মুখে মারিতং জগত!
ভারতের সবথেকে বড় নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং প্রস্তুতি দেখে নির্বাচন কমিশনের ভুমিকায় বার বার এই প্রবাদটির কথায় উঠে আসছে। বিশেষ করে রাজনীতির ‘রাজধানী’ এই বাংলার ভোটগ্রহণ পর্বের হাল দেখে কমিশনের অসহায়তা প্রকাশ্যে উঠে এসেছে৷ পাঁচ পর্বের ভোট মিটে যাওয়ার পরও কমিশনের প্রচেষ্টা আর ভূমিকায় এটাই স্পষ্ট হয় যে, মুখে বড় বড় উদ্যোগের কথা বললেও, আসলে এই বাংলায় অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে নির্বাচন কমিশন রীতিমতো ব্যর্থ।

রানা দাস
এডিটর-ইন-চিফ
কলকাতা24×7

পাশাপাশি হাজারো ঢাকঠোল পেটালেও, কমিশন সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাহা ফেল করেছে। হাজারো নিয়মের নির্বাচনী আচরণ বিধি থেকে শুরু করে হাজার হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করেও তারা সাধারণ মানুষকে অবাধে ভোট দেওয়ানোর কোন ব্যবস্থাই করতে পারেনি। সাতের মধ্যে পাঁচ দফার ভোট মিটে যাওয়ার পর, রাজ্যজুড়ে যা যা খণ্ডচিত্র ধরা পড়ছে, তাতে কমিশন সম্পর্কে এই ধারণাই পোষণ করতে হচ্ছে।

বাংলার ভোটে ছাপ্পা-রিগিং-অশান্তির ঘটনা এই প্রথমবার নয়। আজকের যারা শাসকদল সেই তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী আসনে থাকাকালীন থেকেই রাজ্যে অবাধ ভোটের দাবি উঠেছে। আজকের দ্বিতীয়স্থানে থাকা বিরোধী দল সিপিএম নিয়ন্ত্রিত বামফ্রন্ট শাসকের চেয়ারে থাকার সময়ে তাদের বিরুদ্ধে ছাপ্পা, বুথজ্যাম, দাদাগিরি এবং অশান্তি সৃষ্টির অভিযোগ ছিলই। ৩০ বছরের শাসন থেকে বামেরা বিদায় নিলেও, অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ ভোট করার ক্ষেত্রে কমিশনের দিকে এখনও সেই আঙুল উঠছে। এটা পরিস্কার, যে লঙ্কায় যায়, সেই রারণ হয়। সেটাই নজরে পড়ল সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনেও।

বাম-আমলে ছাপ্পা-রিগিং নিয়ে কমিশনের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য-পরিসংখ্যান রয়েছে। বাংলায় কী করে অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ ভোট করানো যায়, এটা একট চ্যালেঞ্জ ছিল নির্বাচন কমিশনের কাছে। আর সেই লক্ষ্যেই কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, বাংলায় অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে তারা বদ্ধ পরিকর। কী করে বাংলায় অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ ভোট করানো সম্ভব, তা স্থির করতে এই রাজ্যের জন্য একজন বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল। কমিশন নিযুক্ত বিশেষ পর্যবেক্ষক আফজল আমানুল্লা ২০০৪ সালে বাংলার মাটি চষে বেরাতে আসেন।

সেই সময় তিনি সবার প্রথমেই দেখা করেন আজকের শাসক, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তাঁর কাছে বিস্তারিত তথ্য-পরিসংখ্যান নিয়ে কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক আমানুল্লাহ মন্তব্য করেছিলেন, বিহারের চেয়েও খারাপ অবস্থা বাংলার ভোটছবি। জালভোটার, ছাপ্পা-রিগিং, ভোটের দিন বাহুবলীদের দাপট-সহ নানা বিষয় সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত তথ্য দিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন। সম্ভবত, ৮৫ পৃষ্ঠার সেই রিপোর্ট তিনি পেশ করেছিলেন নির্বাচন সদনে। যদিও সেই রিপোর্ট কমিশন গ্রহণ করেনি। এক কথায় বলতে গেলে, কমিশন সরকারিভাবেই সেই রিপোর্ট কার্যকর করেনি। তবে, কৌশলে পরবর্তীকালে আমানুল্লাহের রিপোর্টকে ভিত্তি করেই বাংলা-সহ দেশজুড়ে ভোট প্রক্রিয়া পরিচালনা শুরু করে নির্বাচন কমিশন।

