সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: ইনি অভিনেতা দেব নন , ইনি নেতা দীপক অধিকারী। কোনও উত্তেজনা নয়, ঠাণ্ডা লড়াইয়ে যেন নির্বাচনী ময়দান জয় করবার ছক কষছেন আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে ঘাটাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী। তার প্রমাণ সাম্প্রতিক কয়েকটি ফেসবুক পোস্ট। বিরোধী দুই প্রার্থীকেই তিনি ভোট ময়দানে খেলার সুযোগ দিয়েছেন কিন্তু নিজের জায়গাটাও সেখানে অনেকটা রেখে দিয়েছেন। বিরোধীদের তিনি যেন একটু টেস্ট করে নিতে চাইছেন।

ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রের জন্য যে নির্বাচনী লড়াই হবে সেখানে নেতা দীপক অধিকারীর বিরোধী দুই শিবিরের প্রার্থী ভারতী ঘোষ (বিজেপি), তপন গাঙ্গুলি (সিপিআইএম)। দুজনকেই তিনি যেন বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন এই ময়দান সবার, কিন্তু এই ময়দান এই মুহূর্তে তাঁর হোম গ্রাউন্ড। সুস্থ লড়াই হবে, যে জিতবে তারপর দেখা যাবে।

ফেসবুকে কি পোস্ট করেছেন দীপক অধিকারী ? ভারতী ঘোষের জন্য তিনি লিখেছেন, “বিজেপি প্রার্থী শ্রীমতি ভারতী ঘোষকে শুভেচ্ছা। উনি আমাদের জেলার এস পি ছিলেন, ঘাটালে রাজ্য সরকারের উন্নয়নের কাজে সাহায্যও করেছেন। জেতা হারা পরের কথা, আমরা সব্বাই মিলে আগামী দিনে ঘাটালে উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাব।”

একই কথা তিনি লিখেছেন তপন গাঙ্গুলি (সিপিআইএম)-র জন্যও তিনি লিখেছেন “সিপিআইএম প্রার্থী তপন গাঙ্গুলিকে অভিনন্দন। আমরা যেই জিতি বা হারি সবাই একসঙ্গে ঘাটাল এর মানুষজনের সুখ দুঃখ একসঙ্গে থাকবো। ঘাটালের উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করব। আমাদের মতবিরোধ যেন উন্নয়নের অন্তরায় না হয়।”

এইসব পোস্টের ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নেতা দীপক অধিকারী ঘাটালে বন্যার সময় তাঁর এলাকা পরিদর্শন , নৌকায় চড়ে ত্রান দেওয়ার ছবিগুলি পোস্ট করেছেন। এখানেই রাজনীতিবিদরা রাজার নীতি রাজনীতির গন্ধ পাচ্ছেন।

তাঁরা বলছেন , ‘দেব নিজে জানেন ঘাটালের জন্য বিশাল কিছু কাজ তার পক্ষে করে ওঠা সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর বিপুল ফিল্মের কাজের মধ্যে যেটুকু কাজ পেরেছেন নিজের পক্ষ থেকে চেষ্টা করেছেন যেটা তাঁর ‘আউট অফ সিলেবাস’ ছিল। তাঁর কেন্দ্রের হয়ে পার্লামেন্টে বক্তব্য পেশ করেছেন। দাবি জানিয়েছেন ,বন্যা থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের হয়ে।” এরপরের জায়গাটা তিনি কি করতে পারেন বা কি করলে তিনি আরও একবার ঘাটালে তৃণমূলের আসন ধরে রাখতে পারেন সেই চেষ্টা করেছেন কিন্তু সেটা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে। ল

ড়াইটা শুরু করেছেন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে। ‘জেতা হারা পরের কথা, আমরা সব্বাই মিলে আগামী দিনে ঘাটালে উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাব’ এবং ‘আমাদের মতবিরোধ যেন উন্নয়নের অন্তরায় না হয়’ এই দুই লাইনেই রয়েছে সেই খোলা ময়দানে লড়াইয়ের বার্তা।

একদা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থাভাজন ছিলেন ভারতী ঘোষ। পরবর্তী সময়ে একাধিক সংঘাতের জেরে লোকসভা ভোটের মুখে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন প্রাক্তন পুলিশ সুপার। প্রার্থী ঘাটাল থেকে। দেবের ভারতী ঘোষের উদ্দেশ্যে পোস্ট থেকে এটাই যেন স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে ,ভারতী যেমন দেবের এলাকা হাতের তালুর মতো চেনেন , দেবও তাঁর কেন্দ্রকে তালুর মতো না চিনলেও মানুষের সমস্যাটা জানেন।

আবার অন্যদিকে দেব ঘোর বামপন্থী পরিবারের ছেলে। সেখান থেকে তিনি বিরোধী তৃণমূলের গতবারের জয়ী প্রার্থী। ‘সবে মিলে করি কাজ , হারি জিতি নাহি লাজ’ ধাঁচের বার্তায় তপন গাঙ্গুলিকে তিনে কাছে টেনেছেন কিন্তু তিনি দিনের শেষে বিরোধী সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ লড়াই হবে , কিন্তু সেটা একটা নিজের জায়গা থেকে, নিজেদের জায়গা রেখে। যদি এর বিপক্ষে গিয়ে বা পক্ষে গিয়ে কোনও কথা বিরোধীরা কোনও সময় বলেন,সেটা ফায়ার ব্যাক করতে পারে বিরোধীদের দিকে। আর এভাবেই বিপক্ষের কোর্টে বল ফেলে যেন বিরোধীকে একটু মেপে দেখে নেওয়ার চেষ্টা করছেন গোঁফওয়ালা নেতা দেব।

রাজনীতিবিদদের মতে , ‘অনেক প্রার্থীই থাকেন যারা নিজের প্রচার করতে এসে এমন কিছু মন্তব্য পেশ করে বসেন সেটা নিজের দলের পক্ষেই অনেক সময় বিপক্ষে চলে যায়। বিগত কয়েক বছরে রাজনীতির ট্রেন্ড এটাই। সেখান থেকে সরে এসে নিজের সামাজিক ‘গুড উইল’ ধরে রেখেছেন দেব।”

অভিনয়ের ক্ষেত্রে দেব যেমন ধীরে ধীরে স্ক্রিপ্ট বেছে অন্য ধরনের ছবি করে অভিনেতা হিসাবে নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরির চেষ্টা করেছেন তেমনই পাঁচ বছরে কিছুটা রাজনীতির জমি চিনে যাওয়া দেব যেন সেই একই চেষ্টা চালাচ্ছেন এই ময়দানেও। লড়াইয়ে বিপক্ষেরও জায়গা যেমন থাকবে, নিজেরও জায়গা থাকবে।