সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: তিনি একাধারে ভারতপ্রেমী, সমাজসেবী। অপরদিকে তিনি খ্রিস্টান তবু তিনি জপেছেন কালী নাম। এমনই উদার ছিল তাঁর মন। খ্রিস্ট এবং কালী উপাসনায় কোনও ফারাক আছে বলে তিনি মনে করেননি। সবই এক বলে মনে করতেন তিনি।

‘খ্রিস্টে আর কৃষ্টে কোনও তফাৎ নাই রে ভাই’। ‘জাতিস্মর’ ছবিতে এই গান গাইতে দেখা গিয়েছিল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিকে। শুধু অ্যান্টনি একা নন এমনটাই ভাবতেন ভগিনী নিবেদিতাও। ভারতে অনেকটা সময় কাটিয়েছেন সিস্টার নিবেদিতা। অ্যান্টনির মতো তিনি মজেছিলেন কালী মায়ের রূপে। সেই সময় কালে তিনি বিবেকানন্দসহ রামকৃষ্ণ এবং সারদা মা’য়ের। তখনই তিনি এই মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন। কালীমণ্ডপে বসে করেছিলেন কালীর নামজপ।

শোনা যায়, নিবেদিতা কালীর উপাসকদের মধ্যে বসে কালীনাম করতে পেরে নিজেকে শ্রীঠাকুরেরই পদাঙ্কনুসরণকারী মনে করতেন। তিনি বলতেন, ‘কালীই বল আর যীশুই বল, ভগবান একই’। এই উদারভাবে উত্তরণ ঘটেছিল নিবেদিতার।

রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ সূত্রে জানা যায়, ভগিনী নিবেদিতা অনুভব করেছিলেন কালী নাম জপ করলেও তিনি নিজের প্রিয় যীশুখ্রীষ্টর কাছ থেকে দূরে সরে যাননি। বরং পেয়েছিলেন এক উদার সর্বজনীন ধর্মভাবের স্বাদ। বুঝেছিলেন যথার্থ অধ্যাত্মচেতনা হল সকলের অন্তর্নিহিত দেবভাবকে চিনতে পারা। সকলের সঙ্গে একাত্ম বোধ করা—তা সে যে ধর্মের যে ভাষার যে ধর্মেরই হোক না কেন!

রামকৃষ্ণ মঠের বিভিন্ন বই থেকে জানা যায়, স্বামীজী বলতেন, বেদান্তের ভাব গ্রহণ করে একজন খ্রীষ্টান আরও ভালো খ্রীষ্টান হবে। ঠাকুর ছিলেন শাক্তের কাছে শাক্ত, বৈষ্ণবের কাছে বৈষ্ণব, মুসলমানের কাছে মুসলমান, খ্রীষ্টানের কাছে খ্রীষ্টান। ঠিক সেই মনোভাবেই নিজেকে ডুবিয়েছিলেন ভারতপ্রেমী এই সমাজসেবী।

নিবেদিতা খ্রীষ্টধর্ম ত্যাগ করেননি, বরং তাঁর জীবনে সেই ধর্ম হয়ে উঠেছিলো আরও প্রাণবন্ত, আরও জীবন্ত, আরও উদার। নিবেদিতা যখন বিদেশে ভারতে কাজের জন্যে অর্থসংগ্রহে গিয়েছিলেন, তখন তাঁকে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। অনেকেই তাঁকে প্রশ্ন করতেন তিনি খ্রীষ্টধর্ম ত্যাগ করেছেন কি না। নিবেদিতার উত্তর ছিল রামকৃষ্ণ সংঘের তিনজন খ্রীষ্টান সদস্যের মধ্যে তিনিও একজন।

ভগিনী নিবেদিতার জন্ম উত্তর আয়ারল্যান্ডে। তিনি তাঁর পিতা স্যামুয়েল রিচমন্ড নোবেলের নিকট এই শিক্ষা পান যে মানব সেবাই ঈশ্বর সেবা। পিতার কথা তাঁর পরবর্তী জীবনেও গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। তিনি সঙ্গীত ও শিল্পকলার বোদ্ধা ছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে ১৮৮৪ সাল থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত দশ বছর তিনি শিক্ষকতা করেন। শিক্ষিকা হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। শিক্ষকতা করতে করতেই তিনি বুদ্ধেরশিক্ষা সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এই সময়ই স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। বিবেকানন্দের বাণী তাঁর জীবনে এতটাই গভীর প্রভাব বিস্তার করে যে তিনি ভারতকে তাঁর কর্মক্ষেত্ররূপে বেছে নেন। তিনিই প্রথম পাশ্চাত্য নারী যিনি ভারতীয় সন্ন্যাসিনীর ব্রত গ্রহণ করেছিলেন।

Proshno Onek II First Episode II Kolorob TV