সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে রুপোলি পর্দার ‘নায়ক’ অরিন্দম (উত্তমকুমার) হতাশ করেছিলেন তার পুরনো বন্ধু ট্রেড ইউনিয়ন করা বীরেশকে (প্রেমাংশু বসু)৷ অমন পরিস্থিতি ছবিতে এক ম্যাটিনি আইডলকে দোটানায় ফেলেছিল৷ কারণ নিজের ভাবমূর্তি বাঁচিয়ে রাজনীতির সংসর্গ এড়িয়ে থাকার প্রবণতার সঙ্গে নিজের বিবেক দংশন তাকে বড্ড অস্বস্তিতে ফেলেছিল৷ যার জন্য তার অনেক পরেও সে ঘটনার কথা তাঁর মাথায় ঘুরপাক খেত৷ আসলে নায়কদের জীবনে রাজনৈতিক সামাজিক চাপ সব সময় এসে পড়ে ৷

তবে বাস্তবজীবনে উত্তমকুমার প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে এমন একটা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হয়েছিলেন যাতে তাঁকে ছবির অরিন্দমের চেয়েও আরও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল৷ এমনই পরিস্থিতি যে, তিনি মুখ খুলতেই পারেননি, এমনকি বাধ্য হয়েছিলেন কলকাতা ছেড়ে রাজ্যের বাইরে গিয়ে কিছুদিন থাকতে ৷ তখন রাজনৈতিক চাপে মহানায়কের ভুবন ভোলানো সেই হাসিটাই যেন কিছুদিনের জন্য উবে গিয়েছিল৷

 

বলা হয়ে থাকে উত্তমকুমারকে মাথায় রেখেই সত্যজিৎ রায় ‘নায়ক’ ছবিটি করার কথা ভেবেছিলেন৷ তাই একমাত্র তাঁকে দিয়েই অরিন্দম চরিত্রটি করাবেন ঠিক করেছিলেন পরিচালক৷ যার ফলে ‘নায়ক’ ছবির অরিন্দম চরিত্রটির সঙ্গে উত্তমকুমারে বেশ কিছু মিলও অনেকে খুঁজতে চান৷ ছবিতে তুলে ধরা হয় চূড়ান্ত খ্যাতি পেয়েও একজন অভিনেতা কতটা একা, সব সময় নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন৷ না চাইলে এমন কিছু করতে হয় যা মন থেকে মেনে নেন না৷ ‘নায়ক’ ছবিটি হয়েছিল ১৯৬৬ সালে আর তার থেকে বছর পাঁচেক বাদে ময়দানে সরোজ দত্তের মৃত্যু হয় ৷ রাজ্যে তখন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের আমল৷

প্রাক্তন এই মুখ্যমন্ত্রী বিখ্যাত(পড়ুন কুখ্যাত) নকশাল দমনের জন্য৷ সেসময় সন্দেহভাজন মনে হলেও কোনও রকম গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়াই পুলিশ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যেত লোকেদের৷ আর তারপর তাদের ময়দানে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হত৷ পুলিশ ভ্যান থেকে নেমে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেই পিছন থেকে তাদের গুলি করে মারা হত৷ বলা হত ওরা পালানোর চেষ্টা করায় বাধ্য হয়ে পুলিশ গুলি চালিয়েছে৷ সাধারণত ভোরেই দিকে ফাঁকা জায়গাই বেছে নেওয়া হত এমন কুকর্ম সম্পাদনের জন্য ৷

এরকম ভাবেই ১৯৭১ সালের ৫ অগস্ট ভোরে ময়দানে পুলিশ গুলি করে মেরেছিল নকশাল নেতা তথা কবি সরোজ দত্তকে৷ শোনা যায় ঠিক ওই সময় সেখানে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন উত্তমকুমার৷ তাঁর চোখের সামনে এমন নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড ঘটায় তিনি ভীষণভাবে একটা ট্রমার মধ্যে ছিলেন ৷ শোনা যায় তারপর তিনি নাকি প্রাতঃভ্রমণ বন্ধ করে দেন৷ পর পর কয়েকদিন শুটিংয়েও যেতে পারেননি৷ এমনকি কিছুদিনের জন্য তিনি রাজ্যের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হন৷ মহানায়কের এই পলায়নী মনোভাবের জন্য অনেকে তাঁর সমালোচনা করে থাকেন৷ বিশেষত নকশাল মনোভাবাপন্ন মানুষেরা হতাশ হন তাঁর এই আচরণে৷ প্রশ্ন তোলেন, কেন তিনি সাহস করে মুখ খুলতে পারলেন না?

মনে রাখা দরকার উত্তমকুমারের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার জন্য হাতছানি ছিল৷ কিন্তু রুপোলি পর্দার জগৎ ছেড়ে তিনি কখনই রাজনীতির আঙিনায় প্রবেশ করতে উৎসাহ দেখাননি৷ সেদিক থেকে তিনি সবসময়ই নিজেকে স্বতন্ত্র রেখেছেন৷

এটা ঠিক উত্তমকুমার মোটের উপর কংগ্রেসের সমর্থক ছিলেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সেই দলের প্রতি তাঁর অন্ধ আনুগত্য দেখাতে রাজি ছিলেন৷ বরং রাজনীতির ছায়া থেকে তিনি নিজেকে মুক্ত রাখতেই চাইতেন৷ নায়ক ছবিতে অনেকদিন বাদে অরিন্দমের বাড়িতে এসে এক জায়গায় নিয়ে যেতে চান বন্ধু বীরেশ৷ কিন্তু বেরিয়ে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা বুঝতে পেরে গাড়ি ঘুরিয়ে নেয় সে৷ কারণ পুরনো বন্ধু তাকে এক বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিল৷

