তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: বৈষম্যের অভিযোগ ঘোচাতে অভিনব উদ্যোগ প্রশাসনের৷ এতদিন বিষ্ণুপুর মেলায় কমিটির পদাধিকারীদের ঘনিষ্ট বা শাসক দলের নেতাদের স্নেহধন্য শিল্পীরাই সুযোগ পেতেন, এমন একটা অভিযোগ ঘোরাফেরা করত। সেই অভিযোগ মেটাতে যোগ্য শিল্পীদের জন্য বিশেষ অডিশনের ব্যবস্থা করল বিষ্ণুপুর মহকুমা প্রশাসন৷

৩১তম আন্তর্জাতিক বিষ্ণুপুর মেলার সাংস্কৃতিক মঞ্চে অনুষ্ঠানের সুযোগ পাবেন তাঁরাই, যারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবে বলে জানানো হয়েছে৷ এবারই প্রথম অডিশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ যার গণ্ডি টপকাতে পারলেই শিল্পীরা জায়গা পাবেন মেলার অনুষ্ঠানের মঞ্চে।

বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর মহকুমা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন শিল্পীরাও। বিষ্ণুপুর মহকুমা প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে সেই ছবি এবার বদলাতে চলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

গত বাম আমলে তিন দশক আগে পর্যটন, সংস্কৃতি ও হস্তশিল্পের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে বিষ্ণুপুর মেলার সূচনা হয়। পরে এই মেলা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। বহিরাগত শিল্পীদের পাশাপাশি জেলার শিল্পীরাও সাংস্কৃতিক মঞ্চে অনুষ্ঠান করেন। বর্তমান সময়ে মেলার দিনগুলিতে মন্দির নগরী বিষ্ণুপুরে ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই’ অবস্থা হয়ে যায়। হোটেল, লজগুলিতেও তিল ধারণের জায়গা থাকে না।

মহকুমা শাসক মানস মণ্ডল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে আগামী ২৩ থেকে ২৭ ডিসেম্বর ৩১তম বিষ্ণুপুর মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এবার মেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হলে ‘অডিশন’ দিতে হবে শিল্পীদের। এবার প্রতিযোগিতায় মোট ১৩টি বিষয় রয়েছে। যেমন-ভাদু, টুসু, মনসা মঙ্গলের ওপর গান ও নাচ, আদিবাসী নৃত্য, রণপা, ঝুমুর, বাউল, আঞ্চলিক কবিতা, বিষ্ণুপুর ঘরাণার গান, আধুনিক গান, নাটক, যন্ত্রসঙ্গীত, যোগব্যায়াম, ম্যাজিক শো ইত্যাদি।

এর মধ্যে বেশ কিছু বিভাগে বয়স, একক বা দলগত ও নির্দিষ্ট সময় সীমার বাধ্যবাধকতা থাকছে। প্রতিটি বিভাগের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানাধিকারীরাই কেবলমাত্র মেলার সাংস্কৃতিক মঞ্চে অনুষ্ঠান পরিবেশনের সুযোগ পাবেন।

মহকুমা প্রশাসন পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে, আগ্রহীদের আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে নিজে এসে বা ডাকযোগে সাদা কাগজে লিখিত আবেদনপত্র বিষ্ণুপুর মহকুমা শাসকের দফতরে জমা দিতে হবে। এর পর সেই প্রতিযোগিতা আগামী ১৭ নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে সব কটি শনিবারে শহরের জোড় শ্রেণীর মন্দির সংলগ্ন ‘পোড়া মাটির হাটে’ অনুষ্ঠিত হবে।

আগ্রহীরা এবিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে লগ্ ইন করে পারেন ওয়েবসাইট www.bishnupurtourism.com বা দেখতে পারেন bishnupurtourism-র ফেসবুক পেজ। একই সঙ্গে ঐ ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজের মাধ্যমে প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতার নির্ঘন্ট জানিয়ে দেওয়া হবে বলে ঐ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মন্দির নগরী বিষ্ণুপুরে মহকুমা শাসক হিসেবে মানস মণ্ডল কাজে যোগ দেওয়ার পর এক সময়ের মল্লরাজাদের রাজধানী প্রাচীন এই শহরের উন্নয়নে জোর দিয়েছেন। তাঁর উদ্যোগেই এই শহরে পর্যটকদের বেশী বেশী টেনে আনতে হ্যামক বা পোড়া মাটির হাটের যেমন সূচনা করেছেন, তেমনই স্থানীয় শিল্পীদের উৎপাদিত দ্রব্য বিপননের সুযোগ বৃদ্ধির চেষ্টা করে চলেছেন।

এখনও পর্যন্ত সর্বশেষ এই বিষ্ণুপুর মেলার সাংস্কৃতিক মঞ্চে অনুষ্ঠানের জন্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিল্পী নির্বাচন- যথেষ্ট প্রশংসনীয় ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে অনেকেই জানিয়েছেন। মহকুমা শাসক মানস মণ্ডল বলেন, এর ফলে যোগ্য ও সেরা শিল্পীরা যেমন অনুষ্ঠানের সুযোগ পাবেন তেমনি এই মেলা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ, পর্যটকদের মধ্যে আগ্রহ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। এই মেলা সব প্রান্তের সব মানুষের। এই ধারণাটা আমরা সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাইছি। মন্দির নগরী বিষ্ণুপুরের উত্তরোত্তর মানবৃদ্ধি ও সকলের কাছে বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্য তুলে ধরার চেষ্টা সবসময়ই থাকবে বলেও তিনি জানান।