সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা : কথিত আছে গিরিশ পার্কের দত্ত বাড়িতে দুর্গা এসে খাওয়া দাওয়া সারেন। তবে তিনি শুধু খেয়ে দেয়েই বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি চলে যান না। তিনি এই ধরা ধামে সকলের ‘মা’। সন্তানদের কিছু না দিয়ে তিনি কি করে চলে যাবেন? তিনি দিয়ে যান খিচুড়ি। যা খেয়ে তৃপ্তি পায় গরীব দুঃখীরা। ১৩৮ বছরে একটুও বদলায়নি শ্যামল ধন দত্ত বাড়ির বিজয়ার পরের এই নিয়ম।

দেবী মর্ত্যে এসে শোভাবাজার রাজবাড়িতে সংস্কৃতি চর্চায় রত হন। শিবকৃষ্ণ দাঁ’য়ের বাড়ি তিনি সাজেন সোনার ‘রূপে’। দে বাড়িতে তিনি পাঁচটা দিন কাটান পুজোর ভোগে থাকে লুচি, রাধাবল্লভী, লেডিকেনি, খাস্তা কচুরি, দরবেশ, গজা আর নারকেল নাড়ুর মত সুস্বাদু পদে।

তাঁর যাওয়ার বেলা হলে মর্ত্যে ভক্তদের চোখ ছল ছল করে। সন্তানদের অনেকেই যে ভালো করে খেতে পায় না। তাই যাওয়ার বেলায় তিনি দত্ত বাড়িতে তাঁর প্রসাদ হিসাবে রেখে দেন খিচুড়ি। সেই খিচুড়ি দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়। দত্তরা একে দরিদ্রনারায়ণ সেবা বলেন।

প্রসঙ্গত আন্দুলের বিখ্যাত দত্ত চৌধুরী পরিবারেরই এক উল্লেখযোগ্য শাখা এই শ্যামল ধন দত্ত বাড়ি। দুই ভাই গোবিন্দশরন দত্ত চৌধুরী এবং রামশরন দত্ত চৌধুরীর মধ্যে ক্রমাগত সম্পত্তি সংক্রান্ত ঝগড়া বিবাদে তিতিবিরক্ত হয়ে ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে ছোটভাই গোবিন্দশরন পাকাপাকিভাবে আন্দুল পরিত্যাগ করেন এবং রাজা টোডরমলের ডাকবিভাগের রাজস্ব আধিকারিক হিসাবে চাকরি নিয়ে পাকাপাকিভাবে মধ্য কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। রাজা টোডরমল ছিলেন মুঘল সম্রাট আকবরের বাংলা – বিহার – ওড়িশার অন্যতম অন্যতম অর্থসচিব।

গোবিন্দশরন দত্ত চৌধুরীর কর্মদক্ষতা রাজা টোডরমলকে এতটাই অভিভুত করে যে, ১৫৯৪ সালে তিনি গোবিন্দশরনকে উত্তর কলকাতার এক বিশাল অংশ জমি প্রদান করেন এবং তাঁকে ওই অঞ্চলের প্রাদেশিক অধিকর্তা হিসাবে নিয়োগ করেন। গোবিন্দশরনের চার ছেলে। বানেশ্বর দত্ত, ভুবনেশ্বর দত্ত,রামনারায়ন দত্ত,বিশ্বেশ্বর দত্ত।

বানেশ্বর দত্তের ছেলে রামচন্দ্র দত্ত উত্তর কলকাতার হাটখোলায় কিছু জমিজমা কিনে চলে আসেন। রামচন্দ্রের সাথে দুর্গামনি দেবীর বিবাহ হয় এবং তাদের পাঁচটি পুত্র সন্তান হয়। জ্যেষ্ঠ পুত্র কৃষ্ণচন্দ্রের পুত্র মদনমোহন দত্ত। মদনমোহন ব্যবসাসুত্রে অঢেল সম্পত্তির অধিকারী হন। তাঁর বাড়িই ‘হাটখোলার দত্ত বাড়ি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

হাটখোলার বিখ্যাত এই দত্ত পরিবারের একটি শাখা এই বর্তমানে বলরাম দে স্ট্রিটে অবস্থিত শ্যামল ধন দত্ত পরিবার। হাটখোলার দত্ত পরিবারের দেওয়ান জগৎরাম দত্তের ছিল তিন পুত্র : কাশীনাথ, রামজয় ও হরসুন্দর। রামজয়ের ছয় পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ কালীচরণ। শ্যামলধন ছিলেন কালীচরণের পাঁচ পুত্রের মধ্যে কনিষ্ঠ। হাটখোলার দত্ত বাড়ি থেকে এসে নিলামে এই বাড়ি কেনেন শ্যামলধন দত্ত। তিনি এই বংশের আদি পুরুষ।

কলকাতা হাইকোর্টের সলিসিটর শ্যামলধন তাঁর নতুন বাসভবনে ১৮৮০ সাল থেকে থাকতে শুরু করেন। এর দু বছর পর থেকে শুরু হয় দুর্গাপুজো। এখানে প্রতিমার পিছনের চালি ‘মঠচৌড়ি’ অর্থাৎ তিন চালি। দেবীর বাহন ঘোটকাকৃতি সিংহ। সপ্তমী থেকে দশমী তিন দিন কুমারী পুজো হয়। শ্যামলধনের ছিল দুই কন্যা। ছোট কন্যা রাজলক্ষ্মী দেবীর বিয়ে হয় মানিকতলার গিরিশ ঘোষের পরিবারে। তাই এই বাড়ি এখন ঘোষ পরিবারের অধীন। পুজো পরিচালনাও তাঁরাই করেন।