১১ মে, ১৯৯৮৷ বাতাসে আপেক্ষিক আদ্রতা সেদিন একটু বেশীই ছিল বোধহয়৷ দেশের অন্তরেও জমছিল উদ্বেগ৷  ১৯৭৪-এর পর সেই আবার দেশের পরমাণু শক্তির পরীক্ষা হবে৷ শুধু তো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি নয়, ছিল রাজনৈতিক ঘূর্ণিপাকও৷ সে সব সামলে নিয়েই সেবার দেশের শক্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা গিয়েছিল৷ কিন্তু সর্বক্ষণ চলছে আমেরিকান উপগ্রহের নজরদারি৷ তা এড়িয়েই বিশ্বের কাছে দেশীয় পারমাণবিক শক্তির বার্তা দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল যাঁর উপর, তিনি ডঃ এপিজে আব্দুল কালাম৷ বুদ্ধ পূর্ণিমার রাত ছিল সেদিন৷ সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে, আমেরিকার নজরদারি এড়িয়ে, পরমাণু পরীক্ষায়  সাফল্য পৌঁছেছিলেন ডঃ কালাম৷

১৯৯২ থেকে ৯৯ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বিজ্ঞান উপদেষ্টার পদে নিযুক্ত ছিলেন ডঃ কালাম৷  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী ১৯৯৬ সালেই  পরমাণু শক্তির পরীক্ষার কথা ভেবেছিলেন৷ কিন্তু রাজনৈতির চাপের কাছে নতিস্বীকার করেন৷ ১৯৯৮-এ আর পিছু ফিরে তাকাননি৷ প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে সবুজ সংকেত গিয়েছিল ডঃ কালামের কাছে৷ পোখরান-২ পরমাণু পরীক্ষার সুপারভাইজারের দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর উপর৷ সফলভাবে পাঁচটি পরমাণু বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়েছিল৷ তারমধ্যে চারটি ছিল ফিসন বোম, একটিই ফিউশন বোম৷ মোট ৫৮ জন ইঞ্জিনিয়ারকে বেছে নেওয়া হয়েছিল সে কাজের জন্য৷

গোপনীয়তা ছিল চরম মাত্রায়৷ এল সাফল্য৷ পরমাণু শক্তি হিসেবে সেদিন নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছিল ভারত৷ আর পুরো প্রক্রিয়াটির নেপথ্য নায়ক ছিলেন ডঃ কালাম৷ প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সেদিন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আমেরিকার উপগ্রহের নজরদারি এড়ানো৷ ডঃ কালামের পরিকল্পনামতোই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা সময়ের হেরফেরে বোকা বানাতে পেরেছিল উপগ্রহটিকে৷ সফল হয়েছিল দেশের পরমাণু পরীক্ষা৷ ১৯৯৮-এর এই পরীক্ষার সাফল্যকে সিআইএ-র ( সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্সি এজেন্সি, আমেরিকা) সবথেকে ব্যর্থতা বলেও ধরা হয়৷ ভাবা অ্যাটোমিক রিসার্চ সেন্টারের তরফ থেকে ডঃ কালামকে একটি স্মারক সম্মান দেওয়া হয়, যেখানে বুদ্ধ মূর্তির নীচে লিখে দেওয়া হয়েছিল, ‘দ্য বুদ্ধ হ্যাজ স্মাইলড’৷ বস্তুত গোটা দেশই সেদিন স্বস্তির হাসি হেসেছিল৷

পরমাণু অস্ত্রে শক্তিধর হিসেবে বিশ্বের সামনে দেশের এই মাথা তুলে দাঁড়ানো আসলে এই সময়ের নিরিখে দেশের একরকম স্বাধীনতাই৷  আমাদের মনে পড়বে, এ বছর সেই সাফল্যের স্মরণে ডঃ কালাম বলেছিলেন, “Today, I remember the hot day of 1998 at Pokhran: 53C. When most of the world was sleeping; India’s nuclear era emerged.”

