বীরভূম, শুভদীপ রায় চৌধুরী:
‘জয়াং বামস্থিতাং বিদ্যাৎ বিজয়াঞ্চাপি দক্ষিণে
বামেচ কার্ত্তিকং দেবং দক্ষে গণপতিন্তথা।।
যানিত্যা প্রকৃতিলক্ষ্মীর্দুগায়া দক্ষিণে স্থিতা।
সারদা সরস্বতী নিত্যা বামভাগে সদা স্থিতা।।’

অর্থাৎ দেবী দুর্গার কোন দিকে কোন দেবতা রয়েছে তাঁর উল্লেখ কালীবিলাস তন্ত্রে পাওয়া যায়। দেবীর বামভাগে জয়া, দক্ষিণভাগে বিজয়া, কার্ত্তিক বামভাগে, গণপতি দক্ষিণভাগে, লক্ষ্মী দক্ষিণভাগে এবং সরস্বতী বামভাগে অবস্থান করছেন। আবার কালিকাপুরাণ মতে মহিষাসুর বধের জন্য ভগবতী হিমালয়ে কাত্যায়ন মুনির আশ্রমে দশভূজা দুর্গামূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং দেবীপুরাণে উল্লেখ রয়েছে ঘোরাসুর বধের জন্য বিন্ধ্যপর্বতে আরও একবার আবির্ভূতা হয়েছিলেন আদ্যাশক্তি মহামায়া। এমন বহু পৌরাণিক উপাখ্যান রয়েছে যেখানে দেবীর মাহাত্ম্যকথা থেকে শুরু করে পুজোর রীতিনীতি এবং সূত্রপাতের কাহিনীও বর্ণিত আছে। বঙ্গের প্রাচীন বনেদিবাড়িগুলিতেও এমন প্রাচীন রীতিতেই আজও পুজো হয় নিষ্ঠার সাথে। তেমনই এক বনেদিবাড়ি হল বীরভূম জেলার ঢেকার রাজবংশের প্রাচীন পুজো, যা আজও অটুট।

বীরভূম জেলার ভবানী চট্টোপাধ্যায় জমিদারি পেয়েছিলেন জাহাঙ্গীরের সময়ে এবং রায় উপাধিও পান। সুতরাং জমিদার রায় ভবানী জমিদারি প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে বিভিন্ন দেবীদেবী ও ভগবতী দুর্গার আরাধনাও শুরু করেছিলেন আনুমানিক ১৬২৬সালে। তবে তাঁর পুজোর সাড়ম্বর বৃদ্ধি পায় পৌত্র মহারাজা রামজীবন রায়ের হাতধরে। তিনি ১৬৫০সালে সিংহাসনে বসেন ও রাজবাড়ির নতুন নাটমন্দির নির্মাণ করেন। শুধুমাত্র নাটমন্দিরই স্থাপন নয় তিনি পুজোয় ছাগ, মেষ ও মহিষ বলিদানও চালু করেন। এখনও ঢেকায় সেই পুজো চলে আসছে তবে কেউই এই পুজোকে নিজের বংশের বলে দাবী করেন না।

কারণ জানা যায় মহারাজা রামজীবন দুটি প্রায় কুড়ি কেজির খড়গ বানান, একটি কালদণ্ড ও একটি যমদণ্ড। যমদণ্ড বলির কাজে, কালদণ্ড যুদ্ধের কাজে তিনি ব্যবহার করতেন। তবে পুজোর শুরুতেই এমন এক দুর্ঘটনা ঘটে যে মহিষবলি করতে গিয়ে ব্যাঘাত ঘটান রামসরণ মল্ল(প্রধান সেনাপতি)। মহারাজা রামজীবন বলেন পুজো যেহেতু তিনি শুরু করেছেন তাই তাঁর শাস্তি পাওয়া উচিত। তখন রামজীবনের জ্যেষ্ঠপুত্র ভগবতীচরণ পিতার প্রাণ বাঁচাতে খড়গের খুঁত দেখান। তখন রামজীবন রামসাগরের তীরে যমদণ্ড এনে পাথরের আঘাতে খণ্ড করেন একটি খণ্ড হাতিয়ার রায় চৌধুরী রাজবংশের দক্ষিণাকালির বেদীতে রয়েছে আর এক খণ্ড পাওয়া যায়নি। সেই থেকে তিনি নির্দেশ দেন যে তার প্রতিষ্ঠিত পুজোকে বংশধরেরা নিজের বলে দাবী করতে পারবে না। তিনি তাঁর পুজো কুলপুরোহিতের হাতে তুলে দেন। বীরভূমের লোকপাড়ার মিশ্র বাড়ির সদস্যরা এখনও সেই পুজো করে আসছেন।

