কাশফুল ফুটুক না ফুটুক আজ পুজো। এই কয়েকটা দিন সন্ধ্যায় পাড়ায় পাড়ায় প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়িয়ে পুজোর আঁচে নিজেকে সেঁকে নিতে অবশ্য আগেই শুরু করেছে আপামর বাঙালি। তবু কলা বউকে স্নান করিয়ে পুরোহিত মশাইয়ের এর মন্ত্র উচ্চারণে দেবীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। ষষ্ঠীর সাজে সজ্জিত হয়ে আরও একবার মা দুর্গার সামনে এসে চেয়ে নেওয়া মনের মত আশীর্বাদ।

দেবাঞ্জনা মুখার্জি ভৌমিক

এই যে প্রতিবার মা দুর্গাকে মিষ্টি মুখ করিয়ে পান পাতার পরশে আদর করে সিঁদুর পরিয়ে বরণ করে বলি ‘আবার এসো মা’– এ বলার মধ্যে লুকিয়ে থাকে বিষাদ আর বেদনা।

আর আসলে যেন থাকে আশা, পরের বার পুজো যেন আমার জীবনেও আসে। দেবীর আগমন তো ঘটবে পাঁজির নিয়ম মেনে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে। কিন্তু পরের বার দেবীকে বরণ করতে, দেবীকে অভ্যর্থনা জানাতে আর পুজোর আনন্দ উপভোগ করতে আমিও যেন এ ধরাধামে থাকি এই প্রার্থনাই চেয়ে নেওয়া স্বয়ং দেবীর কাছেই।

এ চাওয়া প্রতিটা মানুষের মনে। বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে বসে দেবী দুর্গাকে পৃথিবীর বুকে সাদরে স্বাগত জানাতে বাঙালি এ কদিন মেতে থাকে। চার চারটি মহাদেশে দেবী দুর্গার আগমন চাক্ষুষ দেখে এবং নিজে উপভোগ করে বুঝেছি ভারতবর্ষের বাইরে থেকেও কলকাতা থেকে অনেক দূরে থেকেও কি ভাবে পুজোর এই ক’টা দিন নির্ভেজাল আনন্দে আত্মহারা হয়ে কেটে যায়।

কলকাতার পুজোয় গত কয়েক বছরে থিম পুজোর যে আধিপত্য সেসব থেকে অনেক দূরে বিদেশের মাটিতে বাঙালির দুর্গাপুজোগুলোর আয়োজন। বিদেশে পুজো গুলোর ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায় সামান্য শোলার কাজ, বা চকমকে কিছু কাপড় বা ফুল দিয়ে দেবীর চারপাশ সাজিয়ে গুছিয়ে সামান্য আয়োজনে পুজো সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে জাকজমক আর দেখনদারী কোথাও কাজ করেনা। বরং কাজ করে নিজেদের হাতেই ঠাকুরকে সাজিয়ে তোলার যৌথ প্রয়াস। সারাদিন অফিস সামলে বাড়ি ফিরে কিংবা সপ্তাহের শেষে কয়েক জন মিলে মিশে তৈরির মধ্যে একটা দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ মানসিকতায় প্রস্তুত হয়ে যায় সব কিছু।

আরও পড়ুন: উৎসব বদলাল বিষণ্ণতায়, বজ্রপাতে প্রাণ গেল ৫ জনের

কলকাতার মত অন্য কারিগর এসে সব কিছু করে দেবে বা প্যান্ডেল বেঁধে দেবে এমন কিছুই বিদেশে হয় না। ঠাকুরের মূর্তিগুলোও আয়তনে অনেক ছোট হয়। প্রতি বছর বিসর্জন হওয়ার গল্পও নেই বিদেশে। পুজো হয় একই মূর্তিতে পাঁচ থেকে দশ বছর। অনেক টাকা খরচ করে কুমোরটুলি থেকে জাহাজে করে ঠাকুর বিদেশে পাড়ি দেন এবং পুজোর শেষে বিশেষ উপায়ে ধুলো বালি মুক্ত কোনও স্টোরেজে সংরক্ষিত থাকেন পরের বছর গুলোতে পূজিত হওয়ার জন্য। বিসর্জনের সাথে পরিবেশ দূষণের যে বিপুল যোগাযোগ, বিদেশের পুজো তাই সে দিক থেকে পুরোপুরি পরিবেশ সচেতন।

আমেরিকাতে পুজো হতে দেখেছি ওখানকার মন্দিরে। হিন্দু মন্দিরের ভেতর বিশাল হলঘর ভাড়া নিয়ে সেখানেই নিজেদের গ্যারেজ থেকে ঠাকুরের মূর্তি এনে পুজো সম্পন্ন হয়েছে। আবার নতুন পুজোর শুরুও হয়েছে আরও কিছু বাঙালির হাত ধরে। বড় বড় পিচ বোর্ডে মানুষের থেকে লম্বা ঠাকুরের ছবি এঁকে এবং একরিলিক্ রং করে ঠাকুর বানানো হয়েছে। আমেরিকার কাপড়ের দোকান ঘুরে ঘুরে চকমকে কাপড় কিনে সে সব দিয়ে ঠাকুরের শাড়ি জামা কাপড় বানিয়ে ঠাকুরকে পরানো হয়েছে। জরি দিয়ে বানানো হয়েছে গয়না। নিজেদের হাতে ঠাকুর তৈরি করার যে কি আনন্দ তা ওই পেনসিলভানিয়া পিটস বার্গের সেই পুজোতে না থাকলে বুঝতাম না।

