প্রতীকী ছবি৷

বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: রাস্তার অসুস্থ অথবা হিংস্র কোনও সারমেয় নয়৷ নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে রাস্তার সুস্থ সারমেয়রাই৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া রাস্তার সারমেয়দের তালিকায় রয়েছে তাদের ছানারাও৷ এবং, সব থেকে বেশি নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে আবার কলকাতার রাস্তার সারমেয়রাই৷

আশঙ্কা করা হচ্ছে, মানুষের খাদ্য হিসেবে সারমেয়র মাংসের লোভেই, রাস্তা থেকে তাদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে কোনও চক্র৷ তেমনই আবার, কলকাতা পুরসভার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন এবং সন্দেহ করা হচ্ছে৷ এমনও আশঙ্কা, কলকাতা পুরসভার অধীনে ধাপায় যে ব্যবস্থা রয়েছে, পরিকাঠামোগত খামতির জেরে সেখানেই রাস্তার সারমেয়দের মৃত্যু হচ্ছে৷ কলকাতার রাস্তা থেকে কেন নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে রাস্তার সারমেয়রা? এই বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় কলকাতা পুরসভার মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে৷ মেয়র বলেন, ‘‘কী…? রাস্তার কুকুর? ফোনে আমি এই বিষয়ে কথা বলবো না৷’’  আর, এই কথা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই ফোন কেটে দেন কলকাতা পুরসভার মেয়র৷

কলকাতার বিভিন্ন রাস্তা থেকে সারমেয়দের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়৷ তেমনই, শুধুমাত্র যে কলকাতার বিভিন্ন রাস্তা থেকে সারমেয়রা নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে, তাও আবার নয়৷ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায় সব থেকে বেশি সারমেয় নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে এই মহানগরীর দক্ষিণ অংশ থেকে৷ অন্যদিকে, কলকাতার আশপাশের বিভিন্ন অংশ থেকেও নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে রাস্তার সারমেয়রা৷ ব্যক্তিগত এবং কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে প্রাপ্ত ওই তথ্য অনুযায়ীই, গত দু’বছরে শুধুমাত্র কলকাতা থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে ৪১টি রাস্তার সারমেয়৷ এবং, ওই একই সময়ে, কলকাতার শহরতলি বারাসত থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে ৮টি রাস্তার সারমেয়৷

তবে, গত দু’বছরে যে এই ৪৯টি রাস্তার সারমেয়-ই নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে, তাও নয়৷ কেননা, আশঙ্কা করা হচ্ছে, কলকাতা এবং এই মহানগরীর আশপাশ সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশ থেকেও রাস্তার সারমেয়দের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি অসম্ভব নয়৷ কাজেই, সঠিক তথ্য মিললে বোঝা সম্ভব, ঠিক কত সংখ্যক রাস্তার সারমেয় ইতিমধ্যেই নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে৷ কেরলের বিভিন্ন অংশ ইতিমধ্যেই সেখানকার রাস্তার সারমেয়দের কাছে নরক হয়ে উঠেছে৷ তেমনই, কলকাতা এবং এই মহানগরীর আশপাশ অংশও এখন নরক হয়ে উঠেছে এখানকার রাস্তার সারমেয়দের কাছে৷

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, অ্যানিম্যাল লাভার আত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘২০১৩-য় শুধুমাত্র দক্ষিণ কলকাতার আলিপুরের বিভিন্ন রাস্তা থেকেই ২৩টি কুকুর নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার খবর পেয়েছি৷ ২০১৩ এবং ২০১৫ মিলিয়ে, আলিপুর বাদে দক্ষিণ কলকাতার অন্যান্য রাস্তা থেকে আরও ১৫টি কুকুর নিখোঁজ হওয়ারও খবর পেয়েছি৷ মধ্য কলকাতা থেকে ২০১৫-য় আরও তিনটি রাস্তার কুকুরও নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে৷’’ তাঁরা যে তথ্য পেয়েছেন, তা এই রকম: ২০১৩-য় আলিপুরের গোপালনগর বাস স্টপ থেকে ছ’টি, আলিপুর থানা থেকে ছ’টি, আলিপুরের হর্টিকালচার গার্ডেন্স থেকে পাঁচটি, আলিপুরের হেস্টিং পার্ক রোড থেকে তিনটি এবং আলিপুরের জাসেস কোর্ট রোড থেকে তিনটি রাস্তার সারমেয় নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে৷ ২০১৩-য় গল্ফ গার্ডেন্সের গল্ফ ক্লাব ক্রসিং (এসবিআই কমপ্লেক্সের কাছে) থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে তিনটি রাস্তার সারমেয়৷ ওই তিনটির মধ্যে একটি ছিল নির্বীজিত মেয়ে সারমেয়৷ এবং, অন্য দু’টি ছিল সারমেয়র হৃষ্টপুষ্ট ছেলে-ছানা৷

