নিখিলেশ রায়চৌধুরীঃ  হাওলার সঙ্গে যে মাদক চোরাচালানের কারবার ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেটা বহু দিন আগেই টের পায় আমেরিকার এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি DEA৷ কিন্তু সেই কারবার ঠেকানোর জন্য তারা আমেরিকায় যে লড়াই চালিয়েছিল সেই লড়াই ভারতের বুকে চালানো সম্ভব কি না, সেটা একটা মস্তবড় প্রশ্ন৷
ডিইএ-র উদ্দেশ্য ছিল, কালো টাকা সাদা করার যে অসাধু প্রক্রিয়া আমেরিকায় চলছে সেটা ঠেকানো৷

কিন্তু তাদের সেই উদ্দেশ্য অনেকটাই ব্যর্থ হয়ে যায় ঠান্ডা লড়াই কারণে৷ আমেরিকার মাটিতে মানি লন্ডারিং-মাদক চালান এবং হাওলা কারবারিদের গতিবিধি তারা তখনকার মতো ঠেকাতে পারলেও ১৯৭৯-৮৯ পর্বের আফগান যুদ্ধের সূত্র ধরে সেই গতিবিধির আউটসোর্সিং ঘটে যায়৷ ফলত, তার চড়া মূল্য ঘুরেফিরে আমেরিকাবাসীকেই দিতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে৷

এই অবস্থায় ভারতের বুকে এই কারবার ঠেকানোর উপায় কী? ভারতের মতো এত বিশাল দেশ যেখানে বিভিন্ন ধর্ম এবং ভাষাভাষী মানুষের বাস, তার উপর যাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশের লক্ষ্য হল– যে কোনও উপায়ে করেকম্মে খাওয়া৷ নৈতিকতা-অনৈতিকতা কিংবা সত্য-মিথ্যার তোয়াক্কা না ক’রে৷ সেখানে কেউ যদি এই তথ্যপ্রযুক্তিগত উন্নতির যুগে চোখ বুজে phising-এর মাধ্যমে ইধার কা মাল উধার করে, তাহলে কীভাবে তাদের কাজ-কারবার ঠেকানো সম্ভব?

একটা সময় ছিল যখন মধ্যবিত্ত সংসারে পাত্র বাছাই করা হত হবু জামাইয়ের উপরি-ফুপরি আছে কি না দেখে৷ পরবর্তীকালে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট বিজনেস ইত্যাদি, ইত্যাদি৷ এখন সেই এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের বিজনেসটা কী, সেটা ঘেঁটে দেখতে গেলে শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা কী দাঁড়াতে পারে, তা তো নীরব মোদির মতো এক-একটি ঘটনা থেকেই প্রমাণিত হয়ে যাচ্ছে৷ সিনেমা লাইনে প্রোডাকশনের ঘোটালার কথা তো ছেড়েই দিলাম৷
এখন বিদেশের দেখাদেখি আমাদের দেশেও নানা রকম ম্যানেজমেন্টের চল হয়েছে৷

এমনকী এক সময় যে কাজ পাড়ার ডেকরেটররাও করতে পারত সেই জায়গা নিয়েছে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট৷ টপ লেভেলে নিশ্চয়ই তা চলতে পারে৷ কারণ, তাঁরা হিল্লি-দিল্লি ঘুরেফিরে বেড়ান৷ কিন্তু একেবারে সাধারণ মানুষের জীবনেও এইসব ঝোঁকের সঙ্গে কোন কোম্পানির হাওলার কারবার জড়িয়ে আছে তার খবর কে রাখে? কিংবা রাখলেও কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বের হওয়ার ভয়ে তা কি শেষ পর্যন্ত ‘টপ সিক্রেট’ হয়ে সরকারের ভল্টে ঢুকে যাচ্ছে না?

ইদানীং একের পর এক মাদক সংক্রান্ত ঘটনার খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে৷ কিন্তু ঘটনাগুলি নেহাতই তুচ্ছ৷ যাদের ধরা হচ্ছে তারা কেউই মাদক চোরাচালানের বিশাল কোনও চাঁই নয়৷ নেহাতই পেডলার অথবা আসক্ত৷ তাদের জেরা করে পুলিশ কী জানতে পারছে সে কথা এখনও বিস্তারিতভাবে প্রকাশ্যে আসছে না৷ এলে হয়তো দেশের নিরাপত্তার ক্ষতি হতে পারে৷

সাধারণত রাজনীতিক আর ধর্মীয় বিরিঞ্চিবাবা বা বিরিঞ্চিমায়েদের ধরনধারণ একই রকম৷ পাবলিক, ভক্তদের ভিড় বাড়াতে তাঁরা অনেক সততা ও দৈবী প্রক্রিয়ার কথা বলেন বটে, বিভূতি-টিভুতিও ছড়ান, কিন্তু ভুলেও স্বচ্ছতার পথ অবলম্বন করেন না৷ অবশ্যই আর্থিক লাভালাভের কারণে৷ আর তাদের সেই অসৎ পন্থার সুযোগ নেয় হাওলা ব়্যাকেটের কারবারিরা৷ যে কারবারিদের সঙ্গে মাদক, অস্ত্রশস্ত্র সহ বিভিন্ন ধরনের চোরাচালানের সম্পর্ক ওতপ্রোত৷
দেখার বিষয় হল, মাদক উৎপাদন ও চালানের বিরুদ্ধে দেশে দেশে যত ব্যবস্থাই নেওয়া হোক না কেন কিছুতেই তা আটকানো সম্ভব হচ্ছে না৷ ঠিক যেমন ইন্টারপোলকে জানিয়েও বিজয় মাল্য, দাউদ ইব্রাহিম কিংবা নীরব মোদিদের পাকড়াও করা যায় না৷ এই পাপচক্রের সঙ্গে এত কোটি কোটি টাকার লেনদেন জড়িয়ে রয়েছে যা আটকাতে গেলে হয়তো একটা বড়সড় যুদ্ধের দরকার হবে৷

এক সময় কলম্বিয়ার ড্রাগলর্ডদের কারবার দমন করতে সেদেশের প্রেসিডেন্টকে জরুরি অবস্থা জারি করে মাফিয়াদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধঘোষণা করতে হয়েছিল৷ মূলত আমেরিকায় মাদকের চোরাচালান আটকাতেই মার্কিন প্রশাসনের সহায়তায় ওই যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট৷ তার পরেও কিন্তু আমেরিকাকে ড্রাগ মাফিয়াদের কবল থেকে বাঁচানো যায়নি৷

এই অবস্থায় ভারতের মাটিকে ড্রাগ চোরাচালানের জন্য যারা বেছে নিয়েছে তাদের সূত্রগুলি কোথা থেকে কোথায় ছড়িয়ে পড়ছে তার হদিশ কি রাতারাতি বের করা সম্ভব? অনেক আগেই এ ব্যাপারে ভারতের সব কটি রাজ্যের পুলিশ-প্রশাসনকে নিয়ে দিল্লির কর্তাব্যক্তিদের একটা পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত ছিল৷

এখন যা অবস্থা তাতে এই পাপচক্রীদের বিরুদ্ধে হঠাৎ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলে তার জন্য অনেক খেসারত দিতে হবে৷ হয়তো নোটবন্দির মধ্য দিয়ে লড়াইটা শুরু হয়েছে৷ কিন্তু এখনও বহু লড়াই বাকি আছে৷