সরোজ দরবার:

 একদল বলবান লোক আছেন, তাঁরা সংগীতকে দ্বীপান্তরে চালান করিতে পারিলে সুস্থ থাকেন। শ্যামের বাঁশির উপর রাগ করিয়া রাধিকা যেমন বাঁশবনটাকে একেবারে ঝাড়ে-মূলে উপাড়িতে চাহিয়াছিলেন ইহাদের সেইরকম ভাব। মাটির উপর পড়িলে গায়ে ধুলা লাগে বলিয়া পৃথিবীটাকে বরখাস্ত করিতে ইহারা কখনোই সাহস করেন না, কিন্তু গানকে ইঁহারা বর্জন করিবার প্রস্তাব করেন এই সাহসে যে, তাঁরা মনে করেন গানটা বাহুল্য, ওটা না হইলেও কাজ চলে এবং পেট ভরে। এটা বোঝেন না যে, বাহুল্য লইয়াই মনুষ্যত্ব, বাহুল্যই মানবজীবনের চরম লক্ষ্য। সত্যের পরিণাম সত্য নহে, আনন্দে।’– কথাগুলো যে মানুষটি লিখে গিয়েছিলেন, তাঁর লেখা একটি কবিতার প্রথম স্তবকটিই এ 2004091301921301দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে৷ ঘটনা হল, তাঁর সংগীতচিন্তার ছিটেফোঁটাও গৃহীত হয়নি৷ এ দেশে তাই ‘বলবান’ লোকের সংখ্যা কখনও কমে না৷ তাঁর আমলে ছিল৷ তিনি লেখার আগেও ছিল৷ তিনি লেখার পরেও আছেন, বরং বলা ভালো এখন আরও বেড়েছে বই কমেনি৷ এই ‘বলবান’ লোকের দল থেকে থেকেই এটা ওটা ইস্যুতে সঙ্গীতের উপর দাদাগিরি ফলান৷ এবং অভিযোগটিও ওই রাধিকার বাঁশঝাড় ওপড়ানোর থেকে আলাদা কিছু হয় না৷ এই যে গুলাম আলি সাবের অনুষ্ঠান বন্ধ করতে উঠেপড়ে লাগল শিবসেনা, তাঁর কারণ সঙ্গীত নয়, গুলাম আলি সাব তো ননই৷ তাঁরা বন্ধ করতে চান কেন না, তিনি পাকিস্তানের অধিবাসী৷ কেননা পাকিস্তান এদেশে প্রতি তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধ করেনি৷ সুতরাং সে দেশের একজন শিল্পী কেন এদেশে গান গাইতে আসবেন? গণতান্ত্রিক দেশে আর কিছুর ক্ষমতা থাকুক বা না থাকুক প্রতিরোধে, প্রতিবাদের ক্ষমতা আছে ষোলআনা৷ বাথরুম পছন্দ না হওয়া থেকে সন্ত্রাস, যে কোনও ইস্যুতেই গেঁড়ে প্রতিবাদে সামিল হওয়া হয়ে যায়৷ এতএব দে শিল্পীর অনুষ্ঠান ভন্ডুল করে৷ এবং দিলও৷ সেনাদের প্রতি সম্মান জানাতেই নাকি এই বয়কট৷ কী করবে সঙ্গীতপ্রেমীরা? দু’দিন ফেসবুকে গুলাম আলির ছবি শেয়ার করবে, ইউটিউব থেকে গান শেয়ার করবে৷ হা-হুতাশ করবে৷ আর যারা সঙ্গীতের রসজ্ঞ শ্রোতা, তাঁরা হয়ত রেকর্ড চালিয়ে তাঁর গজলে বুঁদ হয়ে এ পোড়া দেশের কপালে করাঘাত করবেন৷ কিন্তু তাতে কী আর এসে যায়৷

