ফাইল চিত্র৷

সুমন বটব্যাল: দু’মাসের ব্যবধানে অবশেষে দেখা মিলল বাঘের! জখম হলেন তিনজন শিকারি৷ পরে শিকারিদের তাড়া খেয়ে বাঘ-মামা পড়ে গেল কালভার্টের খালে! সেখানে মাছ ধরার মশারি জাল দিয়ে বাঘকে বন্দীও করলেন গ্রামবাসীরা৷

কিন্তু বন দফতর আসার আগেই বাঘ-বাবাজী নাকি জাল ছিঁড়ে ফের পগারপার! স্বভাবতই, বাঘকে ঘিরে ফের নতুন করে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে মেদিনীপুর শহর লাগোয়া ধেড়ুয়া বিটের বক্সিবাঁধ, সুন্দরলোটো, বাঘঘোরার জঙ্গলে৷ আতঙ্ক ছড়িয়েছে ১৫ কিমি দূরের একদা মাওবাদীদের গর্ভগৃহ লালগড়েও৷ তবে এদিন বিকেল পর্যন্ত গ্রামবাসীদের দাবিকে ‘মান্যতা’ দিতে নারাজ বনদফতর৷

মেদিনীপুর বন বিভাগের জেলা বনাধিকারিক রবীন্দ্রনাথ সাহার সাফ কথা, ‘‘এদিন ধেড়ুয়ার বক্সিবাঁধের জঙ্গলে বাঘকে দেখা গিয়েছে বলে গ্রামবাসীরা দাবি করেছেন৷ তাঁরা নাকি বাঘটিকে জালে আটকেও ছিলেন৷ তবে সে জাল ছিঁড়ে পালিয়ে যায়- গ্রামবাসীরা এমন দাবি করলেও বাঘকে স্বচক্ষে না দেখা পর্যন্ত আমরা এবিষয়ে ষোলো আনা নিশ্চিত হতে পারছি না৷!’’ শাসকদলের একাংশের আশঙ্কা, পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে নতুন করে জঙ্গলমহলে অশান্তি তৈরি করতেই পরিকল্পিতভাবে বাঘাতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে৷

দলের পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা সভাপতি অজিত মাইতি বলছেন, ‘‘গত দু’মাস ধরে কোনও গবাদি পশু নিখোঁজ হল না৷ অথচ বাঘ নাকি দিব্যি মেদিনীপুর, বাঁকু়ড়া, পুরুলিয়ার এই জঙ্গল থেকে সেই জঙ্গল চষে বেড়াচ্ছে৷ এদিন আবার বাঘ ধরা পড়ল, জাল ছিঁড়ে পালিয়েও গেল! এরকম আবার হয় নাকি৷’’ শাসকদলের সন্দেহকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছে না জেলা পুলিশ৷ জেলা পুলিশ সুপার অলোক রাজোরিয়া বলছেন, ‘‘জঙ্গলে বাঘ আছে নাকি পরিকল্পিতভাবেই গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে- তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে৷ কোনও অবস্থাতেই শান্ত জঙ্গলমহলকে অশান্ত করার প্রচেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না৷ আমরা সবসময় সজাগ রয়েছি৷’’

বাঘের আক্রমণে মেদিনীপুর মেডিক্যালে ভরতি হয়েছেন ধেড়ুয়ার বক্সিবাঁধের সুদান সরেন, মদনলাল সরেন ও পুন্ডা মুর্মু৷ পেশায় শিকারি৷ তাঁদের দাবি, ‘‘এদিন আমরা ৩০-৩৫ জন জঙ্গলে শিকারে গিয়েছিলাম৷ আচমকাই জঙ্গল ভেদ করে সামনে চলে আসে ছোট সাইজের একটি চিতা বাঘ৷ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে আমাদের আক্রমণ করে৷ তবে দলে একসঙ্গে অনেকে থাকায় আমরা পালটা আক্রমণ করলে চিতাবাঘটি ভয়ে পালাতে গিয়ে জঙ্গল লাগোয়া কালভার্টের খালে পড়ে যায়৷ মাছ ধরার মশারি দিয়ে আমরা সেটিকে বন্দী করি৷’’

সুদান, মদনলালদের দাবি, ‘‘বন দফতরের গাছাড়া মনোভাবের জেরেই বাঘকে জালে বন্দী করেও শেষ রক্ষে হল না৷ ফের সে জাল ছিঁড়ে পালিয়ে গেল৷’’ বলছেন, ‘‘আমরা চিতাবাঘটিকে জাল বন্দী করেছিলাম বেলা ১২ টা নাগাদ৷ সঙ্গে সঙ্গে খবর দেওয়া হয়েছিল বন দফতরে৷ কিন্তু তাঁরা বহু দেরি করে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়৷ ততক্ষণ বাঘটি জাল ছিঁড়ে পালিয়ে গেছে৷’’ গ্রামবাসীদের কাছ থেকে বাঘ-বন্দীর খবর পেয়ে বিশাল বাহিনী ও খাঁচা সহ ঘটনাস্থলে আসেন মেদিনীপুরের অতিরিক্ত জেলা বনাধিকারিক পূরবী মাহাতো৷ তবে ততক্ষণে বাঘ পগারপার!

গত দু’মাস ধরে বাঘাতঙ্ক জারি রয়েছে জঙ্গলমহলে৷ ঝাড়খন্ড সীমান্তঘেঁষা পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের গুড়পান, দুয়ারসিনি, কুইলাপাল, ঝাড়গ্রামের লালগড়, মেদিনীপুর শহর সংলগ্ন ধেড়ুয়া, গুড়গুড়িপাল কিংবা বাঁকুড়ার সারেঙ্গা বা সিমলাপালের জঙ্গলমহলেও ছড়িয়েছিল তীব্র বাঘাতঙ্ক৷ নতুন করে বাঘের দেখা মেলার খবরে, জঙ্গলমহলে আতঙ্কে বেড়ে গিয়েছে কয়েক’শ গুণ৷ কেউই জঙ্গলমুখী হতে চাইছেন না৷ শাসকদলের একাংশের মতে, পরিকল্পিতভাবেই এই গুজব ছড়ানো হচ্ছে৷ যাতে মানুষ জঙ্গলমুখী না হন৷
কারণ, তাঁদের দাবি- জালবন্দী হয়েও শেষ পর্যন্ত বাঘ-মামার ‘বাগে’ না আসার পিছনে রয়েছে অশুভ চক্রের আঁতাত৷ বাঘাতঙ্কের আড়ালে কেউ কেউ মাও-জুজুও দেখছেন৷ পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, তদন্তে সব দিকেই নজর রাখা হচ্ছে৷ নজরে সেই- ‘বহিরাগত’রা!