দেবময় ঘোষ: দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি এবং রায়গঞ্জ – রাজ্যে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন ‘প্রেস্টিজ ফাইট’বা সম্মানযুদ্ধ৷ রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল এবং কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি ছাড়াও এই নির্বাচনে বামফ্রন্টেরও ভাগ্য নির্ধারণ হবে৷

কেন্দ্র রায়গঞ্জ: উত্তর দিনাজপুরের এই রায়গঞ্জে গতবারের জয়ী সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য প্রার্থী মহম্মদ সেলিম এবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন৷ সিপিএম আশা করছে সেলিমের জেতা আসন ঘরে রাখতে পারবে৷ সেলিমের বিপরীতে কংগ্রেস হেভিওয়েট দীপা দাসমুন্সী৷ রায়গঞ্জ এক সময় দীপার স্বামী প্রিয় দাসমুন্সীকে জয়যুক্ত করত৷

কং-সিপিএমের ভোট কাটাকাটিতে ২০১৪ সালে সেলিম রায়গঞ্জে জিতে যান৷ কিন্তু পাঁচ বছর পর ওই কাহিনী দীপা মনে আর রাখবেন কেন? সেবারে তো প্রিয় দাসমুন্সীর ভাই-ই দীপার বিরুদ্ধে তৃণমূলের টিকিটে দাঁড়িয়ে যান৷ ফ্যামেলি ফাইট, ভোট কাটাকাটিতে জিতে যান সেলিম৷ এবারে অবশ্য প্রিয়-দীপা পুত্র প্রিয়দীপ এবং প্রিয় ভ্রাতা সত্যরঞ্জন দাসমুন্সী – দু’জনেই দীপা দাসমুন্সীর হয়ে কোমর বেঁধে নেমেছেন৷ সুতরাং ভোট কাটাকাটির কোনও সুযোগ সেই৷

২০১৪ সালে দীপা সেলিমের কাছে ১৬৩৪ ভোট হেরেছিলেন৷ তৃতীয় স্থান পেয়েছিলেন বিজেপি প্রার্থী নিমু ভৌমিক৷ এবারে রায়গঞ্জ কেন্দ্র কিছুতেই সেলিমের হাতে ছাড়তে চাননি দীপা৷ কংগ্রেস-সিপিএম মহলে অনেকে আড়ালে বলছেন, রায়গঞ্জের ভবিষ্যতের কংগ্রেস প্রার্থী প্রিয়দীপ নিজেই৷

প্রিয়র গড়কে সামলাতে বাম-কং আসন সমঝোতার রাস্তায় সব থেকে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান দীপা নিজেই৷ সেলিমের আগেই তিনি এলাকায় প্রচার শুরু করে দিয়েছিলেন৷ তবে যদি ভেবে থাকেন রায়গঞ্জে লড়াইয়ে সেলিম-দীপা ছাড়া আর কেউ নেই তবে ভুল করবেন৷ গতবারে, সেলিম জিতবেন কেউ আশা করেনি৷ এবারে বিজেপি প্রার্থী দেবশ্রী চৌধুরী সেলিম-দীপাকে বেগ দেবেন বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা৷ তৃণমূল প্রার্থী কানাইয়ালাল আগরওয়াল কত ভোট পান সেদিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের৷

কেন্দ্র দার্জিলিং: গোর্খাদের পাশে আছে বিজেপি৷ কিছুদিন আগেই বলে গিয়েছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ৷ দলের সভাপতি যা বলেছেন, সেকথাই জলপাইগুড়িতে আবার বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী৷ তবে পাশে থাকার বার্তা দিলেও গোর্খাদের কোনও বিশেষ দাবির বিষয়ে কিছুই বলেননি মোদী৷ ৷ তিনি বলেন, ‘‘গোর্খা ভাইদের বলছি আমরা আপনাদের সঙ্গে রয়েছি৷’’ এবারের দার্জিলিংয়ে নির্বাচন ভোট বিশেষজ্ঞদের কাছে খুবই চিত্তাকর্ষক৷ বিজেপির দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গোর্খাদের উপর অত্যাচার করেছে৷

গোর্খাদের উদ্দেশ্যে একথা বলেছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি৷ এছাড়াও জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণ বা এনআরসি প্রশ্নে মোদী বলেছেন, গোর্খাদের এনআরসি নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই৷ গোর্খা ভাইদের কোনও লোকসান হতে দেব না৷ তবে যারা শরণার্থী তারা কংগ্রেস সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য ভুক্তভোগী৷ তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে৷ ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে দার্জিলিং কেন্দ্র থেকে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থনে জিতেছিল বিজেপি৷ কিন্তু এই লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপির সাংসদ সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়া এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না৷ তার বদলে বিজেপি প্রার্থী রাজু সিং বিস্ত৷ বিজেপি প্রার্থীকে সমর্থন করছে বিমল গুরুং নিয়ন্ত্রিত গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা এবং জিএনএলএফ৷ অন্যদিকে বিনয় তামাং নিয়ন্ত্রিত গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থিত তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী হলেন অমর সিং রাই৷