ঠাকুর রং করায় সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করার পর মহালয়ার দিন দেবীর চক্ষু দান করার দায়িত্ব পালনের মুহূর্ত এখনও মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বল।

এবারের পুজো কাটছে কানাডার টরেন্টো শহরে। বিখ্যাত টরেন্টো কালীবাড়িতে ষষ্ঠীর সন্ধে কাটিয়ে মনে হল যেন কোনও ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ির পুজোতে বসে রয়েছি। যেখানে পুজোর আচার নিয়মাবলী সুন্দর ও সুষ্ঠ ভাবে মেনে চলা হচ্ছে। কোথাও কোনও অতিরিক্ত আড়ম্বর নেই। টরেন্টোতে দীর্ঘ দিন ধরে যে সব বাঙালিরা রয়েছেন তাঁদের তত্ত্বাবধায়নে সমস্ত ব্যবস্থা হয়েছে পুজোর আয়োজনের।

কালীবাড়ির পাশেই আয়াতকার সাদা রঙের বিশাল একটা তাঁবুর মতো ঘর তৈরি হয়েছে। এই ঘরটি তাঁবুর কাপড়ের মতই প্লাস্টিকের। ভেতরে যারা ঠাকুর দেখতে এসেছি দশ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠাণ্ডাতে জ্যাকেট সোয়েটার চাদরে নিজেদের গরম রাখার চেষ্টা করছি। কিন্ত সঙ্গে আছে লম্বা লম্বা আগুন জ্বালানো থাম, যার ওপরে গ্যাসের আগুনে পুরো তাঁবুর ভেতরটা গরম রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অসাধারণ মন্ত্র পড়ে অধিবাস অনুষ্ঠিত হল। এই টরেন্টো কালীবাড়িতে রোজ কলকাতার পাঁজির সময় ধরেই দুর্গাপুজো এই কদিন ধরে সম্পন্ন হবে। সাথে কালীপুজোও পালিত হবে আসল মন্দিরে প্রতিদিনই। মা দুর্গার প্রতিমাটি নিজে হাতে তৈরি করেছেন এখানের এক দীর্ঘ দিনের বাসিন্দা শ্রীমৃণাল দত্ত রায়।

আরও পড়ুন: নিখিলকে সঙ্গে নিয়ে অষ্টমীতে অঞ্জলি দিলেন নুসরত

কলকাতার এই বাঙালি পুনেতে ৫ বছর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ করে ১৯৭২ সালে জার্মানি থেকে কানাডায় আসেন। তারপর এখানেই কেটে গেছে পুরো জীবন। অ্যালুমিনিয়ামের তার, খড় বা hay, আর মডেলিং ক্লে দিয়ে নিজে হাতে বানিয়েছেন কালীবাড়ির ঠাকুর। এক বন্ধুর ইচ্ছা রাখতে বানিয়েছেন আর একটি ডাকের সাজের ঠাকুরের মূর্তি। গত বছর ডাকের সাজ মূর্তি পূজিত হয়েছিল এবং আবার পরের বছর হবে। এবারে অন্য মূর্তিটি পূজিত হচ্ছে। এক একটি ঠাকুর বানাতে ছয় মাস সময় লাগে। ঠাকুরকে শাড়ি গয়না পরাতে পাশে পান সাহায্যের হাত অন্যদের।

এক মাত্র ছেলে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ার, ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার এজেন্সি ভিয়েনাতে চাকরির সূত্রে থাকেন আর তাই বাবার সাথে ঠাকুর তৈরিতে থাকতে পারেন না আর্টে উৎসাহ থাকলেও।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে যখন ছিলাম তখন এভাবেই দেখেছিলাম সিডনিবাসী পার্থ দাসের নিজের হাতে বানানো ৩ মিটার উচ্চতার নরম কাঠের তৈরি প্রতিমা। ২০০৭ সালে পার্থদার বানানো সেই ঠাকুরই উত্তরণের পুজোর প্রধান আকর্ষণ। তবে সব ঠাকুরই যে হাতে বানানো তা নয়। বেঙ্গলি এসোসিয়েশন নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রতিমা এসেছিল কলকাতা থেকেই।

