সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : করোনা কাল। মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী ধর্মস্থান খোলার কথা বললেও দরজা খুলতে রাজি নয় দক্ষিনেশ্বর মন্দির কর্তৃপক্ষ। তাই আজ প্রতিষ্ঠা দিবসেও বন্ধই থাকল দক্ষিনেশ্বর মন্দিরের দরজা।

সাল ১৮৫৫সাল। ব্রিটিশ রাজত্ব তখন মধ্যগগনে। দেশময় বিদেশি পণ্য। বিদেশি সংস্কৃতির ছড়াছড়ি। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য এই দুই ভিন্ন সংস্কৃতির সংঘাত চলছে। কোথাও কোথাও এই দুই সংস্কৃতির মেলবন্ধনেরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ভারতীয়রা ঝুঁকছেন খ্রিষ্টধর্মের দিকে। এক নতুন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতির উদ্ভবের ফলে প্রবল সামাজিক ও ধর্মীয় অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এমন সময়ে রানি রাসমনি ৩১মে দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ করে দ্বার খুলে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের জন্য। ২০২০, আরও একটা ৩১মে। ১৬৬তম জন্মদিন দক্ষিণেশ্বরের দরজা বন্ধ রইল ভক্তদের জন্য। ভবতারিণীর করুণা থেকে বঞ্চিতই থাকলেন ভক্তরা, সৌজন্য করোনা।

একটু দেখে নেওয়া যাক এই বিখ্যাত মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। রানি রাসমনি ছিলেন দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর ব্যক্তিত্বে ও চরিত্রে অসাধারণ শক্তি, তেজস্বিতা ও দৃঢ়তার সমন্বয় অনেক ক্ষেত্রেই কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছে। তাঁর মন্দির নির্মাণ নিছকই ধর্মক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা নয়, মাতৃমুক্তির আন্দোলনের সর্বপ্রথম পদক্ষেপ। কলকাতার জানবাজার অঞ্চলের বিশাল জমিদারি এবং ভূ-সম্পত্তির মালিক ছিলেন রানি রাসমণি। বহু লোকহিতকর কাজের ফলে অল্পদিনেই হয়ে উঠেছিলেন প্রজাদের চোখের মণি।

সেবার রানি কাশী যাত্রা করবেন বলে ঠিক করেছিলেন, সব আয়োজন সম্পূর্ণ। যাত্রার পূর্বরাতে কালিকাদেবী জ্যোতির্ময়ী মূর্তিতে আবির্ভূতা হয়ে আদেশ দেন- “তোমার কাশী যাত্রার প্রয়োজন নেই, ভাগীরথীর তীরে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা ও ভোগের ব্যবস্থা করো। আমি ওই মূর্তিতে আবির্ভূতা হয়ে নিত্য পূজা গ্রহন করব।” ভাগীরথীর তীরে যেস্থান রাণির পছন্দ হল তার একদিকে ক্রিশ্চান কুঠি, অন্যদিকে মুসলমানদের কবরস্থান ও গাজি পীরের আস্তানা। স্থানটির আকৃতি কূর্মপৃষ্ঠের মতন। এমন স্থানই শক্তিসাধনার উপযুক্ত।

এখানেই দশ বছর ধরে রাণি গড়ে তুলেছিলেন তাঁর সাধের সাধনপীঠ, দক্ষিণেশ্বর। ৬০বিঘা জমির উপর এই মন্দির ও তার আনুষঙ্গিক ঘরবাড়ি গড়তে তৎকালীন ৯ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছিল। অনিন্দ্যসুন্দর মা ভবতারিণীর কষ্টিপাথরের মূর্তি তৈরী করেছিলেন বর্ধমান জেলার দাঁইহাটের অধিবাসী নবীন ভাস্কর।

দক্ষিণেশ্বরের নবরত্ন মন্দির বাংলার শিল্পকলার এক অপূর্ব নিদর্শন। মন্দিরের উচ্চতা একশো ফুট। গর্ভগৃহে কালো পাথোরের বেদির ওপর রুপোর প্রস্ফুটিত শতদল। চারকোণে রুপোর স্তম্ভ। মা এখানে বেনারসী শাড়ি পরিহিতা, ত্রিনয়নী শ্যামাকালী। সারাগায়ে অসংখ্য স্বর্ণরৌপ্য অলংকার। বামদিকের একটি হাতে নৃমুণ্ড ও অপরটিতে অসি। ডানদিকের দুটি হাতে বরাভয় মুদ্রা। পদতলে শ্বেতপাথরের শিব। বছরে তিনদিন বড় পূজা হয় দক্ষিণেশ্বরে। দীপান্বিতা, রটন্তী ও ফলহারিণী কালীপুজো। শাস্ত্রমতে কালীপুজো করতে যেসব উপাচার লাগে সবই থাকে শুধু থাকে না কারণ।

