পর পর দুদিন দুটি মারাত্মক ঘটনা৷ এক রাশিয়ায়৷ সেখানকার সেন্ট পিটার্সবুর্গ (সোভিয়েত আমলের লেনিনগ্রাদ) শহরের মেট্রো স্টেশনে বিস্ফোরণ৷ দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে গৃহযুদ্ধদীর্ণ সিরিয়ায়৷ সেখানে ভয়াবহ জৈব-রাসায়নিক হামলাবাজিতে অসংখ্য শিশু সহ বহু মানুষের মৃত্যু ঘটেছে৷ তার আগে লন্ডনে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কাছে আততায়ী হানা দিয়েছে৷ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে আইএসের ধারাবাহিক হামলায় মারা গিয়েছে অনেকে৷ আর, এর মধ্যে কাশ্মীর উপত্যকায় একের পর এক ঘটনায় নিরীহ নাগরিক থেকে শুরু করে নিরাপত্তাকর্মীর মৃত্যু ঘটছে প্রতিনিয়ত৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

কোনও ঘটনাই কিন্তু বিচ্ছিন্ন নয়৷ লন্ডনের গোয়েন্দারা যদিও বলার চেষ্টা করেছেন যে, সেখানকার আততায়ী ‘লোন উলফ’৷ তার সঙ্গে আইএসের কোনও যোগ নেই৷ কিন্তু সেই ‘লোন উলফ’ টানা পাঁচ বছর ইংরেজি শিখেছিল সৌদি আরবে৷ সিরিয়ায় জৈব-রাসায়নিক আক্রমণের দায় চাপানো হয়েছে সেদেশের প্রেসিডেন্ট বাশর আল-আসাদের সেনাবাহিনীর ঘাড়ে৷ কিন্তু আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে, আইএসের উত্থানের পূর্বমুহূর্তে, ঠিক একই ধরনের ঘটনা সিরিয়ায় ঘটিয়েছিল আইএস অনুগামীরাই৷ তুরস্কের কট্টরপন্থী মুসলিম জঙ্গিদের সহায়তায়৷ শুধু তাই নয়, বাশর আল-আসাদের বাবা হাফিজ আল-আসাদের জমানাতেও সিরিয়ায় জৈব-রাসায়নিক হামলার যতগুলি ঘটনা ঘটেছিল, সব কটির পিছনেই ছিল তুরস্কের কট্টরপন্থী মুসলিম জঙ্গিদের হাত৷ আরও যেটা লক্ষণীয়, সিরিয়ার সাম্প্রতিক জৈব-রাসায়নিক হামলার সঙ্গে চেচেন জঙ্গিদের হামলার এবং শিশুদেরই টার্গেট করে হত্যা করার এক অদ্ভূত মিল আছে৷

শুধু ভারত বলে নয়, জাতিধর্ম নির্বিশেষে মানব সভ্যতাকে যারাই বাঁচিয়ে রাখার পক্ষপাতী— তাদের সকলেরই ফোকাসটাকে আগে ঠিক করা দরকার৷ মানবসভ্যতার শত্রুরা যদি মনে করে তারাই পৃথিবীর ভাগ্যনিয়ন্তা এবং শেষকথা, তাহলে তাদের বিষদাঁত উপড়ানোর এত উপযুক্ত সময় এর আগে আসেনি৷ বহু বছর আগে ‘বর্তমানে’ লিখেছিলাম— একদিন এমন সময় আসবে যেদিন কমন শত্রুর বিরুদ্ধে আমেরিকান মেরিনকে রাশিয়ার কমান্ডো বাহিনী সেপটনাজের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে লড়াই করতে হবে৷ সেই লড়াইয়ের দিন এসে গিয়েছে৷ বিভিন্ন দেশের গুপ্তচর বাহিনীর নিজেদের মধ্যে ডার্টি গেম খেলার সময় এটা নয়৷ যারা নিজেদের পৃথিবীর কেন্দ্রস্থ সর্বোত্তম শক্তি বলে মনে করছে— পৃথিবীর বাদবাকি দেশ মিলে তাদের চেপে ধরাই এখন একমাত্র কর্তব্য৷ মনে রাখা দরকার, পাক পরমাণু বোমার ‘জনক’ এ কিউ খানের মদতদাতা ছিল যারা, তারাই বিশ্বজোড়া সন্ত্রাসবাদের উৎস, প্রেরণা এবং ভরসাস্থল৷

