প্রসেনজিৎ চৌধুরী: একুশ শতকের প্রথম দিক। বন্ধু ভারতের জন্য প্রতিবেশী দেশ ভুটান তার ছোট্ট সেনাবাহিনিকে নামিয়ে ছিল ভয়ঙ্কর জঙ্গি দমন অভিযানে। বিখ্যাত অপারেশন অল ক্লিয়ার। তাতেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় একাধিক ভারত বিরোধী জঙ্গি শিবির। হতাহতের সংখ্যা প্রচুর। একের পর এক তাবড় জঙ্গি নেতা ধরা পড়ে।

২০০৩ সালের এই অপারেশন অল ক্লিয়ার দক্ষিণ এশিয়ার মাটিতে অন্যতম সফল জঙ্গি দমন অভিযান হিসেবে চিহ্নিত ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ভারত-ভুটান সীমান্তবর্তী এলাকায় চলেছিল টানা ১৫ দিন। প্রবল শীতে কুঁকড়ে থাকা উত্তরবঙ্গ, অসম, অরুণাচল লাগোয়া ভুটানের প্রান্ত সীমা জেলেফু, চুখা এলাকার জঙ্গল পাহাড়ের আনানে কানাচে গর্জে উঠেছিল রয়্যাল ভুটান আর্মির ইনসাস।

প্রতিবেশী ভুটানের সামরিক ইতিহাসে এই সামরিক অভিযান বিশেষ সম্মানীয় ঘটনা হয়ে রয়েছে। অভিযানের সফলতা আসতেই ভুটানের সর্বচ্চো শাসক তথা ওয়াংচুক রাজপরিবারের তরফে তৈরি করানো হয় দোচু লা গিরিপথের মুখে একটি সৌধ। নিহত ভুটানি সেনাদের স্মরণে তৈরি হয় বিভিন্ন চোরতেন(স্তূপ)। মোট ১০৮টি চোরতেন নিয়ে তৈরি বিশাল এই সৌধ রয়েছে থিম্পু-পুনাখা রাজপথের উপর। এখানেই দো চু লা গিরিপথের মুখে। স্বাভাবিক কারণেই সৌধের নাম দোচু লা স্তূপ।

পর্যটন ও সুখী মানুষের দেশ ভুটান। অক্সিজেন উৎপাদন ও কার্বন মুক্ত পরিবেশ তৈরিতে বিশ্বজুড়ে বারে বারে নজির তৈরি করেছে এই ড্রাগনভূমি। ভারত ও চিনের মতো দুটি বিরাট জনসংখ্যা ও পরমাণু শক্তিধর দেশের মাঝখানে ভুটানের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৪৯ সালে দার্জিলিংয়ে অনুষ্ঠিত ভারত-ভুটান বন্ধুত্বের চুক্তি অনুসারে দুই দেশের সীমান্ত পেরিয়ে দুই দেশের নাগরিকদের অবাধ যাতায়াতের কথা বলা হয়েছে। এই আইনটির সুযোগ ও দুর্গম জঙ্গল ঘেরা সীমান্তের কারণে একাধিক ভারত বিরোধী সশস্ত্র বিচ্ছিনতাবাদী সংগঠন ও জঙ্গি গোষ্ঠী ভুটানের অভ্যন্তরে শিবির চালাচ্ছিল। তাদের লক্ষ্য, ভুটান থেকে ভারতে ঢুকে নাশকতা ঘটিয়ে আবার শিবিরে ফিরে যাওয়া।

আন্তর্জাতিক আইনের বলে, সরাসরি সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকতে পারবে না ভারতীয় সেনা ও পুলিশ। এদিকে, ভুটান সীমান্তের এপারে উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহারে ছড়িয়ে থাকা স্বশাসিত কামতাপুর গঠনের লক্ষ্যে কেএলও সশস্ত্র পথ নেয়। সংগঠনের প্রধান জীবন সিংহের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল সশস্ত্র আন্দোলন। তাকে মদত জুগিয়ে যায় ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ অসম বা আলফা (এখন আলফা-আই), বোড়ো জঙ্গি গোষ্ঠী এনডিএফবি, ত্রিপুরার সশস্ত্র গোষ্ঠী এটিটিএফ(অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স) সহ আর কিছু সংগঠন।