এ যেন স্বাধীনতা পরবর্তী নেহরুজির ভাষণেরই প্রতিধ্বনী৷ সে বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলেন স্কুলছাত্র কিশোর কালাম৷ পরবর্তীকালের পারমাণবিক শক্তির নিরিখে  দেশের স্বাধীনতার পথীকৃত হলেন তিনিই৷ ১৯৯১ এর মুক্ত অর্থনীতির সংস্কার যেভাবে দেশকে অর্থনাতিক স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, ১৯৯৮ এর পরমাণু শক্তির পরীক্ষাও সেইভাবেই দেশের প্রতিরক্ষার প্রেক্ষিতে অর্থবহ৷

পরবর্তীকালে এক ছাত্র ডঃ কালামকে জানিয়েছিলেন যে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন এই পরমাণু পরীক্ষার সমালোচনা করেছেন৷ তাঁর মতে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে দেশের সুস্মপর্ক বজায় রাখা দরকার ভারতের৷ তাহলেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব৷  ডঃ কালাম তাঁকে সম্মান জানিয়েই লেখেন, ‘ I acknowledge The greatness  of Dr, Amartya Sen in the field of economic development and admire his suggestions. …  At the same time seemed to me, that Dr Sen looked at India from a western perspective.  … We  must also bear in mind India’s experience in the past. Pandit Nehru Spoke in the United Nations aginst neuclear proliferation and advocated zero nuclear weapons in all the countries. We know the result. one shold note that there are more than 10000 nuclear warheads on American soil. Another 10000 nuclear warheads are on Russian soil, and there are no of them in the uk, China, france, Pakistan And Some other countries. … can India be a Silent Spectators?’

প্রশ্ন এখানেই৷ তাঁকে রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়ক প্রযুক্তির প্রচারক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতেই পারে৷ রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের চেনা ছকের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকে দেখা যেতে পারে বটে, কিন্তু আটকে যেতে হয় ওই প্রশ্নে৷ সারা পৃতিবীর পারমাণবিক উন্নতির সামনে নীরব দর্শক হয়ে তিনি থাকতে চাননি কেননা, ৩০০০ বছরের ইতিহাস তাঁকে দেখিয়েছে বারে বারে এ জাতি অন্যের অধিকারে গিয়েছে৷

তা দেশ দূর্বল বলে নয়, শাসিত হয়ে থাকার মর্মযন্ত্রণা অনেক সময়ই দেরিতে বুঝেছে বলে৷ সুতরাং বর্তমান সময়ে পারমাণবিক শক্তির নিরিখে আরও একবার যখন অলিখিত খবরদারী দেশের উপর চেপে বসেছে, একজন প্রকৃত দেশব্রতীর মতোই তিনি তা অতিক্রম করার রাস্তা খুঁজেছেন এবং রাষ্ট্রের সহায়তাতেই তা করেও দেখিয়েছেন৷কিন্তু প্রযুক্তিই যে শেষ কথা নয়, সে কথা বলেছেন বারে বারে৷ প্রত্যাশা করেছেন দেশের নবজাগরণের, কিন্তু সে নবজাগরণ জ্ঞান,প্রজ্ঞায় বলিয়ান হয়ে দেশের তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে আসবে বলেই তাঁর বিশ্বাস ছিল৷

এখানেই তিনি আলাদা৷ পোখরানে পরমাণু পরীক্ষার তিনি কারিগর ছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেটুকুই সব নয়৷ তাঁর লক্ষ্য ছিল সুদূরপ্রসারিত৷ সংকীর্ণ দৃষ্টিতে দেখতে গিয়ে তাঁর মতো একজন দ্রষ্টাকে যেন খাটো করে না ফেলি৷ তরুণ ভারতবাসীকে জ্ঞান, প্রেমের পাশাপাসি প্রযুক্তিতেও বলিয়ান দেখতে চেয়েছিলেন৷ তারই এক সফল পদক্ষেপের  সাক্ষী ছিল ১৯৯৮ সালের পোখরান৷

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