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন প্রশাসন একটা চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ আরব দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশকে ধরে তারা একটি ব্ল্যাক লিস্ট বানিয়েছে৷ যেখানকার এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে এবং বিমানবন্দরগুলি থেকে ল্যাপটপ সহ কোনও রকম ইলেকট্রনিক গ্যাজেট পরিবহণ করা যাবে না৷ তার কারণ, তারা এর মধ্যেই খবর পেয়ে গিয়েছে যে, আইএস ল্যাপটপ বোমা বানানোর চেষ্টা করছে৷ আর সেই কাজে তারা অনেকটা এগিয়েও গিয়েছে৷ এই অবস্থায় মার্কিন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত যে অত্যন্ত সময়োপযোগী তাতে সন্দেহ নেই৷ এই ধরনের সিদ্ধান্ত এখন অন্যান্য দেশেরও নেওয়ার সময় এসে গিয়েছে৷

মুশকিল একটাই৷ সেই অ্যাডলফ হিটলারের উত্থান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেও দেখা গিয়েছিল যে, মাথায় বাড়ি না-খাওয়া পর্যন্ত কর্পোরেট দুনিয়া ও সেই দুনিয়ার যাঁরা হর্তাকর্তা তাঁরা নড়ে বসতে চান না৷ পাছে বাণিজ্য ও মুনাফার ক্ষতি হয়! শুধু চেম্বারলেন একা নন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধার আগে পর্যন্ত ফ্র্যাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্টের মতো আমেরিকান প্রেসিডেন্টও হিটলারকে তুষ্ট রাখার পক্ষপাতী ছিলেন৷ চার্চিলের সাবধানবাণীতে কর্ণপাত করেননি৷ একই জিনিস ঘটেছিল ১৯৬০-এর শেষ এবং ১৯৭০-এর দশকে, ঠাণ্ডাযুদ্ধের কালে৷ কিংবা আরও গভীরে গিয়ে বললে তারও অনেক বছর আগে, সেই ১৯৩০-এর দশকে— চীনে৷ সেদেশের প্রাকৃতিক এবং বিশাল মানবসম্পদকে কুক্ষিগত করতে মাও সে-তুংকে তোল্লাই দিয়েছিল আমেরিকান মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স৷ ‘সাংবাদিক’ এডগার স্নো আসলে ছিলেন আমেরিকান মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সেরই লোক৷ পরবর্তীকালে সেই মাও সে-তুংই শাঁসেজলে এশিয়ার বুকে হিটলারের নয়া অবতার হয়ে দাঁড়ান৷ যাঁর উত্তরসূরিরা হয়তো এখন পাকিস্তানের সামরিক চক্র ও আরব শেখশাহির চোখে নির্বিকল্প অবতার!

আবারও বলছি, মহাশক্তিগুলির নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ের সময় এটা নয়৷ কোনও ইজমের প্রিজমে ফেলে পৃথিবীকে এখন দেখার চেষ্টার অর্থই হল অহেতুক সময় নষ্ট করা৷ বহু দিন যাবৎ বিশ্বজোড়া সন্ত্রাসের উৎস, প্রেরণা ও ভরসাস্থলগুলি চেনা হয়ে গিয়েছে৷ তাদের বিরুদ্ধে বাদবাকি বিশ্বের জোট বাঁধাটাই এখন জরুরি৷