কৌশিক চট্টোপাধ্যায়: যদি ভাবেন বেড়াতে যাবেন একটা রোমহর্ষক জায়গায়৷ তাহলে সত্যজিৎ রায়ের গল্প অবলম্বনে সন্দীপ রায়ের তৈরি ফেলুদা ঘেরা সেই বাড়িতে গেলে হয় না? যেখানে গা ছমছমে রাজবাড়িতে রয়েছে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের গল্পের গন্ধ?

রাজবাড়ির সিংহ দরজাটা খুলতেই হাসিমুখে এক সুদর্শন ব্যক্তি এগিয়ে এলেন৷ বললেন “স্বাগতম, আমি মহীতোষ সিংহ রায়৷ আর আপনি নিশ্চয়ই গোয়েন্দা প্রদোষ মিত্র?” মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে বললেন, ‘তারমানে আপনি রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসের লেখক জটায়ু?’

আরও পড়ুন: চোখ মেরে ভাইরাল ‘নস্ট্যালজিক’ সুন্দরী

ফেলুদা অমনি প্রতি নমস্কার জানিয়ে তোপসেকে দেখিয়ে বললেন ,”আর এ হল আমার খুড়তুতো ভাই তোপসে৷” বাড়ির বাইরে গাড়ি বারান্দার সামনে দাঁড়িয়েই প্রাথমিক পরিচয়পর্ব সেরে নিয়ে মহীতোষবাবু ফেলুদাকে নিয়ে ঢুকলেন রাজবাড়ির ভেতরে৷ বহুকালের ইতিহাস মাখা রাজবাড়ির প্রতিটি ইঁট, প্রতিটি পাথরে এখনও যেন লেগে আছে প্রাচীন কালের হাজারো স্মৃতির গন্ধ৷ কালবুনির জঙ্গলের পূর্ব দিকেই গল্পের রাজবাড়ির এক বিরাট বসবার ঘরে সুদৃশ্য কাঠের চেয়ারে বসে তখন দ্বিতীয় পর্বের গল্প-আড্ডা চলছে৷ একদিকে সকলের প্রিয় বিখ্যাত গোয়েন্দা ফেলু মিত্তির ওরফে ফেলুদা, পাশে বসে জটায়ু, তোপসে৷ অন্যদিকের চেয়ারে বসে গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র মহীতোষ সিংহরায়৷ মহীতোষবাবু একের পর এক তার পূর্বপুরুষদের বাঘ শিকারের গা ছমছমে গল্প শুনিয়ে যাচ্ছেন৷

 

ঠিক এখানেই ক্যুইজ মাস্টার সিনেমার ভিসুয়ালটাকে আটকে প্রশ্ন করলেন, ‘‘আচ্ছা বলুন তো এটি কোন সিনেমার অংশ?’’ সকলেই এক কথায় বলে উঠলেন ‘রয়েল বেঙ্গল রহস্য’৷ ছবিটি কার পরিচালনা? সমস্বরে উত্তর এল সন্দীপ রায়ের৷ এই বার ক্যুইজ মাস্টার মুচকি হেসে পরের প্রশ্নবাণটি ছুঁড়ে বসলেন, আচ্ছা বলুন তো গল্পের রাজবাড়িটির শ্যুটিং স্পটটি আসলে কোথায়? ব্যাস, গোটা হলঘর একেবারে চুপ৷ কয়েকজন ভাঙাভাঙা স্বরে বলে উঠলেন, ‘‘ডুয়ার্সের মাল বাজারের কাছাকাছি কোনেও এক পুরনো রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ি বলেই তো মনে হচ্ছে৷ ভুল উত্তর৷’’

আরও পড়ুন: CCTV footage: অন্তর্বাস চুরি করে চম্পট দিলেন সন্ন্যাসী

সত্যজিৎ রায়ের রয়েল বেঙ্গল রহস্যের গল্পের পটভূমি ছিল ডুয়ার্সের ঘন জঙ্গলে৷ কিন্তু লিখিত গল্পকে রুপোলী পর্দায় নিয়ে আসতে গিয়ে লেখকের পুত্র সন্দীপ রায়ের দরকার হয়ে পড়েছিল ঘন জঙ্গলের মধ্যে এক জমিদার বাড়ির৷ খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলেন ওডিশার ভুবনেশ্বর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঢেঙ্কানল এলাকার একটি প্রাচীন জমিদার বাড়ি৷ বাড়ির কর্তা রয়্যাল ফ্যামিলির বর্তমান উত্তরাধিকারী কুমারসাহেব জেপি সিংদেও তার পরিবার নিয়ে সেখানেই বাস করেন৷

