সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: দুর্গা পুজো কিভাবে হবে তার পরিকল্পনা এখনও স্পষ্ট নয়। অনেক বনেদি বাড়ি এখন পুরো বিষয়টা আলোচনার মধ্যে রেখেছে। বোধন কীভাবে হবে তা নিয়ে ভেবে আকুল আম জনতা। তার আগেই হয়ে গেল দুর্গা বিসর্জন। দুর্গা পারি দিলেন কৈলাশ। ফের ফিরবেন শারদ প্রাতে। এমনই অভিনব হাওড়া উলিবেড়িয়া নোনার ব্যানার্জি বাড়ির পুজো।

গ্রামের নাম নোনা, একেবারে উলুবেড়িয়ার অভ্যন্তরে। সেখানেই আজ থেকে ১৫০ বছর আগে শুরু হয় বন্দ্যোপাধ্যায়দের দুর্গোৎসব। জানা গেল এমন এক শ্রাবণে সে বাড়ির কর্তা ঠাকুরকে বিদায় জানিয়েছিলেন। সেই থেকে সেই নিয়ম মেনে সারা বছর থেকে শ্রাবনের শেষে দুর্গা পাড়ি দেন বাপের বাড়ি। তাড়াতাড়ি ফিরে আসেন আশ্বিন মাসে। বলা যেতেই পারে এ দুর্গা স্বামীর ঘর কম করেন। ব্যস্ত থাকেন বাপের ঘর সামলাতে।

সে বাড়ির কর্তার বয়স তখন মেরেকেটে দশ কি, এগারো বছর। মাটি নিয়ে ঠাকুর গড়ার খেলা খেলতেন। পূজোও করতেন নিজেই। মা বারণও করতেন। বলতেন বেচো, ঠাকুর নিয়ে খেলা করতে নেই। কিন্তু সেই ছোটবেলার ঠাকুরই কালে তাঁদের পারিবারিক পূজোয় পরিণত হ’ল।

ছোটবেলার বেচো স্বনামে খ্যাত হলেন যোগীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে। ভাই বোনদের মধ্যে তিনিই জ্যেষ্ঠ। দ্বার পরিগ্রহ করলেন না, আজীবন কুমার রয়ে গেলেন, নামের মধ্যে নাথ ধারণ করে। বর্ধিষ্ণু পরিবার নয়, সাধারণ গৃ্হস্থ পরিবার। যোগীন্দ্রনাথ চাকরি করতেন হাওড়া কোর্টে। খুব সৎ জীবন যাপন করতেন।

উলুবেড়িয়ার বিদ্বৎসমাজে তাঁর খ্যাতি ছিল। তিনি তাঁদের পরিবারের পূজোর প্রতিষ্ঠাতা। সকালে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার আগে তিনি গুটিকয় দশম শ্রেণীর ছাত্রকে পড়াতেন পূজামন্ডপের বারান্দায়। প্রধানত ইংরেজি পড়াতেন তিনি। তাঁর পড়াবার ধরন এত সুন্দর ছিল যে লোকে বলত এনার হাতে গাধাও পাশ করে যায়।

অথচ তিনি সেকালের ম্যাট্রিক পাশ করা ব্যাক্তি ছিলেন। সে আজ প্রায় শ দেড়েক বছর আগেকার কথা। যোগীন্দ্রনাথ পারিবারিক পূজার প্রচলন করলেন। এঁদের পূজার বৈশিষ্ট্য হল, প্রতিমা নিজেরাই নির্মাণ করতেন এবং পূজাও নিজেরাই করতেন। প্রতিমা নির্মাণে ও পূজায় যোগীন্দ্রনাথের প্রধান সহায়ক ছিলেন তাঁর তৃতীয় ভ্রাতা ডাঃ চন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

চন্ডীচরণ পেশায় ছিলেন হোমিও চিকিৎসক। মাটির দেওয়াল এবং টিনের ছাউনি দেওয়া চারচালা মন্ডপ। পরিবারের পূজার আরো একটি বৈশিষ্ট্য হল, এরা দশমীর দিনেই প্রতিমা নিরঞ্জন দেন না। সারা বৎসরই প্রতিমা থাকে এবং নিত্যসেবা হয়। পরের বছর নতুন প্রতিমা তৈরীর আগে পূর্ব বৎসরের প্রতিমা বিসর্জন দেন।

প্রতিমা নিরঞ্জন হয় শ্রাবণ মাসের শুক্লা দ্বিতীয়াতে। দুর্গাপূজা ছাড়াও এই পরিবারে শ্যামাপূজা এবং অন্যান্য পূজাও হয় এবং সমস্ত প্রতিমা নিজেরাই নির্মাণ করতেন। বর্তমানে যারা আছেন তারা আর নিজেরা প্রতিমা তৈরী করতে পারেন না, কারিগর দিয়ে তৈরি করান। এই পূজা নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে আজও চলে আসছে।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