কিন্তু ছবির সেই ম্যাটিনি আইডল সেখানে যাওয়ার সাহস দেখাতে পারেননি৷ তবে সরাসরি নিজেকে ওই ঘটনার সঙ্গে জড়াতে না চাইলেও নেপথ্য থেকে ওই শ্রমিকদের অর্থ সাহায্য করতে রাজি ছিলেন অরিন্দম৷ যদিও ওই পরিস্থিতিতে এমন প্রস্তাব ট্রেড ইউনিয়ন করা বন্ধুকে খুশি করেনি সেটা তিনিও অনুভব করেছিলেন৷ তাই ভুলতে পারেন না ঘটনাটিকে, অবচেতন মনে মাঝে মধ্যে ঘুরে ফিরে আসে সেই কথা ৷ সেই আচরণ তাঁকে ভাবাত বলেই তার স্বীকারোক্তি ছিল সেদিনে সেখানে না যাওয়ার পিছনে প্রকৃত ভয়টার কারণ কি সেটাও তার কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়৷

সরোজ দত্তের হত্যাকান্ড চোখের সামনে দেখে উত্তমকুমারও ভয় পেয়েছিলেন বলেই মনে হয় ৷ কিন্তু ভয়টা কেন বা কাকে সেটাও তো বোঝা উচিত ৷ একবার অমন নিষ্ঠুর ঘটনা দেখলে যে কোনও মানুষেরই ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক ৷ যে কোনও হত্যাকান্ডের সাক্ষী হয়ে পড়লেই চাপের মুখে পড়তে হয় তা কারও অজানা নয়৷ কারণ তপন সিংহের ‘আতঙ্ক’ ছবিটি যারা দেখেছেন তাদের মনে আছে কোনও হত্যাকান্ড চোখে পড়ার জেরে এক মাস্টারমশাইকে কতটা মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল৷ পথে ঘাটে তাঁকে নানা ভাবে শাসাত অথবা ভয় দেখাত পাড়ার মস্তান হত্যাকারীরা৷

যার ফলে ছবির সেই সংলাপ ‘‘মাস্টারমশাই, আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি’’ দর্শকদের মুখে মুখে ঘুরত সেসময় ৷ আর বাস্তবে সরকার যখন বিদ্রোহ দমনের নাম করে হত্যাকান্ড চালায় আর সেই হত্যালীলার সাক্ষী হয়ে গেলে কেমন চাপের মুখে পড়তে হবে তা বলে বোঝানোর অপেক্ষা রাখে না৷ বিশেষত সরোজ দত্ত হত্যাকান্ডের সময় রাজ্যে ক্ষমতায় সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মতো ব্যক্তিত্ব অর্থাৎ তিনি যে নানা ভাবে চাপসৃষ্টি করে ভয় দেখিয়ে মহানায়কের জীবন অতিষ্ট করে তুলবেন তা বলাই বাহুল্য ৷

ওই হত্যাকান্ডের জন্য সরকারের পক্ষে মিথ্যে সাক্ষী দেওয়ার চাপ ছিল তা বোধহয় বুঝতে আজ কারও অসুবিধা হয় না৷ কিন্তু উত্তমকুমার তাতে রাজি ছিলেন না বরং বার্তা দিয়েছিলেন আদালতে ডাকলে তিনি যা দেখেছেন সেটাই বলবেন৷ বলাই বাহুল্য এমন বার্তায় খুশি হওয়ার কথা নয় অন্তত ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারির পিছনে থাকা যার মাথা বলে পরিচিত মানুবাবুর৷

ওই হত্যাকান্ডের জন্য সরকারের পক্ষে মিথ্যে সাক্ষী দেওয়ার চাপ ছিল তাতে প্রথমে কিন্তু উত্তমকুমার একেবারেই রাজি ছিলেন না৷ বরং বার্তা দিয়েছিলেন আদালতে ডাকলে তিনি যা দেখেছেন সেটাই বলবেন৷ ঠিক ওই সময় মানুবাবুর নির্দেশে ছাত্র পরিষদের এক নেতা তাকে টেলিফোনে শাসায়৷ প্রচন্ড ভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে সেইসব কথা উত্তমকুমার অভিনেতা কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানিয়েছিলেন বলেই জানা যায় এবং তারপরে একেবারে প্রাণভয়ে বম্বে চলে যান। দু’মাস পরে ফিরে এসে জানিয়েছিলেন – তিনি কিছুই দেখেননি। সরকারী খাতায় অবশ্য সরোজ দত্ত আজও ফেরার।

কিন্তু তাঁর এই চলে যাওয়া নায়ক ছবির বীরেশের মতোই বাস্তবে অনেককেই হতাশ করেছিল৷ কারণ তারা মহানায়কের কাছে আশা করেছিল তিনি যথাযথ সাহস দেখিয়ে ঠিক জায়গায় হাজির হয়ে মুখ খুলবেন৷ এখানেও কোনও জানা অথবা অজানা ‘ভয়’ বাস্তবের সঙ্গে রূপোলী পর্দাকে একাকার করে দেয়৷