‘অমলের কেবিন’ – হাসির সিনেমা৷ তবে স্রেফ হাসির নয়৷ হাসতে হাসতেই সিরিয়াস৷ সম্পর্ক নিয়ে খেলা, একাকীত্ব, হিপোক্র্যাসি, নিজেকে চেনার তাগিদ, প্রজন্মের দূরত্ব সব মিলেমিশে আছে হাসির আড়লে৷ আর সেই আড়াল থেকেই নিজের বার্তাটি দিয়ে যেতে চান পরিচালক অর্ক সিনহাশুনলেন সরোজ দরবার

হাসতে হাসতে অনেক সিরিয়াস কথা বলে দেওয়া যায়৷ এই ছবিটা করার ক্ষেত্রেও কি সেরকম কোনও বার্তা দেওয়ার ছিল?

অর্ক: নিশ্চয়ই৷ আমার মনে হয়, যখনই আমরা কোনও কাজ করি, কোনও না কোনও মেসেজ দিতেই সেই কাজটা করি৷ সেটা শিল্পীর দায়বদ্ধতার মধ্যেই পড়ে৷ নয়তো যে কোনও কাজই নিছক কাজ হয়ে থেকে যাবে, শিল্প হবে না৷ সেটা আমার প্রথম ছবি ‘আমার আমি’ করার ক্ষেত্রেও মাথায় রেখেছিলাম৷ এই ছবিটাতেও যেমন হাসির খোরাক আছে, পাশাপাশি একটা বার্তাও অবশ্যই আছে৷

কী সেটা?

অর্ক:  এখন তো জয়েন্ট ফ্যামিলি ভেঙে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি তৈরি হয়েছে৷ তিন বা চারজন্য সদস্য সেখানে৷ এই ছোট ছোট ইউনিটের মধ্যেও একাকিত্ব আছে৷ যেন  একা একা বাঁচার একটা প্রবণতা আছে৷ মানে, নিজেদের সমস্যা সমাধান হয়ে গেলেই ভাল থাকা হয়ে গেল এরকম একটা ব্যাপার৷ কিন্তু ভাল থাকাটা এরকম নয়৷ ভালবাসা যত ভাগ করে নেওয়া যায়, ততোই বোধহয় ভাল থাকা যায়৷ এ ছবিতে সেটাই আমি বলতে চেয়েছি৷

ছবির ট্রেলরে একটা সংলাপ আছে, যেখানে সম্পর্ক নিয়ে খেলার কথা বলা হয়েছে৷ কোথাও কি মনে হয় এই কানেক্টেড দুনিয়াতেও সম্পর্কগুলো আলগা হয়ে গিয়েছে?

অর্ক: সময়ের সঙ্গে একটু যে আলগা হয়েছে, তা ঠিক৷ এখন ভার্চুয়াল দুনিয়া অনেক বেশি জায়গা করে নিয়েছে৷ কিন্তু আমাদের তাতে দোষ দিয়ে কোনও লাভ নেই৷ বরং সমাধানটা খোঁজা জরুরি৷ প্রযুক্তির উন্নতিকে কিছুতেই অস্বীকার করা যাবে না৷ সুতরাং এসব থাকবে৷ এখন হয়ত আগের মতো অপেক্ষা করতে হয় না৷ সহজেই সবার সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে যায়৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও এই ভার্চুয়াল পৃথিবী আমাদের সম্পর্কে কোনও প্রভাব পেলছে কি না দেখতে হবে৷ এবং তার সমাধান খুঁজতে হবে আমাদেরই৷

এ ছবিতে বিয়ে ভাঙা, তার পালটা জবাব দেওয়ার একটা ব্যাপার আছে৷ ‘ঠগিনী’ সিনেমা দেখতে গিয়ে কি কখনও এরকম একটা ছবির ভাবনা এসেছিল?

অর্ক: নাহ ‘ঠগিনী’ দেখে নয়৷ এই ছবির ভাবনাটা আসে দুটো কারণে৷ রাসবিহারীর এক রেস্তরাঁয় একদিন গিয়েছিলাম৷ তো সেই রেস্তরাঁ মালিকের সঙ্গে কথাবার্তার সময় উনি আমাকে বলেন যে, ওঁর ছেলে  পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার৷ এতবড় ব্যবসা দেখাশোনা করতে চায় না৷ সেই থেকে আমার একটা ভাবনা আসে যে, কোনও একটা প্রজন্ম যে কাজ করে, তারা চায় তাদের পরের প্রজন্মও সেই পতাকা বহন করে নিয়ে যাক৷ আর তা না হলেই একটা ভুল বোঝাবোঝির জন্ম হয়৷ আর দ্বিতীয়টা ভাবনাটা এল, আমার বন্ধুবান্ধবদের বিয়ে থেকে৷ বেশ কয়েকজন বন্ধুর সম্প্রতি বিয়ে হল৷ তো দেখলাম বিয়ে নিয়ে নানা ঘটনা ঘটছে৷ সেগুলো বেশ মজারও৷ তো এই দুটো ভাবনা থেকেই এই ছবিটা আসে৷

ছবিতে তূর্ণার অভিনীত চরিত্রটি একটা কারণে ভুগছে৷ অন্যদিকে মানালির অভিনীত চরিত্রটি তার পালটা দিচ্ছে৷ পোস্টারে মানালির মাথায় টোপর৷ কোথাও উইমেন এমপাওয়ারমেন্টের কথাও কি লুকিয়ে আছে?

