সুপর্ণা সিনহা রায়, টরোন্টো: সময়ের পার্থক্য প্রায় দিন রাতের৷ মনের পার্থক্য নেই৷ কলকাতা থেকে দূরত্বও অনেক কিন্তু প্রাণের দূরত্ব নেই৷ পুজোর সময়ে কানাডার বাঙালিরা এভাবেই সেখানেই বসিয়ে ফেলেছেন ছোট ছোট কলকাতা৷ কানাডার বিভিন্ন জায়গায় থাকা বাঙালিরা নিজেদের মত করে পালন করলেন দুর্গোৎসব৷

পুজো শুরুর আগের সপ্তাহেও কানাডার আকাশ ছিল মেঘে ঢাকা৷ সঙ্গে ছিল হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা হাওয়া৷ মা আসবেন আর তাঁর সন্তানেরা মজা করতে পারবে না তা তো হতে পারে না৷ ঠিক পুজোর আগেই যেন মা দুর্গা আশীর্বাদ সঙ্গে নিয়েই আসলেন৷ ঝলমলে হয়ে উঠল পুজোর কদিন৷ পুজোর শুরুর আগেই টরোন্টো ও পার্শ্ববর্তী শহর গুলির দুর্গাপুজোর নির্ঘণ্ট প্রকাশ করা হয়৷ তার মধ্যে ছিল প্রবাসী বেঙ্গলি কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন(PABC), টরোন্টো কালীবাড়ি,বঙ্গীয় পরিষদ, বাংলাদেশ-কানাডা হিন্দু মন্দির, হিন্দু ধর্মাশ্রম, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ, টরোন্টো দুর্গাবাড়ি, বেদান্ত সোসাইটি, বঙ্গ পরিবার, আমার পুজো, টরোন্টো উৎসব কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন, সাগর পাড়ে, এমানুয়েল ইউনাইটেড চার্চ প্রভৃতি৷

কানাডায় কলকাতারা পুজোর নির্ঘণ্ট মেনে পুজো হতে পারেনা কারণ পুজোর ছুটি মেলেনা৷ বিদেশে প্রায় সব জায়গাতেই পুজো করতে হয় সপ্তাহান্তে৷ তারিখ কখনও কলকাতার পুজোর আগে কখনও পরে৷ কেউ মহালয়া পালন করেছেন ৬ই ৭ই অক্টোবর কেউ ৮ই কেউ ১৩ কিমবা ১৪ই অক্টোবর৷ কোথাও পুজো শুরু হয়েছে ১৩ তারিখ, কোথাও ১৩ থেকে ১৪ আবার কোথাও ১৫ থেকে ১৮ তারিখ৷ ১৭ থেকে ১৯ তারিখ পুজো হয়েছে ‘বেদান্ত সোসাইটি’তে৷ ‘সাগর পাড়ে’র পুজো হয় ১২ই অক্টোবর৷ ভারত সেবাশ্রমের পুজো হয় ১৫ থেকে ১৮ই অক্টোবর৷ সবে মিলে পুরো মাসটাই প্রায় এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে মা দুর্গার আরাধনা চলেছে কানাডায়৷

টরোন্টো থেকে একশো কিলোমিটার দূরে হ্যামিলটন৷ সেখানেই পুজো সারল ‘সাগরপাড়ে’৷ পুজোর কদিন প্রায় চারশো মানুষ আসেন পুজো দেখতে৷ পুজো এবং খাওয়াদাওয়ার পরে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান৷ পাশাপাশি চলতে থাকে ঢাকের তালে মহিলাদের ধুনুচি নাচ৷ ওকভিলের সেন্ট ভলেদিমোর সেন্টারে পুজো হল ‘বঙ্গ পরিবারের’ মা দুর্গার৷ কালচারাল কমিটির দুই সদস্য প্রীতম চৌধুরি ও হীরক ভট্টাচার্য জানান, আমাদের পুজোর চতুর্থ বছর এটি ৷ ২০১৫ তে শুরু হয় পুজো৷ সেবছরই প্রতিমার রঙ করা হয় কালো৷ দেশের বাইরে কৃষ্ণবর্ণা মা দুর্গা পৃথিবীতে প্রথম তাঁরাই করেন বলে দাবি তাঁদের৷ হীরক বাবু জানান”আমাদের ভিড় আজ প্রায় ন’শোর কাছাকাছি৷ আমরা প্রায় ৩৫ টি পরিবার মিলে এই পুজো করি৷ যদিও এখন ৩৭ থেকে ৪০টি পরিবার রয়েছেন৷ পুজোর সময় সদস্য সংখ্যা একটু বাড়ে৷ সদস্য সংখ্যা এখন একশো পার করে গিয়েছে৷ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয় সন্ধ্যে ৬টা থেকে রাত ১২ পর্যন্ত৷”

মিসিসাগায় পুজো করল ‘আমার পুজো’ কমিটি৷ স্বাগত ব্যাঙ্কোয়েট হলে হয় পুজো৷ ১৩ ও ১৪ই অক্টোবর দুদিন ধরে চলে মাতৃ বন্দনা৷ এই পুজোর এক কর্মকর্তা শুভদীপ মৈত্র জানান, “আমাদের আট বছরের পুরনো পুজো৷ ২০১১ সালে প্রথম পুজো হয়৷ এখন একশো সত্তর জন সদস্য রয়েছেন৷ এছাড়াও আমাদের বন্ধু বান্ধব ও এখানে যত বাঙালি আছেন সকলেই আসেন পুজোয়৷ দুদিনের পুজোয় দুই থেকে আড়াই হাজার মানুষ আসেন৷” সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সদস্যদের পরিবারের নিজস্ব অনুষ্ঠানও যেমন থাকে তেমনই বাইরের শিল্পীদের নিয়ে গিয়েও অনুষ্ঠান করা বলিউড আর্টিস্ট নাইটও হয় বলে জানান তাঁরা৷

‘কালীবাড়ি’র পুজো হয় ১৫ই অক্টোবর থেকে ১৮ই অক্টোবর৷ অষ্টমী তিথিতে হয় কুমারী পুজোও৷ চামর দুলিয়ে পূজারি সারলেন সন্ধি পুজো৷ এভাবেই কানাডার টরোন্টো ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় দেবী বন্দনা ও পুজো সারলেন বাঙালিরা৷ বিদায় বেলায় সর্বত্রই বাজল বিদায়ের সুর৷ মহিলারা দশমীতে আলতা সিঁদুর দিয়ে মিষ্টিমুখ করিয়ে বিদায় দিলেন মা কে৷ রইল পরের বছরের অপেক্ষা৷ আবার সকলের একত্র হওয়ার অবকাশ মিলবে৷ এভাবেই আবার আসবেন উমা৷ তাঁকে ঘিরে আবার হবে হই হই নাচ গান খেলা আর অনেক অনেক আনন্দ৷