দেবময় ঘোষ, কলকাতা: কমিউনিস্টদের গিলে খেতে চান দিলীপ ঘোষ৷ ইতিমধ্যেই তিনি রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে কয়েকবার শ্মশানে পাঠিয়েছেন৷ হুমকি দিয়েছেন – ‘‘মারবো এখানে, লাশ পড়বে যেখানে সেখানে …৷’’ তবে কমিউনিস্টদের প্রতি দিলীপের রাগের প্রধান কারণ সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র৷ সোমবার আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের মুজাফ্ফর আহমেদ ভবনে বসে সূর্যকান্তর মন্তব্য,‘‘কে দিলীপ ঘোষ … আর ওটাতো ভারতীয় যাত্রা পার্টি৷ আমি অনেক আগেই বলেছি৷’’

বিকেলে মাহেশ্বরী ভবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সেরে রাজ্য বিজেপির সদর দফতর ৬ নম্বর মুরলীধর সেন লেনে ঢোকার মুখে সাংবাদিকদের দিলীপ বলেন, ‘‘আমি বলেছিলাম আপনি (সূর্যকান্ত মিশ্র) কলকাতায় পৌঁছাবেন না৷ প্রচার করতে গিয়ে৷ কারণ আমার জেলার লোক তো৷ আর সেটা সত্য হয়েছে৷ দিলীপ ঘোষ ওর চেয়ে রাজনীতিটা বেশি বোঝে সেটা প্রমাণ হয়েছে৷ আমি জিতেছি, উনি হেরেছেন৷ পার্টি কাউকে পায়নি৷ তাই, ওঁকে সেক্রেটারি করেছেন৷ এর চেয়ে আর খারাপ অবস্থা কী হবে কমিউনিস্ট পার্টির৷’’

দিলীপ আরও বলেন, ‘‘উনি নিজেই বলছেন রথযাত্রা আটকাতে তৃণমূল আগে যাক৷ দিলীপ ঘোষকে তিনি ২০১৯ এর পরে বুঝতে পারবেন৷ তা অখন বলে লাভ নেই৷ বিজেপি কী সেটা সারা ভারতবর্ষে দেখে আসুন৷ ওদের তিলক লাগানোর দরকার নেই৷ এসব ফালতু কথা বললে, পার্টির যতটুকু অস্তিত্ব আছে তাও শেষ হবে৷ দিলীপ ঘোষকে কারও থেকে সার্টিফিকেট নিতে হবে না৷ পার্টি আমাকে পশ্চিমবঙ্গে প্রেসিডেন্ট করেছেন৷ কর্মীরা সঙ্গে আছে৷ এবং কমিউনিস্টদেরকে আমরা শেষ করব৷ গিলে ফেলবো৷ এটা ওরা সময়ে দেখতে পারবেন৷’’

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘গিলে খাওয়া’র বিষয়টি নিয়ে গেরুয়া শিবির এবং লালপার্টির মতপার্থক্য রয়েছে৷ ত্রিপুরায় বাম সরকারের পতনের পর সেখানকার কমিউনিস্টরা প্রায়ই বিজেপির বিরুদ্ধে খুনখারাপি-লুঠতরাজ-ভাঙচুরের অভিযোগ করে থাকেন৷ বিপরীতে, কেরলের বাম সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এবং বিজেপি’র একই অভিযোগ রয়েছে৷ পার্টির পলিসি মাফিক বাংলাতে বিজেপির কার্যকলাপের বিরোধিতা করে এসেছে সিপিএম৷ তবে বাংলায় বিজেপির ‘খাতা খোলার’ পিছনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই চালিকা শক্তি হিসেবে বারবার চিহ্নিত করেছে সিপিএম৷ অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হয় বিজেপির৷ আবার মোদীর আমলে ২৯ শতাংশ মুসলমান ভোট হারানোর ভয়ে তৃণমূল নাকি বিজেপি বিরোধিতা করছে – তা বহুদিন ধরেই অভিযোগ জানিয়ে আসছে সিপিএম৷

সিপিএমের কিছু নেতা (বিশেষ করে সূর্যকান্ত মিশ্র) পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরও বাংলার রাজনীতিতে বিজেপির অস্তিত্ব স্বীকার করতে চান না৷ বাংলার রাজনীতিতে নিজেদের পুরাতাত্মিক গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে সূর্যকান্ত এর আগেও একবার বলেছিলেন, ‘‘ওর (দিলীপ ঘোষের) কথায় পর মন্তব্য করার প্রয়োজনীয়তা নেই৷’’ সেক্ষেত্রে সোমবার দিলীপ কয়েক কদম এগিয়ে গিয়েই বলেছেন, ‘‘কমিউনিস্টদের গিলে খেতে চান তিনি৷’’

দিলীপের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটি তথা রাজ্যে বাম পরিষদীয় দলের নেতা সুজন চক্রবর্তীর সাফ কথা, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া সারা ভারতবর্ষ জানে বিজেপি কমিউনিস্টদের ঘোষিত শত্রু৷ ওদের সঙ্গে আমাদের আদর্শ এবং তত্ত্বগত বিভেদ রয়েছে৷ কিন্তু মমতা তা মানেন না৷ কারণ মমতাই এক সময় ওদের এখানে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এসেছেন৷ এটা জানা কথা৷’’

তবে পুরানো রাজনীতির ছাত্ররা (পড়তে পারেন রাজনীতির বিশ্লেষকরা) বলছেন, দুই দল আদর্শগতভাবে দুই মেরুতে থাকলেও নেতাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ছিল৷ ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে তা বারবার দেখা দিয়েছে৷ প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ীর সঙ্গে ব্যক্তিগতস্তরে উষ্ণ সম্পর্ক ছিল সিপিএম নেতাদের৷ বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বা সিপিএমের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক হরকিষণ সিং সুরজিতের সঙ্গে অটলবিহারি এবং লালকৃষ্ণ আদবানির ব্যক্তিগত সম্পর্ক উল্লেখ করার মতো৷

ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের সঙ্গেও লালকৃষ্ণ আদবানির উষ্ণ রসায়নের অনেক গল্প শোনা যায়৷ ত্রিপুরায় বিদেশি মদতে জঙ্গী আক্রমণকে নিকেশ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মানিক সরকারের কৃতিত্বকে অনেকেই স্বীকার করেন৷ তবে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে মানিক তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আদবানিকে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন৷ পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গেও সুসম্পর্ক তৈরি হয় মানিকের৷ কেরলে ভায়ানক বন্যার পরিস্থিতিতে বর্তমানে দেশের একমাত্র বাম মুখ্যমন্ত্রী পিনরাই বিজয়নের সঙ্গে এক ফ্রেমে দেখা গিয়েছে মোদীকে৷

অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এত তথ্য জানার পর কমিউনিস্টদের কী গিলে খেতে পারবেন দিলীপ৷ নাকি ঢোক গিলতে হবে৷ তবে, অনেকেই মনে করেন, দিলীপের এই মতামত রাজনীতির মাপকাঠি দিয়েই বিচার করা উচিত৷ ব্যক্তিগত সম্পর্ক টানা উচিত নয়৷ বিধানসভার অন্দরে দিলীপের ‘চকলেট-লজেন্স’ দলমত নির্বিশেষে এমএলএ-রা খেয়েছেন৷ বাদ যাননি সুজন চক্রবর্তীও৷