প্রসেনজিৎ চৌধুরী: দুটি রাষ্ট্রের কুর্সিতে বারে বারে সেনাবাহিনীর কর্তারা বসেছেন। গণতন্ত্র ঝুঁকেছে বন্দুকের সামনে। বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান, সেনাবাহিনীর অসন্তোষ, ষড়যন্ত্রের এই কাহিনিতে কখনও সংযুক্ত পাকিস্তান তো কখনও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নাড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্বকে। কে বলতে পারে ভবিষ্যৎ- এরকমটা আবারও তো হতেই পারে।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সেনাকর্তা থেকে ক্ষমতা দখল করে প্রেসিডেন্টে হওয়ার তালিকায় হুসেইন মহম্মদ এরশাদ ছাড়াও থাকবে আরও কয়েকজন- জেনারেল আইয়ুব খান (পাকিস্তান), জেনারেল ইয়াহিয়া খান (পাকিস্তান), জেনারেল জিয়াউর রহমান (বাংলাদেশ) ও জেনারেল পারভেজ মুশারফ (পাকিস্তান)। আর মুশারফ সেই ধারার আপাত শেষ উত্তরাধিকারী।

রবিবার প্রয়াত হয়েছেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সেনা শাসক থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়া জেনারেল হুসেইন মহম্মদ এরশাদ। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়েছে এক বিতর্কিত পর্ব। ক্ষমতার শিখরে পৌঁছে বাংলাদেশকে করায়ত্ত করেছিলেন তিনি। নিছক কোনও খেয়ালের বসে নয়। যে সংযুক্ত পাকিস্তানের তিনি সৈনিক ছিলেন তারই পূর্বসূরিদের কার্যকলাপের ধারাবাহিকতা বয়ে নিয়ে গিয়েছেন এরশাদ।

নবতিপর অথচ জিম করা ফিট চেহারা। সেটা নিয়েই রীতিমতো লড়াই করেছিলেন সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে। জয়ী হন। আর তাঁর দল জাতীয় পার্টি (জাপা) হয় প্রধান বিরোধী। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে বিরোধী নেতা ছিলেন এরশাদ।

সেনার ভারি বুটের ধাক্কায় গণতন্ত্র লুণ্ঠন ও স্বৈরশাসনের এই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশের নাম থাকবে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এটাই যেন রীতি হয়ে গিয়েছিল সময় সময়। এখন সেই ধারা চলছে। কিন্তু ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান ১৯৪৭ সালে তৈরির পর থেকেই লাগাতার সেনা শাসনে অভ্যস্ত হতে শিখেছে। ট্যাংক বহর, আর্মি টহলদারি, বন্দুকের সামনে একের পর প্রধানমন্ত্রী থরথর করে কেঁপে গিয়েছেন। রাতারাতি কুর্সিতে বসেছেন-গিয়েছেন। সবমিলে ঘটনার ঘনঘটা।

জেনারেল আইয়ুব খান-

তাঁরই অনুগত সেনা অফিসাররা বন্দুকের সামনে পুরো পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিয়েছিল। ২৭ অক্টোবর ১৯৫৮ পাকিস্তানের ইতিহাসে অন্যতম দিন। এই দিনেই জেনারেল আইয়ুব বসেন কুর্সিতে। সামরিক আইনের বেড়াজালে তখন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানবাসী বাঁধা পড়েছেন। শুরু হয় বিদ্রোহ। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষীদের দাবি রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার সেই রক্তাক্ত বিপ্লবের পর শুরু হয় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান। এই বিদ্রোহের ধাক্কায় কুর্সি ছাড়তেই হয় আইয়ুব খানকে। টানা ১১ বছর রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনি। ২৫ মার্চ ১৯৬৯ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এই সেনা স্বৈরশাসক।