ওডিশার মেঘনা পাহাড়ের পাদদেশে চারিদিকে সবুজে ঘেরা ঘন জঙ্গলের মধ্যে এক প্রাচীন জমিদারী অহংকার নিয়ে মাথা উঁচু করে আছে গজলক্ষ্মী প্যালেস৷ চারিদিকের পরিবেশ দেখেই পরিচালক এখানেই শ্যুটিং করার সিদ্ধান্ত নিলেন৷ তৈরি হল সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত রহস্য গল্প রয়েল বেঙ্গল রহস্য৷ গুগল সার্চ করে এই জায়গার সন্ধান পেতে খুব একটা বেগ পেতে হল না৷ যোগাযোগ করে জানা গেল, ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য পাহাড়ের কোলে ঘন জঙ্গলে ঘেরা গজলক্ষ্মী প্যালেসে রাত্রিবাসের মধ্যদিয়ে এক অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবার জন্য কুমার সাহেবের ছেলে জিতেন্দ্র সিংদেও এবং তার স্ত্রী নভনীতা এই প্যালেসে যাবতীয় অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের ব্যবস্থা করেছেন৷

আট থেকে দশজন ট্যুরিস্টের একসঙ্গে থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত রয়েছে এই রয়্যাল প্যালেসে৷ জ্যোৎস্না ধোয়া চাঁদনীরাতে রয়্যাল বিছানায় শুয়ে কাঁচের জানালা দিয়ে উপভোগ করতে পারেন প্রাসাদের চারিদিকের ঘন জঙ্গলের ওপর মেঘনা পাহাড়ের ছায়া৷ পরদিন হেঁটে বা গাড়িতে করে ঘুরে আসতে পারেন জোরান্ডা টেম্পল, অষ্টশম্ভু মন্দির, সাটাকোশিয়া স্যাঞ্চুরী, উপজাতিদের গ্রাম অথবা ঢেউ খেলান বুনো পথে ঘুরতে ঘুরতে ক্যামেরাবন্দি করতে পারেন রঙবেরঙের নাম না জানা রঙিন পাখির ছবি৷ গাড়িতে করে জঙ্গল পথে যেতে যেতে আচমকাই চোখের সামনে এসে যেতে পারে বুনো হাতির পাল, হরিণ, সম্বর অথবা লেপার্ড৷

আরও পড়ুন: ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে প্রেমিকাকে দিন কোনও হটকে উপহার

পাহাড়ি বুনো পথ ধরে ট্রেক করে পেতে পারেন অসাধারণ অ্যাডভেঞ্চারের অভিঙ্গতা৷ অথবা সন্ধ্যার অস্তমিত সূর্যের সামনে দাঁড়িয়ে ঝুলবারান্দার রেলিং ধরে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পূর্বঘাটের দিগন্ত বিস্তৃত সবুজে হোক আপনার কল্পনার রাজকীয় পুনরুত্থান৷ আর ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকা রাতের গা ছমছমে অন্ধকারে মোমবাতির মায়াবী আলোয় রয়্যাল বারান্দায় বসে গল্পে গল্পে হয়ে উঠুন সত্যজিতের না-বলা গল্পের অজানা চরিত্র৷

কীভাবে যাবেন? হাওড়া থেকে যে কোনও ট্রেনে করে ভুবনেশ্বর, সেখান থেকে ট্রেন বদলে ১:১৫ মিনিটের পথ৷ গাড়ি ভাড়া করেও ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে যেতে পারেন আপনার গন্তব্যস্থলে৷ এছাড়া প্রতি শনিবার ৮:৫৫ মিঃ হাওড়া থেকে সম্বলপুর সুপার এক্সপ্রেসে করেও পরদিন ৩:৩৯ মিনিটে নামতে পারেন ঢেঙ্কানল স্টেশনে৷ সেখান থেকে গাড়িতে করে ১০ কিলোমিটার পথ পেরলেই গজলক্ষ্মী প্যালেস৷

আরও পড়ুন: নিরালা দ্বীপেই আছে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম আন্তর্জাতিক সেতু

কোথায় থাকবেন? থাকার একমাত্র জায়গা কুমারসাহেব জেপি সিংদেওর রাজবাড়ি৷ থাকা খাওয়া-সহ প্যাকেজ অনুযায়ী প্যাকেজ মানি ঠিক করা হয়৷ ফোন করে নিন ৯৮৬১০১১২২১ অথবা ই মেল করুন navneeta.singhdeo@gmail.com এ৷