আসলে কোথাও কিছু এসে যায় না৷ ‘কাশ্মীর’ নিয়ে  হাজার একটা ‘হায়দার’ বানানো  হোক আর হাজারবার শাহিদ কাপুর পুরস্কার পান, কাশ্মীর সমস্যা যে ভিক্ষুকের ঘায়ের মতোই একটি জিইয়ে রাখা সমস্যা তা দু’দেশেই জানে৷ ভারত-পাক সমস্যাও কী চাইলে মিটতে পারে  না? পারে হয়ত৷ কিন্তু কেন মিটবে? তুরুপের তাসটা কি যখন তখন বের করতে আছে৷ এই যে ভারত-পাক সম্পর্কের সমস্যাকে শিখণ্ডি করে যখন তখন জাতীয়তাবোধের হু হু বাঁধভাঙা জোয়ার আনা যায়, আর ভোটনির্ভর গণতন্ত্রের বৈতরণী তরতরিয়ে  পেরিয়ে এক একবার এক একটা দলকে ক্ষমতার পোলাওতে মুখ গুঁজে দেয়, তাকে কি এত সহজে নির্মূল করা যায়৷ সোনার ডিম দেওয়া রাজহাঁসকে একদিনে মেরে ফেলবে, দুই দেশই কি এমন বোকা নাকি! এ কথা তখতে যাঁরা বসে আছেন তাঁরাও যেমন জানে, আমাদের মতো ফুটপাথে থুতু ফেলে জাতীয়সঙ্গীতে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া জনসাধারণ, সকলেই জানি৷


মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সিদ্ধান্ত বোধহয় শুধু সঙ্গীত নয়, বৃহত্তর সংস্কৃতিপ্রেমীদেরকেও স্বস্তি দেবে৷ নাহঃ পুরভোটে সন্ত্রাস আর কারচুপির চিত্র এই সিদ্ধান্তে বদলাবে না, বদলাবে না আরও অনেক কিছুই৷ তবু না হওয়া, না মেটা অনেক কিছুর মধ্যেই বাংলার একজন মানুষ অন্তত এখনও ভাবতে পারবেন, কিছুটা হলে স্বাতন্ত্র এখনও তাদের আছে৷ গোটা দেশটাই এখনও মহারাষ্ট্র আর গুজরাট হয়ে যায়নি৷


তবু মাঝে মধ্যে কোপ পড়ে সঙ্গীত, শিল্প, সাহিত্যের উপরে৷ শিল্পী, সাহিত্যিক বেচারারা তো আর বারুদ নিয়ে কারবার করেন না৷ গোদা তর্কতেও তাঁদের রুচি নেই৷  তাঁরা যে সাম্যবাদে নিয়ে পৌঁছন তা অনুভবের৷ সেখানে ওই তুরুপের তাসের জারিজুরি চলে না ৷ ফরিদা খানুম যখন ‘আজ জানে কি জিদ না করো’ গাইতে থাকেন, রেকর্ডেই, তখন কেইবা ভাবে এদেশে গোমাংস নিষিদ্ধ নাকি নিষিদ্ধ নয়৷ কে ভাবে টাকায় গান্ধী নাকি জিন্নার ছবি৷ আমি নিশ্চিত পণ্ডিত রবিশসংকরের সেতার শুনতে বসলে পাকিস্তানেও কেউ এ কথা ভাবে না৷ আর এটাই তো মুশকিল৷ এই যে তলে তলে ধর্মীয় মৌলবাদের একগলা জলে জনগণকে চুবিয়ে রাখার চেষ্টা, এঁরা তো একটা ‘সা’ লাগিয়েই তা বানচাল করে দেন৷ দলীয় কর্মসূচি বছরভর বিক্ষোভ প্রতিবাদে মুখ ঘষটে যে অন্ধকারে দেওয়াল তৈরি করে, এঁরা এক নিঃসাড় টোকায় তা ভেঙে দেন৷ কখন যে সব ভেদ ভুলিয়ে সকলকে এক মানুষে পরিণত করে তোলেন, ঈশ্বর-আল্লহকে এক সুরে মিলিয়ে দেন, তার ঠিক নেই৷ ওই যে মেহেদি হাসান সাব বলেন, সুরই ঈশ্বর৷ কেননা সুরকে তো দেখা যায় না, অনুভবে ছোঁয়া যায়, যেমন ঈশ্বরকে৷ সুতরাং এঁরা হাতে বারুদ না নিলেও খতরনাক লোক তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷ তাছাড়া গান বলো বা সঙ্গীত, তাই বা এমন জরুরী কি জিনিস? অথচ, ‘এটা বোঝেন না যে, বাহুল্য লইয়াই মনুষ্যত্ব, বাহুল্যই মানবজীবনের চরম লক্ষ্য। সত্যের পরিণাম সত্য নহে, আনন্দে। আনন্দ সত্যের সেই অসীম বাহুল্য যাহাতে আত্মা আপনাকেই আপনি প্রকাশ করে–কেবল আপনার উপকরণকে নয়। যদি কোনো সভ্যতার বিচার করিতে হয় তবে এই বাহুল্য দিয়াই তার পরিমাপ। কেজো লোকেরা সঞ্চয় করে। সঞ্চয়ে প্রকাশ নাই, কেননা প্রকাশ ত্যাগে। সেই ত্যাগের সম্পদই বাহুল্য।’- হ্যাঁ রবীন্দ্রনাথ এদেশে বৃথাই ভেজেন, বৃথাই ভেজান৷