আসলে জায়গা বদলে যায়, দেশ বদলে যায়।

আরও পড়ুন: মণ্ডপের মধ্যেই আজান, কর্মকর্তাদের নামে এফআইআর

কিন্তু কিছু জিনিস থেকে যায় একই। ইংল্যান্ডের বার্কশায়ারের RBBA এর পুজোর আয়োজনে ঠিক এরকমই একটা সাদা তাঁবু ছিল। কানাডার টরন্টোর তাঁবুর ভেতর আর ইংল্যান্ডের তাঁবুর ভেতর মানুষ গুলো শুধু আলাদা। কিন্তু আয়োজন আর আতিথেয়তায় বাঙালি সব সময় একই। কলকাতায় থাকলে যে সব বাঙালি প্যান্ডেল এ ঠাকুর দেখে কাটাত অফিসের বড় বাবু মেজো বাবু বা ছোট বাবুরাই এখানে নিজেরা হাতে তুলে নিয়েছেন চারশো থেকে আটশো মানুষের রান্নার দায়িত্ব। শুধু রান্না নয়, পরিবেশন করার জন্য প্রত্যেকটা জায়গায় থাকে আবার একটি আলাদা টিম।

এত সুন্দর ভাবে সমস্ত দায়িত্ব যারা সামলান তারা কমিটিতে থেকে সত্যিতেই পুজোর কদিন গায়ে গতরে খেটে পুজোকে সর্বাঙ্গীন ভাবে সুন্দর করে তোলেন। দেশে যে কাজগুলো অন্য কর্মী ভাড়া করে করিয়ে নেওয়া হয় বিদেশে কিন্তু সব কিছু নিজের হাতেই করতে হয়। আর তাই কোথাও যেন আরও বেশি আত্মিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে পুজোর আনন্দের সাথে।

বাংলার থেকে অনেক দূরে জন্মে শৈশব কাটানো ছোট বাচ্চারা পুজোর সময় যে ভাবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিজেদের মাতিয়ে রাখে তাতে তাদের মধ্যে বাংলা চর্চার বীজ বপন করে দেওয়ার জন্য তাদের অভিভাবকদের অবশ্যই সাধুবাদ দিতে হয়।

অনেকেই তাদের ভাঙা বাংলা বলা নিয়ে বা উচ্চারণ নিয়ে ব্যঙ্গ পরিহাস করে থাকলেও আসলে বাংলা সংস্কৃতিকে দূর দেশে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব কিন্তু এই নতুন প্রজন্মই করবে। তাই ভাঙা বাংলা হলেও তা বাংলা– আর দূর দেশে বসে সেটা সেই সব বাচ্চাদের জন্য অনেক।

সৃজিত মুখার্জির উমা সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছিল কি করে একটি মৃত্যুপথযাত্রী ছোট্ট মেয়ের কলকাতার দুর্গা পুজো দেখার ইচ্ছা পূরণ করা হয়েছিল সমস্ত প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে। টরেন্টোবাসী একটি ছেলের ক্রিসমাস দেখার শেষ ইচ্ছা পূরণ করার সত্যি ঘটনা অবলম্বনে সৃজিত তৈরি করেছিলেন এই মর্মস্পর্শী সিনেমাটি।

আরও পড়ুন: নেই রাজা-রাজত্ব, রয়ে গিয়েছে প্রাচীন মল্লরাজাদের কামান দেগে দুর্গা পুজোর রীতি

সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছিল উমার বাবা কপর্দক শূন্য হয়েও কয়েকটি প্যান্ডেল বানিয়েছিলেন। একটি বিশাল বাজেটের সিনেমা হয়েও সৃজিত আসল দুর্গা পুজো প্যান্ডেলেই শুটিংগুলো করেছিলেন। সত্যিতে একটা ক্রিসমাস একটক শহরে ২৫ শে ডিসেম্বরের আগে কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা গেলেও বাঙালির দুর্গাপুজোর আড়ম্বর ওই ভাবে কৃত্রিম ভাবে প্রস্তত করা কোনও ভাবেই সম্ভব নয় ব্যয় বহুলতার জন্যই। দেশে এবং কলকাতায় এবার সময় এসেছে এই অত্যধিক আড়ম্বরকে বর্জন করার।

বাঙালি যত দিন থাকবে বিদেশের যে কোনও জায়গাই হোক দুর্গাপুজো থাকবেই। দেশেও থাক কিন্তু অন্যভাবে থাক। নইলে বিদেশের পুজো এগিয়ে থাকবে অনেক দিক থেকেই। কলকাতার থিম পুজোর অনাবশ্যক খরচ, এত বড় দুর্গার বিজ্ঞাপনী আবরণে মুখ ঢাকা দুর্গা, সোনার বা হীরের গয়নার চাকচিক্য মোড়া দুর্গা এই সব কিছুর থেকে অনেক অনেক দূরে অনেক বেশি আতিথেয়তা নিয়ে দুর্গাকে আহ্বান জানাবে বিদেশের বাঙালি।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

করোনা পরিস্থিতির জন্য থিয়েটার জগতের অবস্থা কঠিন। আগামীর জন্য পরিকল্পনাটাই বা কী? জানাবেন মাসুম রেজা ও তূর্ণা দাশ।