আমানুল্লাহের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই বাংলাজুড়ে জালভোটার খোঁজার কাজ শুরু হয়। সেই লক্ষ্যেই ২০০৫-২০০৬ সালে বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়। পাঠকদের হয়তো মনে আছে, কমিশন নিযুক্ত বিশেষ পর্যবেক্ষক কে জে রাওয়ের কথা। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে টানা ১২ দিন কে জে রাওয়ের সঙ্গে সেই সময়ে সিপিএমের শক্তিশালী ঘাঁটি পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রতিটি এলাকা চষে বেরিয়ে প্রত্যক্ষ করেছিলাম, গোটা জেলাজুড়ে জালভোটারের ছড়াছড়ি। এমন কী সবংয়ের মতো এলাকাতেও তিনি খুঁজে বের করেছিলেন বাংলাদেশী ভোটার।

2006 সালে জাল ভোটারের খোঁজে মেদিনীপুরে কে জে রাও

মেদিনীপুর খাদ্য নিয়ামকের দফতরে আচমকা হানা দিয়ে উদ্ধার করেছিলেন জেলার জনসংখ্যার চেয়ে বেশি পরিমাণ রেশন কার্ড।৷ তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, কেশপুর-গড়বেতার মতো এলাকায় কীভাবে সন্ত্রাসের বাতাবরণ করে রেখেছে তখনকার শাসকদল সিপিএম। রক্তচক্ষুর ভয়ে মানুষ কথা বলার সাহস দেখাতে পারতেন না। শুনেছিলেন ভোট দিতে গেলে বা বিরোধী দলের হয়ে কাজ করলে বাড়িতে সাদা থান কাপড় পৌঁছে যাওয়ার কাহিনী৷ মানে ওই সব এলাকায় বিরোধী বলেই কিছুই রাখেনি সিপিএম৷ লাল ঝাণ্ডার বাইরে কোন পতাকার হাতে নিলেই গৃহবধুকে বিধবা করে দেওয়ার হুমকি কথাই শোনা গিয়েছিল৷

২০১১ সালে নেতাইয়ে সিপিএমের সন্ত্রাসের কাহিনী শুনছেন সুধীর কুমার রাকেশ

শুধু কে জে রাও নয়, ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটের আগেও কমিশন নিযুক্ত বিশেষ পর্যবেক্ষক সুধীরকুমার রাকেশের সঙ্গে বাংলা ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল৷ বিহারে রক্তপাতহীন ভোট করানোর অন্যতম এই কারিগর সুধীরকুমারের সঙ্গে বাংলার সন্ত্রাস কবলিত কেশপুর, গড়বেত, হাওড়ার আমতা, উদয়নারায়ণপুর, আরামবাগ, সবং, পিংলা, খেঁজুরি থেকে শুরু করে উত্তর ২৪ পরগণার সিপিএমের মজিদ মাস্টার শাসন-সহ আরও বহু এলাকা ঘুরে প্রত্যক্ষ করেছিলাম রাজ্যের শাসকদল কীভাবে সারা বাংলাজুড়েই সন্ত্রাসের বাতাবরণ তৈরি করে রেখেছে৷ কীভাবে বিরোধীদের মাথা তুলে দাঁডা়তে দেয়নি৷

তবে, মানুষের মনে সিপিএম-বিরোধী ক্ষোভও চোখে পড়েছিল৷ তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে৷ ৩৪ বছররে বাম-শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলার মানুষ ইতিহাস রচনা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসিয়েছিলেন৷ কেন? না বাংলার এই অগ্নিকন্যা রাজ্যে একটা পরিবর্তন আনবেন৷ মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন৷ ভোটের নামে হিংসা-হানাহানি হবে না৷

কিন্তু, বাংলার মানুষের সেই স্বপ্নে জল ঢেলে দিয়েছিল গত পঞ্চায়েত ভোটের সময়ই৷ বহু আসনে বিরোধীরা প্রার্থী দিতে পারেনি৷ বহু আসনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বতায় জিতে গিয়েছে শাসক দলের প্রার্থীরা৷ যেখানে ভোট নেওয়ার হয়েছে, সেই সব বুথে-কেন্দ্রে কী হয়েছিল, তা বাংলার মানুষকে আর হয়তো মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হবে না৷ সবটাই মানুষ দেখেছে, উপলব্ধি করেছে৷ তবে, মানুষ মনে করছিল পুরসভা-পঞ্চায়েত ভোট সংগঠিত হয় রাজ্য নির্বাচন কমিশনের হাত ধরে৷ যেখানে রাজ্য সরকারের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়৷ তাই, চাইলেও ভোট অবাধ করাটা সম্ভব ছিল না৷ তাই মানুষ আশার আলো দেখেছিল লোকসভা ভোটে৷ কারণ, এই ভোট করায় ভারতের নির্বাচন কমিশন৷ সেখানে রাজ্য সরকার বা রাজ্য পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ করার কোন সুযোগ থাকে না৷ ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশের পরই পুলিশ-প্রশাসন কমিশনের অধীনে চলে যায়৷ কমিশনই নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ-প্রশাসনকে৷