Mamata_banerjeeমমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সঙ্গীতের পরিসরে একটি রাজনৈতিক চালই চেলেছেন৷ দিল্লিতে কেজরীওয়ালের সঙ্গে তিনি আগেও দেখা-সাক্ষাৎ করে এসেছেন৷ এবারও সেই দিল্লির সঙ্গে সঙ্গে তিনিও শহরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন গুলাম আলিকে৷ খেলা রাজনৈতিক সন্দেহ নেই, তবু স্বাগত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ এযাবৎ তিনি গঙ্গাপারকে যত সুন্দর করুন আর আর ‘পরমা’মূর্তিহীন পরমা উড়ালপুল চালুর আয়োজন করুন, মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালির মন তিনি কিছুতেই পাননি৷ ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে  বারবার প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়েছে তাঁকে৷  কিন্তু, এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে ধর্মের প্রশ্ন খাটো হয়ে যাবে, বড় হয়ে উঠবে তাঁর সাস্কৃতিক ধর্মনিরপেক্ষ ইমেজ৷ যে কোনও ধর্মের নামে উগ্র মৌলবাদ বিরোধী তাঁর ইমেজটি যে এক ধাক্কায় অনেকটাই ঝকঝকে হয়ে উঠবে তা বুঝেই হয়ত তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন৷ তবু, এ রাজ্যের মুখ তো তাতে উজ্জ্বল বই অন্য কিছু হয়নি৷  সংস্কৃতির পীঠস্থান হিসেবে রাজ্যের যে গর্বের পরিসর, তা তো নানা সময়ে নানা কাজে হোঁচট খেয়েছে৷ বাংলার মানুষ নিশ্চয়ই তসলিমা প্রশ্নে পূর্বতন ও বর্তমান দুই সরকারেরই ভূমিকার কথা ভুলে যাননি৷ যে বাংলা রবীন্দ্রনাথের, যে বাংলা লালনের, পণ্ডিত রবিশংকর ও উস্তাদ আলি আকবর খাঁ সাহেবের স্বর্গীয় যুগলবন্দির, সেই বাংলার মানুষ নিশ্চয়ই বারবার নানা পরিস্থিতিতে লজ্জায় মুখ ঢেকেছেন৷  বুকের মধ্যে জ্বালা টের পেয়েছেন৷ মনে মনে বলেছেন, ব্রুটাস তুমিও৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সিদ্ধান্ত বোধহয় শুধু সঙ্গীত নয়, বৃহত্তর সংস্কৃতিপ্রেমীদেরকেও স্বস্তি দেবে৷ নাহঃ পুরভোটে সন্ত্রাস আর কারচুপির চিত্র এই সিদ্ধান্তে বদলাবে না, বদলাবে না আরও অনেক কিছুই৷ তবু না হওয়া, না মেটা অনেক কিছুর মধ্যেই বাংলার একজন মানুষ অন্তত এখনও ভাবতে পারবেন, কিছুটা হলে স্বাতন্ত্র এখনও তাদের আছে৷ গোটা দেশটাই এখনও মহারাষ্ট্র আর গুজরাট হয়ে যায়নি৷