সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: সাধে কি দেশবন্ধু নামে খ্যাত হয়েছিলেন। তিনি নেতাজীর রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু, আলিপুর বোমা মামলায় ঋষি অরবিন্দের ত্রাতা। বিনা পয়সায় লড়েছিলেন পুরো মামলাটি। কলকাতার প্রথম মেয়র তিনিই। সেই তিনিই বুঝেছিলেন ইংরেজদের কূটনৈতিক চালে জড়িয়ে পড়ছে ভারত। ভাগ হয়ে যাচ্ছে হিন্দু মুসলিমে। সম্প্রীতি রক্ষা করতে নেমে পড়েছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। তৈরি করেছিলেন ‘Bengal Pact’।

বলা হয় , চিত্তরঞ্জন দাস হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জ্বলন্ত অগ্রদূত ছিলেন। ১৯২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত স্বরাজ্য পরিষদ দলের এক সভায় চুক্তির ওই শর্তাবলি গৃহিত হয়। বাংলায় কংগ্রেসের অনেক নেতা চুক্তিটির বিরোধিতা করে। এস.এন ব্যানার্জী, বি.সি পাল এবং অন্যান্যদের নেতৃত্বে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হিন্দুরা এটির বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

আরও পড়ুন: মুখ্যমন্ত্রী আসেননি, NRS-এ পরিবহর সমর্থনে উত্তরবঙ্গ থেকে এলেন চিকিৎসকরা

ঐতিহাসিকদের মতে তাঁদের ভয় ছিল যে, ওই চুক্তি হিন্দু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক প্রভাব দুর্বল করে ফেলবে। তারা সি.আর দাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে যে, তিনি হিন্দুদের অধিকার বিসর্জন দিচ্ছেন। অনেকই মনে করতে শুরু করেন দেশবন্ধু মুসলমানদের আস্থা অর্জন করার জন্যই চুক্তি করে ছাড় দিচ্ছেন সবকিছুতে।

চিত্তরঞ্জন দাস এই নীতি অনুযায়ী  ১. কোনও সভাতে হিন্দু মুসলমান লোক সংখ্যা অনুপাতে প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে৷ ২. জেলা বোর্ড বা স্থানীয় বোর্ডের নির্বাচনের সময় যে স্থানে মুসলমানগণ সংখ্যায় অধিক সেখানে তাহারা শতকরা ৬০জন নির্বাচিত হবেন আবার যেখানে হিন্দুগণ সংখ্যাধিক্য সেখানে হিন্দুগণ নির্বাচিত হবেন । বাকি ৪০জন পৃথক বা মিশ্রিত। ৩. জনসংখ্যার অনুপাতে মুসলমানগণের চাকরির ব্যবস্থা এবং সেই ব্যবস্থা অনুযায়ী শতকরা ৫৫টি সরকারি চাকরি মুসলমানগণ পাবেন। এই সংখ্যা পরে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে ৫২ হয়।

৪. আইন প্রণয়ন করে ধর্মবিষয়ের কোনও ব্যাপারে ( যেমন ঈদের সময়ে গো – কোরবানী) বাধা নিষেধ করা হবে না । ধর্ম বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা যাবে তখনই যখন সেই বিষয়ে সেই সম্প্রদায়ের শতকরা ৭৫জন তাঁদের মতপোষণে রাজি হবেন। ৫.ধর্মীয় ব্যাপারে যদি গো-কোরবানির প্রয়োজন হয় তবে হিন্দুগণ ওতে বাধা দিতে পারবেন না, আবার মুসলমানগণও এমনভাবে এবং স্থানে গো-হত্যা করবেননা যাতে হিন্দুগণ প্রাণে ব্যথা পান। মসজিদে নমাজ পড়বার সময় হিন্দুগণ মসজিদের সম্মুখ দিয়ে শোভাযাত্রায় কোনো বাজনা বাজাতে ও বা সংগীত করে যেতে পারবেন না ।

তবে বাংলার মুসলমানগণ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছিল। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি ‘bengal Pact’ পাস করে এবং প্রস্তাবগুচ্ছ কোকনদ – কংগ্রেসে উপস্থাপন করা হয় সর্বভারতীয় কংগ্রেসের অনুমোদনের জন্য । এই কংগ্রেসে সভাপতিত্ব করেন মৌলনা মহম্মদ আলি ।

অধিবেশনে ঐ প্রস্তাব উত্থাপিত হলে অধিকাংশ প্রতিনিধি ‘Delete the Bengal Pact’ বলে চিৎকার শুরু করে দেন। কিন্তু অধিবেশনে ঠিক হয় ‘একটি ভারতীয় Pact Committee’ প্রত্যেকটি প্রদেশে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে চুক্তির কথা বিবেচনা করে দেখবে । কিন্তু ১৯২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কোকনদ সেশনে চুক্তিটি বাতিল করা হয়।

ইতিহাস অনুযায়ী , কোকনদ কংগ্রেস কংগ্রেস আন্দোলনের ইতিহাসে এক বিশাল ভুল ছিল। দেশবন্ধু এর সমালোচনা করে তৎকালীন কংগ্রেসের জাতীয় স্তরের নেতাদের উদ্দেশ্যে করে বলেছিলেন, ‘তোমরা সভার সিদ্ধান্তসমূহ থেকে বেঙ্গল প্যাক্টকে মুছে ফেলতে পার, কিন্তু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে বাংলাকে বাদ দিতে পারবে না। এ রকম শিষ্টাচারহীন রীতিতে বাংলাকে মুছে ফেলা যাবে না।

আরও পড়ুন: কালো টাকা ইস্যু: ৫০ ভারতীয় ব্যবসায়ীর নামপ্রকাশ সুইস ব্যাংকের

যারা চিৎকার করে বলে যে ‘বেঙ্গল প্যাক্টকে মুছে ফেল’ তাদের যুক্তি আমি বুঝতে পারি না। বাংলা কি অস্পৃশ্য? যদি তাই হয়, বাংলা তার নিজের ব্যবস্থা নিজেই গ্রহণ করতে পারবে। তোমরা অভিমত ব্যক্ত করার ব্যাপারে বাংলার অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করতে পার না’। তবু ১৯২৪ সালের জুন মাসে সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মেলন কর্তৃক তিনি চুক্তিটির শর্তাবলি অনুসমর্থন করিয়ে নিতে সক্ষম হন।

১৯২৪ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে স্বরাজবাদী বিজয় অর্জন করে এবং চিত্তরঞ্জন দাশ প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯২৫ সালের ১৬ জুলাই মাত্র ৫৫ বছর বয়সে মারা জান দেশবন্ধু।
তথ্যসূত্র – ‘দেশবন্ধু রচনাসমগ্র ‘ এবং ‘জয়শ্রী’ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস সংখ্যা, আষাঢ় ১৪০৭