যেহেতু ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব কারণ ছাড়াই পূজা করতেন। মায়ের মন্দিরের উত্তরে রাধাকৃষ্ণদেবের মন্দির। উল্টোদিকে সারি দিয়ে বারোটি শিব মন্দির। তিন মন্দির তিন ধরনের স্থাপত্য। ভবতারিণীর নবরত্ন মন্দির, দ্বাদশ শিবমন্দির আটচালা মন্দির এবং রাধাকান্তের মন্দির ইউরোপীয় ধাঁচের। দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে রানি রাসমণি সফল করেছিলেন তাঁর সর্বধর্ম-সমন্বয়ের স্বপ্ন। শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মের এক মহামিলন তীর্থ।

ভবতারিণীর মূর্তি প্রতিষ্ঠার নিয়েও এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। মায়ের স্বপ্ন পান রাসমণি। আদেশ ছিল-‘যত শীঘ্র পারিস আমাকে প্রতিষ্ঠা কর।’ এরপর রানি ১৮৫৫সালের ৩১মে স্নানযাত্রার দিন মন্দিরে মায়ের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এসেছিলেন সমগ্র বাংলাে পণ্ডিতরা। মায়ের পূজক হয়ে আসেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। সঙ্গে এলেন ভ্রাতা গদাধর। কালের ইতিহাসে ঘটে গেল যুগান্তরকারী ঘটনা।

বিগত ১৬৬ বছর ধরে দক্ষিণেশ্বর মন্দির বাংলার ধর্ম ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে চলেছে। তখন ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ, রাসমণি, সারদা মা। ছিল খোলার চালের ঘর। ছিলনা শান বাঁধানো দালান, গঙ্গার ঘাট। গঙ্গার জোয়ারের সময় জল এসে আছড়ে পড়ত দ্বাদশ শিবমন্দিরের পিছনের দেওয়ালে। এখন গঙ্গার পাড় বাঁধিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। উঠানের উত্তর-পশ্চিমে রামকৃষ্ণদেবের ঘর-এখানেই তাঁকে ঘিরে রাখতেন তখনকার দিকপালরা। এই ঘরেই বিবেকানন্দ দেখেন তাঁর ধর্মগুরুকে। এখন তা সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে দর্শনের জন্য। অদূরেই নহবতখানা; সকাল-সন্ধে দুবার সানাইয়ের সুর ভাসিয়ে নিয়ে যেত মন্দির চত্বর। পরে এই নহবতই হয় সারদা মায়ের বাসস্থান, জীবন্ত শক্তিপীঠ। এখন সেখানে সারদা মন্দির। নহবতের পাশেই বকুলতলার ঘাট। শেষরাতে মা সারদা স্নান করতেন এখানে। এই ঘাটেই এসেছিলেন ভৈরবী যোগেশ্বরী, পরমহংসদেবের তন্ত্রসাধিকা। যে পঞ্চবটী রচনা করেছিলেন রামকৃষ্ণ স্বয়ং, সেখানে এখন বাঁধানো রাস্তা, সিমেন্টের বসার জায়গা। হারিয়ে গেছে সেই ঘন জঙ্গল যেখানে বাহ্যজ্ঞানলুপ্ত হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ সাধনা করতেন।

বর্তমানে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে তৈরী হয়েছে উন্নতমানের স্কাইওয়াক। যেই স্কাইওয়াক দিয়ে বহু মানুষ পৌঁছে যাবেন মায়ের মন্দিরে। বর্তমান এই উন্নত পরিষেবায় বহু মানুষ উপকৃত হয়েছে। মন্দিরের বছর পূর্তি উপলক্ষে বহু উন্নয়নমূলক কাজ করেছিল মন্দির কর্তৃপক্ষ। বাংলার ইতিহাসে ঐতিহ্যপূর্ণ মন্দির হিসাবে রাণি রাসমনির প্রতিষ্ঠিত মা ভবতারিণীর মন্দির আজও সমাদৃত।

কলকাতার 'গলি বয়'-এর বিশ্ব জয়ের গল্প