১৯৯০ দশকের উত্তর পূর্ব ভারতে লাগাতার নাশকতা হয়। সেনা অভিযানের ধাক্কায় বিভিন্ন সংগঠনগুলি ক্রমে ভুটানের দিকে চলে যায়। সেখানেই প্রশিক্ষণ শিবির চালাতে শুরু করে। ২০০০ সালের শুরু থেকে কামতাপুর লিবারেশন আর্মি(কেএলও) নাশকতা শুরু করে দেয়।

ভয়াবহ ১৭ অগস্ট, ধুপগুড়ি হামলা:

নাশকতার আবহ তৈরি হয়েই ছিল। কেএলও জঙ্গিদের খুচরো খাচরা হামলার খবর আগে থেকেই আসছিল। পরিস্থিতি ঘোরতর বুঝে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানিকে বিষয়টি অবহিত করেন। ভারত-ভুটান সীমান্তের জঙ্গি উপদ্রব নিয়ে চিন্তিত হন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী।

২০০২ সালের ১৭ অগস্টের দিন হল ভয়াবহ হামলা। জলপাইগুড়ি জেলার ধুপগুড়ি সিপিআই(এম) কার্যালয়ে চলছিল মিটিং। সেই সময় এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে গণহত্যা করে কেএলও। ৫ জনের মৃত্যু হয়, ১৪ জন জখম হন। ধুপগুড়িতে জঙ্গি হামলার সেই ঘটনা দেশজুড়ে প্রবল আলোড়ন ফেলে দেয়।

গোয়েন্দা সূত্রে খবর আসে, জীবন সিংহের নির্দেশে ভুটান থেকে এসেই হামলা চালিয়েছিল কেএলও। এরপরেই নয়াদিল্লি ও থিম্পুর মধ্যে শুরু হয় আন্তর্জাতিক জঙ্গি দমন বিষয়ে আলোচনা।

ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের দেওয়া তথ্যে উঠে আসে, ভুটানের মাটিতে সক্রিয় ULFA, NDFB, KLO, NSCN, ATTF এর মতো জঙ্গি সংগঠনগুলি কতটা সক্রিয়। ভুটান সরকার জানিয়ে দেয়, যে কোনওভাবেই এই জঙ্গিদের পুশব্যাক ( ঠেলে দেওয়া) করা হবে ভারতের দিকে। শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি।

অপারেশন অল ক্লিয়ার (২০০৩-২০০৪):

ভুটান রাজ জিগমে সিংগে ওয়াংচুক থিম্পুর রাজকীয় সংসদে অভিযানের সবুজ সংকেত দিলেন। রয়্যাল ভুটান আর্মি শুরু করল অভিযান। ১৫ ডিসেম্বর, বড়দিনের উৎসবের প্রস্তুতি চলছে বিশ্বজুড়ে। আর ভুটানের পাহাড় জঙ্গলে শুরু হল জঙ্গি দমন কর্মসূচি। তীব্র সংঘর্ষে প্রথম কয়েকদিনেই গুঁড়িয়ে গেল বহু শিবির। মৃত অনেক জঙ্গি। উদ্ধার করা হল বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র।

ভুটানের দিক থেকে সেনা হামলা ও ভারতের দিক থেকে পথ আটকে রাখা, এমনই সাঁড়াশি চাপে ত্রাহি ত্রাহি রব জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির। সবমিলে নিহতের সংখ্যা নিয়ে গরমিল রয়েছে বিস্তর। তবে ভুটানি সেনার কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছিল সেই অভিযানে।

২০০৪ সালের ১ জানুয়ারি অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয় থিম্পু থেকে। বার্তা পাঠানো হয় ইটস অল ক্লিয়ার।

সৌঃ ১.Kuensel  ২. SATP  ৩. ড্রাগনভূমির অজানা রহস্য