কিন্তু, চলতি লোকসভা পর্বে আমার কী দেখতে পেলাম? প্রথমপর্বে রাজ্যের দুই কেন্দ্র কোচবিহার এবং আলিপুরদুয়ারে মতো আপাত নিরীহ এলাকাতেও ভোটপর্বকে কেন্দ্র করে অশান্তির ঘটনা ঘটল৷ আমি নিজে উত্তরবঙ্গের বলে এটা ভালো করেই জানি, উত্তরবঙ্গে ছাপ্পা-রিগিং-বুথজ্যাম শব্দগুলি খবরের কাগজেই পড়েছিলাম৷ আমার ২০ বছরের সাংবাদিকতার জীবনে উত্তরবঙ্গে ভোটকে কেন্দ্র করে এত অশান্তি কোনদিন দেখেনি৷ ছাপ্পা-রিগিং-বুথজ্যাম তো দুরের কথা৷ একমাত্র চোপড়ায় হামিদুল রহমানের দৌলতে দু’একটা বোমাবাজির ঘটনা ছাড়া উত্তরবঙ্গে আক্ষরিক অর্থেই উৎসবের মেজাজেই সমস্ত ভোট হয়ে এসেছে৷ কিন্তু, এবারের ভোট ছবিটা এক্কেবারে অন্য রকম দেখলাম৷

আর বাংলার মানচিত্রের যত নিচের দিকে ভোট হয়েছে গচ পাঁচ দফায়, অশান্তির মাত্রাটা যেন বাড়তে শুরু করেছে৷ ৩৪ বছরের বাম-জমানায় যে বুথ দখল, ছাপ্পা-রিগিং, এজেন্টের বুথে বসতে না দেওয়ার ঘটনাগুলি এক বিন্দুও পরিবর্তন হয়নি মমতার হাত ধরে আসা পরিবর্তিত এই বাংলায়৷ এর জন্য কোনভাবেই শাসকদলকে সরাসরি দায়ী করা যায় না৷ ভোট করাচ্ছে নির্বাচন কমিশন৷ পুলিশ-প্রশাসন তারা নিয়ন্ত্রণ করছে৷ সাধারণ মানুষে গণতান্ত্রিক অধিকার পাইয়ে দেওয়াটা তাদের অন্যতম দায়িত্ব৷ সেখানে কমিশনের ঠাণ্ডাঘরে বসে বিরোধীদের ভুরিভুরি অভিযোগ শুনেই নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনের কর্তারা৷ দিনভর টিভির পর্দায় বুথ দখল, বিরোধী প্রার্থীকে মারধরের মতো ঘটনার ছবিতেই ফুটে উঠল কমিশনের চরম ব্যর্থতা৷

একজন আম-জনতা হিসেবে সাধারণ ভোটাররা প্রশ্ন তুলতেই পারে, একটা অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ ভোট করানোর জন্য পাঁচটা বছর তাহলে কী করলে নয়াদিল্লির নির্বাচন সদনের কর্তারা৷ কেন তারা প্রত্যেক বঙ্গবাসীকে নিজের ভোট নিজেকে দেওয়ার মতো পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারল না? বছরভর নিজের ভোট নিজে দেওয়ার যে আবেদন জানিয়ে কমিশন কোটি কোটি টাকা খরচ করে গেল, তা কী জলে ঢালা হল না? তাহলে এই সব প্রচারের অর্থটা কী? কমিশন কী কোনদিন পারবে তাদেরই নিযুক্ত বিশেষ পর্যবেক্ষক আফজল আমানুল্লাহের সুপারিশ মেনে বাংলায় একটা অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট উপহার দিতে? নাকি কমিশন মুখে অবাধ ভোটের আবেদন জানিয়ে বার বার তাদের ব্যর্থতার মুখোশের আড়ালেই থেকে যাবে৷