ওই তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-র সাত ফেব্রুয়ারি বেহালার ফকিরপুরা রোড থেকে বাদামি রঙের তিনটি সারমেয়-ছানা, ২০১৫-র মে মাসে দেশপ্রিয় পার্কের ক্রসিং থেকে তিনটি সারমেয় এবং ওই মে মাসেই কালীঘাট পার্ক থেকে ছ’টি সারমেয় নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে৷ গত ২৬ জুন মধ্য কলকাতার কনভেন্ট রোড থেকে একটি কালো রঙের মেয়ে সারমেয়-ছানা এবং ওই দিনই ক্রিক রোড থেকে আরও দু’টি সারমেয় নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে৷ অন্যদিকে, ওই তথ্য অনুযায়ীই, ২০১৪-র অক্টোবরে বারাসত কাজিপাড়া থেকে খুব বড় স্বাস্থ্যবান একটি ছেলে সারমেয়, ২০১৫-র মার্চেও ওই একই এলাকা থেকে আরও একটি খুব বড় স্বাস্থ্যবান ছেলে সারমেয় নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে৷ গত ১৫ জুন বারাসত কলোনি মোড় থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে ছ’টি সারমেয়৷ বারাসতের ওই অঞ্চলের ফুটপাথবাসীদের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পেরেছেন, মধ্য রাতে একটি গাড়িতে করে রাস্তার ওই ছ’টি সারমেয়কে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷

আত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘স্বাস্থ্যবান নয়, রাস্তার এমন কোনও কুকুরকে গল্ফ গার্ডেন্সের ওই অঞ্চল থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়নি৷ একজন গাড়ি চালকের বক্তব্য থেকে জানতে পেরেছি, আলিপুর অঞ্চলের ওই সব কুকুরকে নীল রঙের একটি গাড়িতে করে রাতের বেলায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷ কলকাতা পুরসভা কিন্তু নীল রঙের কোনও গাড়ি করে রাস্তার কুকুরদের তুলে নিয়ে যায় না৷ এই ভাবে রাস্তার কুকুর নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পিছনে কোনও চক্র যুক্ত রয়েছে বলে মনে হচ্ছে৷’’ একই সঙ্গে তিনিdog.02 বলেন, ‘‘আমাদের কাছে খবর এসেছিল, রাজাবাজারের একটি দোকানে লেখা রয়েছে ‘কুকুরের মাংস পাওয়া যায়’৷ তবে, আমরা আর ওই দোকানটি চিহ্নিত করতে পারিনি৷ পৈলানের কাছে একটি অঞ্চলে মানুষের খাদ্য হিসেবে কুকুরের মাংস ব্যবহারের বিষয়টি আমরা শুনেছি৷ বছর দু’য়েক আগে এমনও শুনেছি, মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য কুকুর ধরে দেওয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন কলকাতা থেকে ২৫ কিমি দূরে করুণাগঞ্জের দুই ভাই-বোন৷’’

মানেকা গান্ধীর পিপল ফর অ্যানিম্যাল-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রসেনজিৎ দত্ত বলেন, ‘‘রাস্তা থেকে কুকুরদের নিখোঁজ হওয়ার পিছনে কারণ হিসেবে যেমন তাদের মাংস মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি থাকতে পারে, তেমনই আবার, কেরলের ছায়াও পড়তে পারে৷’’ রাস্তার হিংস্র সারমেয়দের জন্য কেরলের নাগরিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে৷ যে কারণে, ওই রাজ্যে রাস্তার হিংস্র সারমেয়দের মেরে ফেলার নামে, সেখানকার রাস্তার সব সারমেয়কে নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে৷ এমনকী, কেরলে নৃশংসভাবে সারমেয়র ছানাদেরও হত্যা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠছে৷ বছর তিন-চার আগে টিটাগড়ে একটি নির্মাণকাজের জন্য নাগাল্যান্ড থেকে এসেছিলেন শ্রমিকরা৷ অ্যানিমাল সাপোর্ট গ্রুপ সোসাইটি-র এক সদস্যের কথায়, ‘‘ওই শ্রমিকরা স্থানীয় দুই স্বাস্থ্যবান কুকুরকে হত্যার চেষ্টা করেছিল৷ তবে, একটি কুকুরকে তাঁরা মেরে ফেলতে সমর্থ হন৷ তার পর ওই কুকুরের মাংস তাঁরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেন৷ জখম অন্য কুকুরটির জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছিল৷ এই ঘটনায় পুলিশে অভিযোগও দায়ের করা হয়েছিল৷ কিন্তু, পরে ওই কুকুরের মালিকের সঙ্গে অভিযুক্তদের সমঝোতা হয়ে যায়৷’’