অর্ক আমি  ওরকম ভাবিনি৷ কেননা আমি নারী পুরুষের সমানাধিকারে বিশ্বাসী৷ এখানে এই দুটো চরিত্রের মধ্যে মানুষের দু’রকম দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে৷ একজন, যে মা-বাবার কথাকেই শিরোধার্য করে৷ কোনওরকম প্রতিবাদ না করেই মেনে নেয়৷ বাবা-মা কোনওভাবে আঘাত পাক, সে সেটা চায় না৷ তাই কষ্ট স্বীকার করতেও রাজি৷ কিন্তু আরেকজন এই হিপোক্র্যাসিকে পাত্তা দেয় না৷ সে নিজেকে চেনার চেষ্টা করে৷ ফলত সে নিজেকে না লুকিয়ে, যেটা চায় করে৷ আমার মনে হয়, এই যে একাকিত্ব তার মূলে হচ্ছে নিজেকে না চেনা৷ আমরা একজ্যাক্টলি কী চাইছি, আমাদের চাহিদাটা কী, জানতে পারলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে৷

সুজন মুখোপাধ্যায় থেকে সৌরভ পালোধি, তূর্ণা দাস- থিয়েটারের এতজন অভিনেতাকে নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা কীরকম?

অর্ক:  খুবই ভাল৷ আমি সৌরভ, তূর্ণা দু’জনেরই অভিনয়ের খুব ভক্ত৷ আর নীলদা তো আছেনই৷ আসলে ‘আমার আমি’ ছবি থেকেই আমি সেফ খেলতে চাইনি৷ সেখানে বিশ্বনাথদাকে (বসু) অন্যরকমভাবে পরদায় এনেছিলাম৷ এখানে নীলদাকেও একেবারে অন্যরকমভাবে দেখা যাবে৷ পরিচিত মুখ দিয়ে ছবি তো করাই যায়৷ কিন্তু আমি চেয়েছিলাম সিনিয়রদের পাশাপাশি তরুণদের নিয়ে কাজ করতে৷ নতুন টিম তৈরি করে কাজ করতে৷ আর থিয়েটারে যাঁরা কাজ করেন চরিত্র নিয়ে তাঁরা নিজেরা ভীষণ ভাবনাচিন্তা করেন৷ সেটা খুব দরকারী৷ এঁরা সকলেই চরিত্র নিয়ে এঁদের নিজেদের ভাবনাচিন্তার কথা প্রতিমুহূর্তে আমাকে জানিয়েছেন৷ যেমন একদিন নীলদা বললেন, শোন আমার চরিত্রটা তো ধর্মভীরু৷ আমি বরং হাতে একটা তাবিজ রাখি৷ এই ইনপুটস পরিচালককে অনেক সাহায্য করে৷ তখন মনে হয় সকলেই এক প্যাশনে কাজ করছি৷ এ ছবিতে কাজ করার ক্ষেত্রে সেটা সবসময় ফিল করেছি৷

কমপিউটর সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে পরিচালনায় চলে আসা৷ গতবছর সেরা গীতিকারের পুরস্কার৷ এখনও অবধি নিজের কাছে নিজের জার্নিটা কীরকম?

অর্ক:  কথায় বলে, স্বপ্ন সেটাই যেটা তোমায় ঘুমোতে দেয় না৷ আমিও সেই স্বপ্নকে ছুঁয়ে চলেছি৷ ভীষণই আনন্দের৷ যখন কলেজে পড়তাম তখন কোনও কিছু দেখলে মনে হত, আমি যদি এটা ফ্রেমবন্দি করতে পারতাম! কিংবা আড্ডা দিতে দিতে কতবার হয়েছে, যদি এই শটটা এরকম ভাবে নিতে পারতাম! এখন যখন নিজে ছবি বানাই, নিজের মতো করে শট নিই, তখন মনে হয় বেঁচে থাকাটা সত্যিই আনন্দের৷ দেখ, কোনওকিছু ছেড়ে তো চলে আসাই যায়, কিন্তু ছেড়ে এসে কী করছি সেটাই আসল৷ আমার কাজে যদি মানুষকে একটুও খুশি করতে পারি, তাহলে ছেড়ে চলে আসাটা সার্থক৷ সেইসঙ্গে নিজের কাছেও প্রত্যাশা বাড়ে৷ আরও ভাল কাজ করার তাগিদ অনুভব করি প্রতিদিন৷

‘অমলের কেবিন’ ছবিটিতে অভিনয় করেছেন সুজন মুখোপাধ্যায়, মানালী দে, সৌরভ পালোধি তূর্ণা দাস প্রমুখ৷ চিত্রনাট্য- পদ্মনাভ দাশগুপ্ত৷ সংগীত-শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ‘জি বাংলা সিনেমা অরিজিনালস’-এ ছবিটি দেখান হবে ৩১ জানুয়ারী, রাত ৯টায়৷

স্বামীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বস্ত্র ব্যবসাকে অন্যমাত্রা দিয়েছেন।'প্রশ্ন অনেকে'-এ মুখোমুখি দশভূজা স্বর্ণালী কাঞ্জিলাল I