নয়াদিল্লি : একটা জার্নি। তাতে লড়াইয়ের গল্প ঠাসা। সে লড়াই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার, সে লড়াই একমাত্র শিশুসন্তানকে বড় করে তোলার, সে লড়াই দেশের প্রথম মহিলা অভিনেত্রী হয়ে অভিনয়কে ভালবাসার। আর নিজের ভালবাসার দাম দিতে গিয়ে দুর্গাবাই কামাত হয়ত বুঝেছিলেন জীবনের সারসত্য।

নারী স্বাধীনতার দৃষ্টান্ত হয়ে ইতিহাসের খাতায় জ্বলজ্বল করছে দুর্গাবাই কামাতের নাম। তবু তাঁর সম্পর্কে বিশেষ তথ্য মেলে না। তাঁর কন্যা কমলাবাই গোখলের এক সাক্ষাতকার থেকে জানা যায় এক লড়াকু মহিলার ইতিকথা। তিনি দুর্গাবাই কামাত। ভারতীয় সিনেমার প্রথম মহিলা অভিনেতা। শুধু তাই নয়, সেই যুগের একজন সিঙ্গল মাদার।

বিশ শতকের একদম গোড়ার দিকের কথা। ভারতীয় সিনেমার আদিপুরুষ দাদাসাহেব ফালকে তখন নিজের সিনেমা রাজা হরিশ্চন্দ্র (১৯১৩) –এর জন্য হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন একজন মহিলা অভিনেত্রী। যিনি হরিশ্চন্দ্রের স্ত্রী তারামতীর ভূমিকায় অভিনয় করতে পারবেন। কিন্তু খোঁজাই সার। সেই সময় সব লোকলজ্জা ও অপবাদের ভয় পিছনে ফেলে এগিয়ে এসেছিলেন দুর্গাবাই কামাত।

আশ্চর্যের বিষয় ছিল কোনও মহিলা নয়, পুরুষদের বিরোধিতা সহ্য করতে হয়েছিল তাঁকে। কারণ যে সময়ের কথা বলছি, তখন পুরুষরাই নারী সেজে অভিনয় করতেন। সেই পুরুষতান্ত্রিকতা ও একাধিপত্যকে খানখান করে দিয়েছিলেন দুর্গাবাই কামাত একা।

১৮৭৯ সালে জন্ম দুর্গাবাই কামাতের। সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনার সুযোগ পেয়েছিলেন। তারপরেই বিয়ে যায় আনন্দ নানোস্কারের সঙ্গে। আনন্দ ছিলেন জেজে স্কুল অফ আর্টসের ইতিহাসের শিক্ষক। তাঁদেরই কন্যা কমলাবাই। তবে সেই বিয়ে বেশিদিন টেঁকেনি। ১৯০৩ সালে ঘর ছেড়ে সন্তানকে নিয়ে বেড়িয়ে আসেন দুর্গাবাই। নিজের সন্তানকে একাই মানুষ করার সিদ্ধান্ত নেন।

সেই সময় মহিলাদের জন্য কোনও চাকরি ছিল না। ফলে সন্তান মানুষ করা কঠিন হয়ে পড়ে তাঁর কাছে। একমাত্র গৃহ সহায়িকা হিসেবে কাজ করার সুযোগ ছিল তাঁর সামনে। অথবা একজন দেহব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করার করার সুযোগ ছিল। তিনি অভিনয়কে বেছে নেন নিজের জীবিকা হিসেবে। যা সেই যুগে দেহব্যবসারই সামিল ছিল। ফলে বিতাড়িত হতে হয়েছিল ব্রাক্ষ্মণ কুলীন সমাজ থেকেও।

দুর্গাবাই থিয়েটার কোম্পানিতে যোগ দেন। যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে অভিনয় করত। তাঁদের সঙ্গেই ঘুরতেন দুর্গাবাই ও তাঁর সন্তান। সেইভাবেই মেয়েকে পড়াশুনা শেখান দুর্গাবাই। যাতে শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারেন কমলাবাই। এরপরেই দুর্গাবাইয়ের সামনে আসে দাদাসাহেব ফালকের ভস্মসুর মোহিনী (১৯১৪) সিনেমায় কাজ করার সুযোগ।

রুপোলি পর্দায় আবির্ভাব হয় তাঁর। শুধু তিনিই নন, তাঁর কন্যা কমলাবাইও এই ছবিতে কাজ করার সুযোগ পান। যিনি ভারতের প্রথম শিশু শিল্পী হিসেবে বিবেচিত হন। এরপরেই শুরু হয় অভিনয় জীবনে দুর্গাবাইয়ের যাত্রা। অনেক উত্থান পতনের সামনে পড়ে লড়াই ছাড়েননি এই মহিলা। একা লড়ে গিয়েছেন পুরুষ একাধিপত্যের বিরুদ্ধে। তবু আজ সেভাবে উচ্চারিত হয় না তাঁর নাম। কালের অতলে প্রায় বিস্মৃত দেশের প্রথম মহিলা অভিনেত্রী ও সিঙ্গল মাদার দুর্গাবাই কামাত।

সপ্তম পর্বের দশভূজা লুভা নাহিদ চৌধুরী।