ঝাড়গ্রাম: কারও কাছে তিনি বনদেবী৷ আবার কারও কাছে বনদুর্গা৷ আবার কেউ তাকে ভক্তিভরে ডাকেন গুপ্তমনি৷ ঝাড়গ্রাম শহর থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরে ছ’নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে গুপ্তমনির মন্দির৷ দুর্গাপুজোর সময় এখানে এক অন্য পুজোর ছবি৷ পুজোর মূল উদ্যোক্তা স্থানীয় শবর, লোধা সম্প্রদায়ের মানুষ৷ তবে মাকে দেখতে দূর দূর থেকে মানুষ আসেন এখানে৷

নাম গুপ্তমনি৷ গোপনীয়তাই বোধহয় এই দেবীর পছন্দের৷ মন্দিরের ভিতর কোনও বিদ্যুতের আলো নেই৷ স্থানীয়রাই জানালেন, কোনও লাইট লাগানো হলে তা তো বেশিদিন টেকেই না৷ আসলে মা বোধহয় হাল্কা আলো পছন্দ করেন৷ তাই প্রদীপ কিংবা মোমের আলোতেই মাকে রাখা হয়৷ গুপ্তমনির ভক্তদের বিশ্বাস, এই মন্দিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কেউ যদি মাকে স্মরণ করে তাঁর কাজে সিদ্ধি আসে৷ সাফল্য আসে৷ একেবারে সাদামাটা মন্দিরে মায়ের বিরাজ৷

এখানে কোনও ব্রাহ্মণ দিয়ে পুজো করানোর রেওয়াজ নেই৷ লোধা, শবর সম্প্রদায়ের লোকজনই মায়ের পুজো করেন৷ দেবীর এখানে পাথরে অধিষ্ঠান৷ প্রায় ৪৫০ বছরের পুরানো এই পুজো৷ লোকমুখে শোনা, ঝাড়গ্রামের রাজা নরসিংহ মল্লদেব এই মন্দির নির্মান করেছিলেন৷ প্রথম থেকে, লোধা, শবর সম্প্রদায়ের মানুষের কাছ থেকে পুজো গ্রহণ করেন মা৷

গুপ্তমনি মায়ের পূজারি সুনীল ভক্তা, চন্দ্রাণী ভক্তারা জানান, ৪৫০ বছর আগে নন্দলাল ভক্তা নামে একজন জঙ্গলে গরু নিয়ে গিয়েছিলেন৷ গরু চরাতে চরাতে ক্লান্ত নন্দলাল গাছের তলায় আশ্রয় নেন৷ ক্লান্তিতে চোখ লেগে গিয়েছিল তাঁর৷ স্বপ্ন দেখেন মা গুপ্তমনিকে৷ বাড়ি ফিরে মা ও স্ত্রীকে স্বপ্নাদেশের কথা জানান৷ কিন্তু মা বলেছিলেন, জঙ্গলে ভূত আছে না যেতে৷

এদিকে সেদিন রাতে ফের মা স্বপ্নাদেশ দেন নন্দলালকে৷ বলেন, তিনি দেবী, ভূত নন৷ মা এও বলেন, নন্দলালের হাত থেকেই জল তুলসি নেবেন তিনি৷ পরদিন সকালে যে গাছের তলায় শুয়ে নন্দলাল প্রথম স্বপ্নাদেশ পান, সেখানেই মাকে প্রতিষ্ঠা করেন৷

এর কিছুদিন পরই ঝাড়গ্রামের রাজা নরসিংহ মল্লদেবের আদরের হাতি পাগল হয়ে কোথায় হারিয়ে যায়৷ অনেক খুঁজেও তার সন্ধান মেলেনি৷ এরপরই গুপ্তমনি স্বপ্নাদেশ দেয় রাজাকে৷ মায়ের কাছেই রয়েছে মল্লদেবের আদরের হাতি৷ এই খবর পেয়ে রাজা নন্দলালের বাড়িতে যান৷ নন্দলাল তাকে গিয়ে যায় সেই গাছের তলায়৷ মন্ত্র, আরাধনায় এনে দেয় হাতিটিকেও৷

এরপরই রাজা নির্দেশ দেন মায়ের মন্দির তৈরি করে দেওয়ার জন্য৷ মা যেহেতু সেখানে গুপ্ত থাকেন, তাই মন্দিরের নাম দেওয়া হয় গুপ্তমনি৷ দেবীই বলেছিলেন শবরদের হাত থেকে পুজো নিতে চান তিনি৷ তবে দুর্গাপুজোর সময় রাজবাড়ি থেকে শাড়ি, পলা এবং ফুল এলে তবেই মায়ের পুজো শুরু হয়৷ আড়ম্বর না থাকলেও এ পুজো ভক্তিতে ভরপুর৷ এই অলৌকিক দেবীর মন্দিরের দেওয়ালে বহু গল্প আঁকা৷ কোথাও রামায়নের কাহিনী, কোথাও বা দুর্গার আগমনীর গল্প, কোথাও আবার পার্বতী-মহাদেবের কৈলাশের চিত্র৷