জেনারেল ইয়াহিয়া খান-

এই পাক সেনাকর্তা ও স্বৈরাচারীর শাসনকাল ১৯৬৯-১৯৭১ সাল। বাংলাভাষী পূর্ব পাকিস্তানিদের বিরাট গণঅভ্যুত্থানের ধাক্কায় জেনারেল আইয়ুব ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। তার পরেই ক্ষমতায় আসেন ইয়াহিয়া। নির্বাচন ভিত্তিক ক্ষমতা দখলের লড়াই ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় তখন পাকিস্তান উত্তপ্ত। বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় পূর্ব পাকিস্তানের দল আওয়ামী লীগ। কিন্তু ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হননি ইয়াহিয়া। বদলে শুরু হয় রক্তাক্ত সেনা অভিযান। যার ফল মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন। ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষের পাক বাহিনীর চূড়ান্ত পরাজয়।

বাংলাদেশে পর পর সেনা অভ্যুত্থান ও ষড়যন্ত্রের ধুম্রজাল

পাকিস্তান ভেঙে টুকরো হল। বাংলাদেশ তৈরি হল। নতুন দেশের ক্ষমতায় এলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর একনায়কোচিত পদ্ধতিতে ছড়ায় অসন্তোষ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু অফিসারর ষড়যন্ত্র করে সপরিবারে খুন করে শেখ মুজিবুরকে। পাল্টা সেনাবাহিনীর মুজিব অনুগত অফিসাররা ক্ষমতা দখলে মরিয়া হয়ে ওঠেন। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় তখন সেনা টহল ও গুলির লড়াই চলছে। মুজিব অনুগত বাহিনীর কমান্ডাররা সাময়িক ক্ষমতা দখল করলেও তাদের খুন করা হয়। এরপরেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান পাল্টা অভ্যুত্থানে ক্ষমতার শীর্ষে চলে আসেন।

জেনারেল জিয়াউর রহমান-

বঙ্গবন্ধুকে খুনের ঘটনার পর জেনারেল জিয়ার হাতেই চলে গিয়েছেন বাংলাদেশ। তবে ১৯৭৭ সালের তিনি রাষ্ট্রপতি এ.এস.এম সায়েমকে সরিয়ে নিজেই প্রেসিডেন্ট হন। এই ক্ষমতাকে বৈধ করতে গণভোটের আয়োজন করান। তাতে বিপুল জয় পেয়ে কুর্সিতে পাকাপাকি বসেন জেনারেল জিয়া। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। চার বছর বাংলাদেশ শাসন করার পর ফের এক সামরিক ষড়যন্ত্রে ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রামে খুন করা হয় জেনারেল জিয়াকে।

লে. জেনারেল এরশাদ পর্ব- তাঁর হুকুমেই রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। এই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ। তারপর বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হয় হুসেইন মহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসন। সামরিক শাসক থেকে রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এরশাদ। তৈরি করেন জাতীয় পার্টি। এই দলের হয়ে ১৯৮৬ সালে পাঁচ বছরের জন্য দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। শুরু হয় গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ পর্ব। ১৯৮৮ সালের বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে এরশাদ ছাড়া বাকি সব পক্ষ বয়কট করে। শুরু হয় গণতন্ত্র রক্ষায় সম্মিলিত আন্দোলন। রক্তাক্ত এই আন্দোলনে এখনকার যুযুধান দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে এক সারিতে দেখা গিয়েছিল। এই আন্দোলনের ধাক্কায় ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে ক্ষমতা থেকে অপসারিত হন এরশাদ। তার পরের জাতীয় নির্বাচনে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। তাঁর হুকুমেই জেলে যেতে হয় এরশাদকে।

ফের পাকিস্তান- জেনারেল মুশারফের ক্ষমতা দখল

১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধে পাক বাহিনির পরাজয়ের পর পাক সেনার অভ্যন্তরে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে পাক শাসক হন জেনারেল মুশারফ। ২০০১ সালের নিজেকে দেশের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন তিনি। ২০০৮ সালে তাঁকেও কুর্সি থেকে সরতে হয়। এবার জেনারেল মুশারফ দেশান্তরী হন। পরে পাকিস্তানে ফিরে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেন। একাধিক মামলায় তাঁকে বন্দি করা হয়। সেই সব মামলার বিচার চলছে।