সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: ভারতে রাজ্য আইনসভার একটি অঙ্গ হল বিধান পরিষদ। বিধান পরিষদ দ্বিকক্ষীয় রাজ্য আইনসভার উচ্চকক্ষ হিসেবে কাজ করে। এই কক্ষের সদস্যরা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। এটি একটি স্থায়ী কক্ষ, কারণ এই কক্ষ অবলুপ্ত করা যায় না। তবে বহু রাজ্য থেকেই বিধান পরিষদ অবলুপ্ত হয়েছে ৷ আপাতত ভারতের ছ’টি রাজ্যে এখন বিধান পরিষদ রয়েছে। সেই রাজ্যগুলি হল- উত্তরপ্রদেশ, বিহার, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, জম্মু ও কাশ্মীর এবং অন্ধ্রপ্রদেশ ৷ এক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বিধান পরিষদ থাকলেও তা ১৯৬৯ সালে অবলুপ্ত হয়। যুক্তফ্রন্ট আমলে এ রাজ্য থেকে বিধান পরিষদ উঠে যাওয়ার ঘিরে দুই বামদল সিপিআই- সিপিএমের কাজিয়া ভালই লেগেছিল ৷

১৯৬৭ যুক্তফন্ট সরকার স্থায়ী হতে না পারলেও ১৯৬৯ সালে অন্তর্বর্তী নির্বাচনে ফের জিতে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন হয়৷ ক্ষমতায় আসার কিছু দিনের মধ্যে কেন্দ্রে সঙ্গে একটা লড়াই পাকিয়ে তোলার উদ্দেশ্য রাজ্যে বিধান পরিষদ বিলোপের ইস্যুটা তোলা হয়৷ কেন্দ্রকে জব্দ করার উদ্দেশ্য এই ইস্যু সিপিএম তুললেও এর মাধ্যমে সিপিআই-কে বেকায়দায় ফেলার একটা উদ্দেশ্য ছিল বলেই সেই সময় অনেকের অভিযোগ ছিল ৷

পড়ুন: ‘জয় শ্রীরামে’র মানে বুঝতে ব্যর্থ নোবেলজয়ী: বাবুল সুপ্রিয়

সেই সময় সিপিএমের পক্ষ থেকে দলের মন্ত্রীদের এই বিষয়টা তুলে মন্ত্রিসভায় পাশ করিয়ে নিতে বলা হয়৷ যেহেতু যুক্তফ্রন্টের ৩২দফা কর্মসূচিতে বিধান পরিষদ বিলোপের প্রতিশ্রুতি ছিল সেহেতু মন্ত্রিসভার বৈঠকে তা তোলা হলে তেমন আপত্তি ওঠে না এবং তা পাশ করিয়ে নেওয়া হয়৷ ওই সময় মনে করা হয়েছিল রাজ্য বিধানসভায় বিধান পরিষদ বিলোপের প্রস্তাব পাশ হলেও কেন্দ্রীয় সরকার এর বিরোধিতা করবে কারণ রাজ্য বিধান পরিষদে বেশির ভাগ সদস্যই তখন কংগ্রেসের ৷ সিপিএম পরিকল্পনা করেছিল কেন্দ্র এর বিরোধিতা করলে তখন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা হবে৷

কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ভিন্ন ঘটনা ঘটে যায় ৷ রাজ্য কংগ্রেস এ ব্যাপারে তেমন বিরোধিতা না করায় কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়ে দেয় বিধান পরিষদ বিলোপের কোনও বিরোধিতা করা হবে না৷ ফলে এমন ঘটনায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে সিপিআই৷ কারণ তখন রাজ্যের মন্ত্রিসভার সিপিআইয়ের বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বিধান পরিষদের সদস্য এবং আর এক মন্ত্রী রেণু চক্রবর্তী বিধান সভা বা পরিষদ কোনটারই সদস্য ছিলেন না৷ অর্থাৎ এদের দুজনকে মন্ত্রী রাখতে গেলে অন্য কোনও খান থেকে বিধায়ক করে আনতে হত ৷

পড়ুন: ‘Wait and See’ মন্ত্রেই কর্নাটক দখলে ঘুঁটি সাজাচ্ছেন ইয়েদুরাপ্পারা

সিপিএম তখন এই বিলটি পাশ করানোর জন্য উঠে পড়ে লাগে ৷ বিধান পরিষদ উঠে গেলে সিপিএমের যে একেবারেই কোনও ক্ষতি হত না তা নয় ৷ তাদেরও দুই মন্ত্রী ছিলেন বিধান পরিষদের সদস্য ৷ কিন্তু তাদের বিধায়ক করার বিকল্প ব্যবস্থা দল করে ফেলেছিল৷ কিন্ত সিপিআই-এর পক্ষে বিকল্প ব্যবস্থা করা যে সহজ হবে না তা সিপিএম বুঝেছিল৷ কারণ বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের জন্য মেদিনীপুরে একটি আসন পাওয়া গেলেও রেণু চক্রবর্তীর জন্য বহু তদবির করেও তখন দলের কোনও বিধায়ককে পদত্যাগ করাতে পারেনি সিপিআই৷ ফলে তাঁকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তেই হয়৷

তবে বিধান পরিষদ বিলোপের ফলে আরও দুই জন মন্ত্রিত্ব হারিয়েছিলেন৷ তাদের মধ্য একজন হলেন আরসিপিআই-এর সুধীন কুমার এবং বলশেভিক পার্টির বরদা মুকুটমণির৷ এরা দুজনেই যখন মন্ত্রী হয়েছিলেন তখন এঁনারা না ছিলেন বিধানসভার সদস্য না বিধান পরিষদের সদস্য৷ ভেবেছিলেন ভবিষ্যতে পরিষদের সদস্য হয়ে মন্ত্রিত্ব চালিয়ে যাবেন৷ কিন্তু বিধান পরিষদ বিলোপের সেই আশাভঙ্গ হয় ৷ তাছাড়া এরা কেউ তখন কোনও বিধায়ককে রাজি করাতে পারেননি পদত্যাগ করানোর জন্য ৷

১৯৬৯ সালের ২১ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ আইনসভায় বিধান পরিষদ অবলুপ্তির একটি প্রস্তাব পাস হয়েছিল। এরপর ভারতীয় সংসদে পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদ (অবলুপ্তি) আইন, ১৯৬৯ পাশ হয়। ১৯৬৯ সালের ১ অগস্ট এই পরিষদ অবলুপ্ত হয়। কিন্তু ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার পুনরায় এই পরিষদ গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তবে তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি৷

তথ্যঋণ
১) পালা বদলের পাল : বরুণ সেনগুপ্ত
২) উইকিপিডিয়া