এর পরের বছর নতুন করে পুজো শুরু হয় আবার। রামজীবনের জ্যেষ্ঠপুত্র ভগবতীচরণ এড়োয়ালিতে এসে মা দুর্গার পুজো শুরু করেন, তা এড়োয়ালি বড়ো পাচানি দুর্গা নামে পরিচিত। পরের বছর দুই রাজার রাজত্ব ভেঙে দশানি ও ছয়আনি রাজত্ব হয়। রাজা দেবদত্ত ও রাজা ইন্দ্রমণি রায় চৌধুরীর রাজত্বে আরও দুটি পুজো শুরু হয়। অর্থাৎ এড়োয়ালিতে দুই রাজবাড়ির তিনটি মা দুর্গার পুজো হয়। মহারাজা রামজীবনের দ্বিতীয়পুত্র রাজা রামভদ্রের জ্যেষ্ঠবংশ বীরভূমের নপাড়ায় পুজো শুরু করেন আর কনিষ্ঠপুত্র মুর্শিদাবাদের মাজিয়ারাতে মা দুর্গার পুজো শুরু করেন। রামজীবনের তৃতীয়পুত্র নিঃসন্তান কেশব রায় ও তাঁর চার ভ্রাতুষ্পুত্র বীরভূমে হাতিয়ায় প্রথমপুজো শুরু করেন। তারপর চারভাইয়ের জমিদারি ও পুজো চারভাগ হয়ে বড় সিকির বাড়ি, পাঁচ আনা বাড়ি, সাত আনা বাড়ি ও তিনআনা বাড়ি। অর্থাৎ হাতিয়ায় আরও চারটি পুজো হয় মা দুর্গার। মহারাজা রামজীবন রায়ের নয়টি পুজো পঞ্চমুণ্ডির আসনেই হয়।

প্রসঙ্গত জমিদারির নিয়ম মেনে বোধন থেকে দশমী অবধি পুজো ও বলিদান হয়। নবমীর দিন ছাগ, মেষ ও মহিষ বলিদান হয়। সারাগ্রামের লোকজনদের জন্য সেই দিন নরনারায়ণ সেবা হয় জমিদারবাড়িতে। নবমীর দিন এক বিশেষ প্রসাদ হয়, খিচুড়িতে কারণ মিশিয়ে একপ্রকার প্রসাদ যাকে “যখা”বলে, এটি শুধুমাত্র রাজবংশের সদস্যরাই গ্রহণ করতে পারেন। দেবীকে মাছ, ডিম, মাংস ও কারণ ইত্যাদি নিবেদন করা হয় এবং মহারাজা রামজীবন রায় নয়টি পুজোর মধ্যে অপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে আজও যা আজও সেই প্রাচীন ঐতিহ্যকে মনে করায়। নবপত্রিকা আনা থেকে বিসর্জন অবধি জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এই ধারায় পুজো চলে। শুধুমাত্র সন্ধিপুজোতেই এই নিয়ম চলে না। আগে নয়টি দুর্গাপুজোতে মহিষবলি হলেও রায় ও রায়চৌধুরী রাজবংশের সদস্যরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন যে শুধুমাত্র জ্যেষ্ঠবংশই এই নিয়ম পালন করুক এবং আর সকল বংশধরগণ শুধু সঙ্কল্পের নামেই চলুক এই রীতি।

এছাড়াও, রায় ও রায়চৌধুরী রাজবাড়ির মা দুর্গার এক বৈশিষ্ট্য হলো,যখনই বলি শুরু হয়,তার আগে পুরোহিত ও রাজবংশের সদস্যরা,অর্থাৎ এড়োয়ালীর দশানির সদস্যরা গোবিন্দ রাই,নপাড়ার সদস্যরা লক্ষী নারায়ণ ও হাতিয়ার সদস্যরা রাজ রাজেশ্বর এর কাছে অনুমতি ও ক্ষমা চেয়ে নেন।এবং সেই স্থানে যখন যে বাড়ির কুলদেব এর পালি চলে সেই বাড়ির মা দুর্গার মন্দিরে তাঁদের বিগ্রহ এনে চোখ বেঁধে দেওয়া হয়।কারণ,তাঁদের মন্দির ও মা দুর্গার মন্দির হয় পাশে নাহলে পিছনে।এই নিয়ম, আর কোথাও দেখা যায় না। এই নিয়ম এড়োয়ালীর ছয় আনি ও মাজিয়ারার রায় বাড়ি মানেন না,কারণ তাঁদের গৃহদেবী মা সিংহবাহিনী। দশমীর দিন প্রাচীন রীতি মেনে দুর্গার বিসর্জন হয়, এইভাবেই বীরভূমের ঢেকার রাজবংশের নয়টি দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয় আজও নিষ্ঠাসহকারে।

তথ্য লিপিবদ্ধেঃ শুভদীপ রায় চৌধুরী

প্রশ্ন অনেক: দশম পর্ব

রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবিই শুধু নন, ছিলেন সমাজ সংস্কারকও