স্বাগত ঘোষ, কলকাতা: ‘এমন অভিনবত্ব পৃথিবীর খেলাধুলোর ইতিহাস ঘাটলে কোনও ক্লাবে পাওয়া যাবে না। আমি অভিভূত।’ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের পর নেতাজি ইন্ডোর ছেড়ে বেরনোর সময় গড়গড় করে কথাগুলো বলে যাচ্ছিলেন ষাটের দশকের লাল-হলুদ অধিনায়ক সুকুমার সমাজপতি। শুধু সুকুমার সমাজপতি কেন, প্রাক্তন ক্লাবের এমন দৃষ্টান্তমূলক সম্মানে একইরকম অভিভূত নব্বইয়ের গোড়ার দিকের অধিনায়ক কুলজিৎ সিং থেকে হাল আমলের হরমনজোত সিং খাবরা কিংবা গুরবিন্দর সিং ফাগুয়ারা।

সত্যিই তো শতাব্দীর সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ হোক অথবা ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড। ক্লাবের ইতিহাসে সকল জীবিত অধিনায়ক ও কোচেদের একইমঞ্চে সম্মান জানানোর নজির পৃথিবীর ক’টা ক্লাব করে দেখিয়েছে? করে দেখাল একমাত্র কলকাতার ইস্টবেঙ্গল। লাল-হলুদ রঙটার যে কী সুবিশাল মাহাত্ম্য, পরতে পরতে তার সাক্ষী থাকল ১৩ অগাস্টের নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম। আর লাল-হলুদের সেই গনগনে আঁচ সুদূর ইরান থেকে যেমন উড়িয়ে আনল বাদশা মজিদ বাসকরকে তেমনই আফ্রিকার ছোট্ট দেশ ঘানা থেকে ছুটে এলেন আসিয়ান জয়ী অধিনায়ক সুলেমান মুসা।

বিকেল ৫-৪৫ মিনিট প্রয়াত পল্টু দাসের স্মরণে শতবর্ষে ইস্টবেঙ্গল দিবস অনুষ্ঠানের সঞ্চালক মীর মঞ্চে আহ্বান জানালেন ইরানিয়ান জাদুকর আবদুল মজিদ বাসকরকে। শব্দব্রহ্মে ফেটে পড়ল নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম। সেই শুরু, এরপর ইস্টবেঙ্গল দিবসের অনুষ্ঠান মঞ্চে একে একে তৈরি হল মাহেন্দ্রক্ষণ। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক তরুণ মজুমদার থেকে সাম্মানিক অতিথি সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, নাট্যব্যক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন, এরপর ইস্টবেঙ্গল পঞ্চপান্ডবের পরিবারবর্গকে ছিল সম্মান জানানোর পালা। এরই মাঝে শতবর্ষ উপলক্ষ্যে আত্মপ্রকাশ ঘটে গিয়েছে অরিজিৎ সিংয়ের কন্ঠে নয়া ইস্টবেঙ্গল থিম সং’য়ের।

ঘটনাক্রমে দশক অনুযায়ী এরপর একে একে মঞ্চে এলেন জীবিত অধিনায়কেরা। অশক্ত শরীরেও লাল-হলুদ রঙটার টানে এদিন মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন ১৯৭০ ইরানের পাস ক্লাবকে হারিয়ে শিল্ড জয়ের কারিগর পরিমল দে থেকে শুরু করে চলতি মরশুমের অধিনায়ক ব্র্যান্ডন ভানলালরেমডিকা। যদিও উল্লেখযোগ্যভাবে এদিন অনুষ্ঠান মঞ্চে দেখা মেলেনি সুধীর কর্মকার, গৌতম সরকারের। অধিনায়কদের সংবর্ধনা সম্পন্ন হওয়ার পর ডাক পড়ল কোচেদের। মঞ্চে তখন শ্যাম থাপা, সৈয়দ নইমুদ্দিন কিংবা আসিয়ান জয়ী সুভাষ ভৌমিক থেকে আর্মান্দো কোলাসো, বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যরা।

 

ছবি: সংগৃহীত

এরপর এল সেই মুহূর্ত। যার উপস্থিতি শতবর্ষে ইস্টবেঙ্গল দিবসের অনুষ্ঠানের জৌলুস এক লহমায় বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। ম…জি…দ ম…জি…দ চিৎকারে পুনরায় মঞ্চ আলো করলেন আশির দশকের বেতাজ বাদশা। আগেই প্রাণের বন্ধু জামশিদ নাসিরিকে বিশেষ সম্মান জানিয়েছেন তিনি নিজেই, এবার ছিল তাঁর পালা। শতবর্ষে ক্লাবের সেরা বিদেশি ফুটবলারের সম্মান নেওয়ার পালা। যে মুহূর্ত ফ্রেমবন্দি করার জন্য হয়তো কয়েক রাত দু’চোখের পাতা এক হয়নি লাল-হলুদ সমর্থকদের। ইস্টবেঙ্গল সভাপতি প্রণব দাশগুপ্ত, সচিব কল্যাণ মজুমদার ও কার্যনির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য দেবব্রত সরকারের হাত থেকে শতবর্ষের লোগো খোদাই করা সোনার কয়েন বিশেষ স্মারক গ্রহণ করে উত্তরীয় গলায় সম্মানিত হলেন বাদশা।

প্রাপ্তির তালিকায় ছিল মেহতাব মোল্লার আঁকা ছবি। স্মারকের সঙ্গে ছোট্ট দু’টি শিশিতে তাঁকে উপহার হিসেবে দেওয়া হল ক্লাবের মাটি ও মাঠের ঘাসও। দর্শকাসনে সবকিছু তখন ক্যামেরাবন্দি করছেন বন্ধু জামশিদ। তবে মজিদও কিন্তু শুধুমাত্র উপহার নিয়ে যাবেন বলেই আসেননি। ক্লাবকর্তাদের জন্য ইরান থেকে বয়ে এনেছিলেন তওফা। এদিনের অনুষ্ঠানেই ক্লাবকর্তাদের হাতে তুলে দিলেন সেগুলি। স্বল্প ভাষণে ধন্যবাদ দিলেন সমর্থক থেকে ক্লাবকর্তাদের। আর যাওয়ার বেলায় বলে গেলেন, ‘সবকিছুই বদলে গিয়েছে এ শহরে, বদলায়নি শুধু লাল-হলুদ রঙটা।’