দার্জিলিংয়ে এবার বিজেপি-তৃণমূলের সমানে সমানে টক্কর৷ গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিমল গুরুং গোষ্ঠী বিজেপি প্রার্থীকে সমর্থন করছে বলে সরাসরি নির্বাচনে লড়াই করছে না৷ কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ বিনয় তামাং গোষ্ঠী প্রতীকসহ লড়াই করতে চেয়েও পারছে না৷ কারণ নির্বাচন কমিশনের রেকর্ড অনুযায়ী গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুং এবং সম্পাদক রোশন গিরি৷ সেক্ষেত্রে আদালতে মামলা লড়েও দলের প্রতীক হস্তগত করতে পারেনি বিনয়৷ ঘাসফুল প্রতীকেই তার প্রার্থীকে নির্বাচনে লড়াই করতে হচ্ছে৷

মোদীও বলেন, কিছু তৃণমূলের পে-রোলে থাকা কেউ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে৷ তাদের দিন শেষ৷ রাজনৈতিক মহলের অনেকেই বলছে, বিনয় তামাংকে উদ্দেশ্য করেই ওই কথা বলেছে মোদী৷ দার্জিলিংয়ে সিপিএম প্রার্থী সমন পাঠক৷ তাঁর বাবা প্রয়াত আনন্দ পাঠক দীর্ঘদিন পাহাড়ি রাজনীতিতে পরিচিত মুখ ছিলেন৷ দার্জিলিংয়ে রক্তাক্ত গোর্খা আন্দোলনের সময় থেকেই দার্জিলিং জেলার পার্বত্য অংশে আনন্দবাবু পরিচিত কাজে লাগিয়ে সিপিএম জমি খোজার চেষ্টা করেছে৷

বাবার পর বাম রাজনীতিতেই অংশ নেন পুত্র সমন৷ সাংসদও হয়েছিলেন৷ নেপালি-হিন্দি-বাংলাতে সাবলীল সমন পাহাড়ের ভূমিপুত্র৷ সম্প্রতি, দার্জিলিংয়ের প্রচারে গিয়ে নেপালি ভাষাতেই ভোট চান তিনি৷ সঙ্গে ছিলেন সীতারাম ইয়েচুরি এবং দার্জিলিং জেলা সিপিএমের সম্পাদক জীবেশ সরকার৷ উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল গত এক দশকে এই প্রথম দার্জিলিং শহরে সিপিএম সরাসরি প্রচার করতে পেরেছে৷ যদিও পাহাড়ি রাজনীতিতে মোর্চার আগ্রাসী গোর্খা আন্দোলনের সময় অন্যকোনও দল প্রকাশ্যে আসতে পারত না৷ শঙ্কর মালাকারকে দার্জিলিং কেন্দ্রের প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করে কংগ্রেস। যে পরিস্থিতিতে ঠিক হয়ে গিয়েছিল যে বাম-কং আসন সমঝোতা সম্ভব নয় তখনই দার্জিলিং কেন্দ্রে সমন পাঠককে প্রার্থী করেছিল সিপিএম।

কেন্দ্র জলপাইগুড়ি: এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী ড. জয়ন্ত রায় শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত মনোনয়ন দিতে পারবেন বলে আশা করেননি বিজেপি নেতা মুকুল রায়৷ কারণ সরকারি ডাক্তার জয়ন্তর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করছিল না রাজ্য সরকার৷ তবে শেষ পর্যন্ত তাঁর পদত্যাগপত্র নেওয়া হয়েছে৷ তিনি বিজেপির হয়ে লড়াই করবেন তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ী সাংসদ বিজয়কৃষ্ণ বর্মনের বিরুদ্ধে৷ বিজেপির দাবি, জলপাইগুড়ি তারা জিতবেই৷

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি এখানে জনসভা করে দিয়েছেন৷ ‘জনবিস্ফোরণ’ দেখে মঞ্চে দাঁড়িয়ে মোদী বলেন, ‘‘দিদির তো ঘুম উড়ে গেল৷’’ জলপাইগুড়িতে বিজেপির ইস্যু নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল এবং এনআরসি৷ বেআইনি বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী আটকাতে রাজ্য সরকার ব্যর্থ এবং অনুপ্রবেশকারীদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটব্যাংক বানিয়েছেন – দাবি বিজেপির৷

অন্যদিকে বিজেপির চালেই পালটা দিতে চাইছেন মমতা৷ অসমে এনআরসির জটিল পরিস্থিতি এবং নাগরিকত্ব বিলের ফাঁক ফোকর খুঁজে তিনি মোদীকে আক্রমণ করেছেন৷ জলপাইগুড়িতে বামপ্রার্থী সিপিএমের ভগীরথ রায় এবং কংগ্রেসের মণি কুমার ডারনাল৷ তবে সিপিএম-কংগ্রেসের ওই আসন জেতার সম্ভাবনা কতটা সেব্যাপারে নিশ্চিত নয় রাজনৈতিক মহল৷