'হামি' ছবির একটি দৃশ্য

পূজা মণ্ডল, কলকাতা : তিলোত্তমা কলকাতার বুকে ইংরাজি মাধ্যম স্কুলের সংখ্যা বেশি। তাই এখানকার পড়ুয়াদের ইংরাজি মাধ্যমে পড়ার আগ্রহ বেশি। উল্টোটা হতেই পারে, অর্থাৎ মহানগরীর বাসিন্দা হওয়ার দরুন এখানকার পড়ুয়াদের ইংরাজি মাধ্যমে পড়ার ঝোঁক। তাই মহানগরীর বুকে ইংরাজি মাধ্যম স্কুলের সংখ্যা বেশি।

তাই মাধ্যমিক স্তরে ইংরাজি মাধ্যম স্কুলগুলিকেই নিজেদের শিক্ষার প্রথম বুনিয়াদ হিসেবে বেছে নিচ্ছে শহরের বেশীরভাগ মেধাবী পড়ুয়ারা। সেই সঙ্গে ইংরাজি মাধ্যমে পড়াশুনো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গঠনের প্রারম্ভিক ধাপ, এই বিশ্বাস থেকেও কলকাতার ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার প্রাথমিক ঠিকানা হয়ে উঠছে শহরের ইংরাজি মাধ্যম স্কুলগুলি। গত পাঁচ বছরের নিরিখে মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় ‘প্রথম’ স্থানে কলকাতার কোন পড়ুয়াদের নাম না আসার কারণ হিসেবে অন্তত এই বিষয়টিকেই সামনে আনছেন রাজ্যের শিক্ষাবিদরা।

মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে মাধ্যমিকের ফলাফল। সাংবাদিক সম্মেলন করে মেধা তালিকা প্রকাশ করে দিয়েছেন মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়। মেধা তালিকায় দেখা গিয়েছে ২০১৯ সালের মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় নাম রয়েছে কলকাতা থেকে মাত্র একজন ছাত্রের। যাদবপুর বিদ্যাপীঠের ছাত্র সোহম দাসের। রাজ্যে মাধ্যমিকের মেধা তালিকার নিরিখে দশম হয়েছে সোহম। কলকাতার সন্তোষপুরের ছেলে সোহমের প্রাপ্ত নম্বর ৬৮১। উল্লেখ্য এবছর রাজ্যে মাধ্যমিকের মেধা তালিকার নিরিখে দশম হয়েছে ১২ জন ছাত্র-ছাত্রী।

সেই সঙ্গে রাজ্যে এবছর ধরে বিগত ৫ বছরের মাধ্যমিকের মেধা তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে, ‘প্রথম’ স্থানে কলকাতার কোন পড়ুয়াদের নাম নেই। বাকি স্থানগুলিতেও কলকাতার ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি তেমনভাবে লক্ষণীয় নয়। তাই মাধ্যমিকের ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে এই প্রশ্ন উঠে আসে, কেন মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় কলকাতার পড়ুয়াদের উপস্থিতি উপরের দিকে থাকছে না বা সংখ্যায় বাড়ছে না!

তিলোত্তমা কলকাতার বুকে ইংরাজি মাধ্যম স্কুলের সংখ্যা বেশি। ফলে এখানকার পড়ুয়াদের ইংরাজি মাধ্যমে পড়ার আগ্রহ বেশি বলে মাধ্যমিক স্তরে ইংরাজি মাধ্যম স্কুলগুলিকেই নিজেদের শিক্ষার প্রথম বুনিয়াদ হিসেবে বেছে নিচ্ছে শহরের বেশীরভাগ মেধাবী পড়ুয়ারা, এমনটাই মনে করছেন রাজ্যের শিক্ষাবিদরা। কেন রাজ্যে মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় কলকাতার ছেলেমেয়েদের উপস্থিতি তেমন লক্ষনীয় নয়? এ প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ সরকারি বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৌগত বসু বলেন, “এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা মানচিত্রে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে বেশিরভাগ বাবা-মারাই যারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল তাঁরা তাদের সন্তানদের ইংরাজি মাধ্যম স্কুলে ভরতি করছেন। ফলে ভাল ছাত্রছাত্রীরা সরকারি বা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলো থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। কলকাতায় ইংরাজি স্কুলের আধিক্য বেশি তাই সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা ওই সমস্ত স্কুলে ভরতি হচ্ছে। জেলায় এই সুযোগ এতখানি নেই।”

বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির নেতা স্বপন মণ্ডল বলেন, “কলকাতায় ইংরাজি মাধ্যম স্কুল বেশি। ফলে ভাল কেরিয়ার গড়ার আশায় বেশিরভাগ মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা ইংরাজি মাধ্যম স্কুলগুলিতে ভিড় করছে। সেই সঙ্গে কলকাতার ছেলেদের সায়েন্সে ঝোঁক বেশি। মাধ্যমিকে যেহেতু সায়েন্স এবং আর্টস সমস্ত বিষয়ই পড়তে হয় তাই ওই সমস্ত বিষয়গুলিতে আগ্রহ না থাকায় তাঁরা ঠিকমতো মনোযোগ দিচ্ছেন না। ফলে নম্বর কমে গিয়ে এমনটা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, কলকাতা শহরে তো বিনোদনের অভাব নেই। এই বিনোদনের প্রতি আকর্ষণও কলকাতার ছাত্রছাত্রীদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারন।”

শিক্ষা-শিক্ষক-শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চের রাজ্য সম্পাদক কিংকর অধিকারী বলেন, “কলকাতা শহরের ইংরাজি মাধ্যম স্কুলে পড়ার সুযোগ বেশি। সেই সঙ্গে ঝোঁকও বেশি। ফলে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের অধীনে থাকা স্কুলগুলিকে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা তাদের শিক্ষার প্রাথমিক ঠিকানা বলে মনে করছে না। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে তাঁরা ইংরাজি মাধ্যম স্কুলগুলিকে বেছে নিচ্ছে তাদের শিক্ষার বুনিয়াদ হিসেবে। দ্বিতীয়ত, কলকাতা শহরে বসবাসকারী ছাত্রছাত্রীরা ভালো মেধা থাকা স্বত্তেও ছোট থেকেই অত্যাধিক পরিমাণে বিনোদনমূলক সামগ্রী অর্থাৎ মোবাইল, ল্যাপটপ, সিনেমা ইত্যাদির আকর্ষণে জড়িয়ে পরছে। এটাও তাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।”