তবে, মানুষের খাদ্যের জন্যই যে কলকাতার রাস্তা থেকে সারমেয়রা নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে, তেমনটা আবার মনে করছে না ইটস অ্যা ডগস লাইফ৷ কলকাতার এই সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে, মানুষের খাদ্যের জন্য সারমেয়র মাংস-ও ব্যবহৃত হয়৷ কিন্তু, শুধুমাত্র মাংসের লোভেই রাস্তার সারমেয়রা নিখোঁজ হতে থাকলে, নিখোঁজের সংখ্যাটা আরও বেশি হত৷ বরং, এই ভাবে রাস্তা থেকে সারমেয়দের নিখোঁজ হওয়ার পিছনে কলকাতা পুরসভার ভূমিকা থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে ইটস অ্যা ডগস লাইফ৷ রাস্তার সারমেয়দের নিয়ে কাজ করে এমন বিভিন্ন সংগঠনের তরফে এমনও জানানো হয়েছে, কলকাতা পুরসভার অধীনে ধাপা ডগ পাউন্ডের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় রয়েছে৷ সেখানে জমে যাওয়া নোংরা জলের মধ্যেও সারমেয়দের থাকতে হয়৷ স্বাভাবিকভাবেই, এই ধরনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কোনও সারমেয়র মৃত্যু অসম্ভব নয়৷

অ্যানিমাল সাপোর্ট গ্রুপ সোসাইটি-র তরফেও জানানো হয়েছে, নির্বীজনের জন্য রাস্তা থেকে সারমেয়কে তুলে নিয়ে যায় কলকাতা পুরসভা৷ ধাপা ডগ পাউন্ডে ওই নির্বীজনের পর, যেখান থেকে কোনও সারমেয়কে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানেই আবার তাকে ছেড়ে দেয় কলকাতা পুরসভা৷ কিন্তু, ধাপা ডগ পাউন্ডের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কোনও সারমেয়র মৃত্যু অসম্ভব নয়৷ যে কারণে, মৃত কোনও সারমেয়কে আর রাস্তায় দেখা যাচ্ছে না৷ তবে, রাস্তা থেকে কোনও সারমেয়কে তুলে নিয়ে যাওয়ার কাজটিও খুব সহজ নয়৷ যে কারণে, বিভিন্ন সংগঠনের তরফে এমনও জানানো হয়েছে, যথাযথ পরিকাঠামো রয়েছে এমন কোনও দলই রাস্তা থেকে সারমেয়দের তুলে নিয়ে যাচ্ছে৷

শুধুমাত্র তাই-ই নয়৷ সারমেয়দের নিয়ে কাজ করে এমন বিভিন্ন সংগঠনের তরফে এমনও জানানো হয়েছে, কলকাতার রাস্তা থেকে সারমেয়দের সরিয়ে দেওয়ার জন্য হয়তো গোপনে কোনও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে৷ এ দিকে, গোটা শহর জুড়ে রাস্তার সারমেয়দের সরিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হলে, দেখা দেবে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সহ তীব্র বিরোধিতা৷ যে কারণে হয়তো, কলকাতার কোনও কোনও অংশকে বেছে নিয়ে শুরু করা হয়েছে রাস্তা থেকে সারমেয়দের সরিয়ে দেওয়ার কাজ৷ যে কারণেই হয়তো, আলিপুর শহ দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন অংশ থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে এতগুলি রাস্তার সারমেয়৷ লাভ অ্যান্ড কেয়ার ফর অ্যানিম্যালস-এর সুস্মিতা রায়ের কথায়, ‘‘রাস্তার কুকুরদের জন্য কোনও ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানের হয়তো সমস্যা হচ্ছে৷ যে কারণে হয়তো রাস্তার কুকুররা নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে৷’’

================================================

রাস্তার সারমেয়দের হত্যায় অনশন-বয়কট মিশন