নিখিলেশ রায়চৌধুরী: মালয়েশীয় বিমান এমএইচ-৩৭০-এর অন্তর্ধান নিয়ে এক নতুন তথ্য দিয়েছেন ফরাসি বিশেষজ্ঞ মার্ক দুগাঁ৷ তিনি বলেছেন, বিমানটি সম্ভবত ভারত মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়ার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল৷ দিয়েগো গার্সিয়া আমেরিকার অতীব গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি৷ নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার বলয়ে সেখানকার সমস্ত কার্যকলাপ গোপন রাখা হয়৷ মার্কিন মেরিন অষ্টপ্রহর দিয়েগো গার্সিয়া পাহারা দেয়৷ দুগাঁর মতে, হতে পারে বিমানটিকে দ্বীপের দিকে উড়ে আসতে দেখে মার্কিন সেনারা ভেবেছিল- তাদের ঘাঁটিতে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের মতো কোনও জঙ্গি হামলা হবে৷ তারা তাই গুলি করে বিমানটিকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছে৷ মার্কিন প্রশাসন যদিও এর মধ্যেই এই ধারণাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে, তবু ফরাসি বিমান বিশেষজ্ঞের মতামত একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না৷ তার কারণ, দিয়েগো গার্সিয়া শুধু আমেরিকার রণনৈতিক সামরিক ঘাঁটি নয়, এই দ্বীপ থেকে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশ্বজোড়া নজরদারির কাজ চালান মার্কিন নজরদারি সংস্থা ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি বা এনএসএ-র বাঘা বাঘা ক্রিপ্টোলজিস্ট৷ এখানকার কার্যকলাপ অত্যন্ত গোপন রাখা তাই আমেরিকার কাছে খুবই জরুরি৷

দিয়েগো গার্সিয়া আসলে ভারত মহাসাগরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত চাগোস দ্বীপমালার সব থেকে বড় দ্বীপ৷ আজ থেকে চারশ’ বছর আগে যে পর্তুগিজ নাবিক এই দ্বীপ আবিষ্কার করেছিলেন, তাঁর নামেই নাম৷ অশ্বক্ষুরাকৃতি এই দ্বীপ এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত লম্বায় ৩৭ মাইলের বেশি নয়৷ এক সময় মরিশাস দ্বীপপুঞ্জের শাসনাধীনে ছিল চাগোস দ্বীপমালা৷ কিন্তু মরিশাসের দক্ষিণে ১২০০ মাইল দূরের এই দ্বীপমালা বহুকাল ধরেই একপ্রকার স্বাধীনতা ভোগ করে এসেছে৷ ১৯৬০-এর দশকে মরিশাস ব্রিটেনের কাছে স্বাধীনতা দাবি করে৷ দ্বিরুক্তি না করে ব্রিটেন তা দিয়েও দেয়৷ সেইসঙ্গে দেয় ৩০ লক্ষ পাউন্ড৷ কিন্তু তার বিনিময়ে এই চাগোস দ্বীপমালার দখলিস্বত্ব তারা নিয়ে নেয়৷ তবে সেই দখলিস্বত্ব পাওয়ার পর দিনই ৫০ বছরের কড়ারে চাগোস আমেরিকার হাতে তুলে দেয় ব্রিটিশ সরকার৷ গোটা ব্যাপার এতটাই চুপিসাড়ে ঘটেছিল যে, তা কাকপক্ষীও টের পায়নি৷ এমনকী, ব্রিটিশ পার্লামেন্টও জানতে পারেনি৷

এখানে গোপন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তৈরির ব্যাপারটা আগে থেকেই ঠিক ছিল৷ অথচ, চাগোস দ্বীপমালা জুড়ে বাস করত অন্তত ২০০০ মানুষ৷ ব্রিটেন ও আমেরিকা মিলে স্থির করল, এদের সরাতে হবে৷ দুই শতাব্দী জুড়ে যারা পিতৃপরম্পরায় এই সব ছোট ছোট দ্বীপে বাস করত, যাদের বাপ-ঠাকুরদা সেখানকার মাটিতেই সমাধিস্থ হয়েছিলেন, তাদের সবাইকে গায়ের জোরে ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে উদ্বাস্তু করে দেওয়া হল৷ ব্রিটিশ লেখক সাইমন উইনচেস্টার এই ঘটনায় সখেদে লিখেছিলেন, ‘কেউ তখন তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি, কেউ তাদের কাতর আবেদনে সাড়া দেয়নি৷ না আর্ল, না ক্রাউন (ব্রিটিশ-রাজ), কেউ না৷’

এর পর থেকেই দিয়েগো গার্সিয়াকে কড়া পাহারায় মুড়ে ফেলে পেন্টাগন৷ এমনকী, সেখানে কর্তব্যরত মার্কিন অসামরিক কর্মীরাও রাতে দ্বীপে ঘোরাফেরা করতে পারেন না৷ দ্বীপের কাছাকাছি ভিন দেশি কোনও জলযানের যাওয়ার উপায় নেই৷ সঙ্গে সঙ্গে তাদের হয় ফিরে যেতে, নয়তো গুলি খেতে হুকুম দেয় পাহারাদার মার্কিন মেরিন৷

আমেরিকাকে ব্রিটেন দিয়োগো গার্সিয়া লিজ দিয়েছিল পঞ্চাশ বছরের জন্য৷ সেই মেয়াদ এত দিনে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা৷ কিন্তু তারপরেও দিয়েগো গার্সিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি রয়ে যাওয়ার অর্থ চিরকালের মতো দখলিস্বত্বের হাতবদল৷ এহেন দিয়েগো গার্সিয়ার সঙ্গে মালয়েশীয় এমএইচ-৩৭০-র অন্তর্ধানের সস্পর্ক টেনে ফরাসি বিশেষজ্ঞ দুগাঁ যা বলেছেন তাকে এককথায় ফালতু বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না৷