরেই বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হয় তীব্র অস্থিরতা। এই সুযোগে রাজনীতি শুরু করে এরশাদ। তিনি সেনা শাসক হিসেবে ক্ষমতা দখল করেন। তারপর তৈরি করেন জাতীয় পার্টি।

তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছিল। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনেই একসঙ্গে রাজপথে নেমেছিলেন আজকের দুই যুযুধান নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। মাঠে নেমেছিল জামাত ইসলামির মতো কট্টরপন্থী সংগঠন ও বিভিন্ন বাম রাজনীতিক দলগুলি। তবুও ক্ষমতা ধরে রাখেন এরশাদ। পরে তীব্র গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধাক্কায় তাঁর পতন হয়। বিএনপি ক্ষমতায় আসে। নব্বইয়ের দশকে প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। তাঁর সরকারের আমলে জেল হয় এরশাদের। জেল থেকে পরপর নির্বাচনে জয়ী হন এরশাদ। বিএনপি শাসনের শেষে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। তাঁর সরকারের আমলে মুক্তি পান এরশাদ।

পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতেই সক্রিয় ছিলেন। নিজের দল জাতীয় পার্টিকে নিয়েই ক্ষমতা দখলের মরিয়া চেষ্টা চালাতেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর দলটি সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে রংপুরেই। সেখানেই এরশাদই বাঘ। সেখান থেকেই বারে বারে চমক দিয়েছেন তিনি।