গবেষণা মূল তথ্য শুভদীপ রায় চৌধুরী 

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় , (অনুলিখন) : আজ স্নান পূর্ণিমার পুণ্যতিথি, আজকের দিনেই মহাপ্রভু শ্রীজগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা উৎসব পালিত হয় মহাসমারহে। তেমনি বঙ্গের দুই প্রাচীন কালীমন্দিরের বিশেষ পুজো হয় এই তিথিতে। এই তিথির মাহাত্ম্য এখানেই যে এই তিথিতেই প্রতিষ্ঠিত হয় কালীঘাটের সতীঅংশ আর প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী কালীমন্দির।

আজ স্নানযাত্রার পুণ্যতিথি, বঙ্গ সহ ভারতবর্ষের প্রাচীন মন্দিরের বেশকিছু প্রাচীন রীতিনীতি পালিত হয় এই তিথিতে। আজকের দিনে জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয় পুরী থেকে বঙ্গের বিভিন্ন জগন্নাথ মন্দিরে, ঠিক তেমনই আজকের দিনে কলকাতার কালীঘাট কালীমন্দিরে সতীঅংশের প্রতিষ্ঠা হয় একটি পট্টবস্ত্রের ওপর। ইতিহাসের সাক্ষী এই কালীঘাট কালীমন্দির, বহু ঐতিহাসিকদের মতে এই কালীক্ষেত্র নাম থেকেই কলকাতা নামের উৎপত্তি। আবার কেউ বলছেন, কালীঘাট-কালীঘাটা-কালীকোটা-কালীকর্তা-কালিকাত্তা থেকে কলকাতা বা কলিকাতা নামকরণ হয়েছে। পীঠমালা অনুসারে বেহালা থেকে দক্ষিণেশ্বর পর্যন্ত বিস্তৃত স্থান, যার ওপর বর্তমান কলকাতা দাঁড়িয়ে আছে, তা কালীক্ষেত্র নামে অভিহিত। চিৎপুরের চিত্তেশ্বরী, বউবাজারের ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি, ঠনঠনিয়ার কালীবাড়ি, পূর্ণদাস রোডে অবস্থিত মোনহর ডাকাতের কালী, বেহালার চণ্ডী, করুণাময়ীতলার করুণাময়ী এবং কালীঘাটের কালী থেকে বোঝা যায়, কলকাতা বহু প্রাচীন কালথেকেই কালীক্ষেত্র।

প্রসঙ্গত কালীঘাটের বর্তমান মন্দির তৈরি প্রসঙ্গে বহু ইতিহাস ও জনশ্রুতি রয়েছে। বড়িষার কেশব রায়, কালীর জন্য একটি ক্ষুদ্র ইমারত তৈরি করে দেন। তাঁর পুত্র সন্তোষ রায় ঐ ইমারতের স্থানে মন্দির তৈরি করে দেন, কারণ তৎকালীন সময়ে সন্তোষ রায় ছিলেন দক্ষিণবঙ্গের সমাজপতি। কিন্তু সন্তোষ রায় মন্দির নির্মান কার্য দেখে যেতে পারেন নি। সন্তোষ রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রামলাল রায় ও ভ্রাতুষ্পুত্র রাজীবলোচন রায় বর্তমান মন্দির নির্মাণের কাজ সমাপ্ত করেন ১৮০৯সালে। কালীক্ষেত্র দীপিকাকার বলেন- সন্তোষ রায় দক্ষিণবঙ্গের সমাজপতি ছিলেন। তাঁর সময়ে কলিকাতার তদানীন্তন প্রধান ধনী, বাবু কালীপ্রসাদ দত্ত কোন এক সামাজিক কার্যের জন্য দক্ষিণবঙ্গের ব্রাহ্মণদের আহ্বান করেন। সন্তোষ রায় বড়িশা, সরশুনা, বেহালা, কালীঘাট আরও বিস্তীর্ণ স্থান থেকে ব্রাহ্মণদের কালীপ্রসাদ দত্তের বাড়িতে পাঠান। ব্রাহ্মণ দক্ষিণা স্বরূপ কালীপ্রসাদ দত্ত ২৫হাজার টাকা প্রদান করেছিলেন, সাবর্ণরা মূলত ছিলেন ঘোর শাক্ত। কালীপ্রসাদ দত্তের প্রদত্ত সেই টাকা ব্রাহ্মণদের সাথে পরামর্শ করে সন্তোষ রায় কালীঘাটের মন্দির নির্মানে ব্যবহার করেন।

 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, একান্নটি সতীপীঠের মধ্যে কালীঘাট অন্যতম। এখানে সতীর ডান পায়ের চারটি আঙুল পড়েছিল বলে এই সতীপীঠকে বলা হয় “পাদপীঠ”। সতীর পদাঙ্গুলি নামে একখণ্ড প্রস্তর কালীহ্রদের কূলে এসে পড়েছিল দক্ষযজ্ঞের সময়ে। দীর্ঘকাল এটি লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিল। আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে কোন এক শুক্লা চতুর্দশীর রাত্রে এটি আবিষ্কার করেন আত্মারাম ব্রহ্মচারী। পরদিন ভরা পূর্ণিমায় শ্রীকৃষ্ণের স্নানযাত্রা তিথিতে এই প্রস্তরখণ্ডটি তিনি স্থাপন করে ব্রহ্মার বেদীর ওপর। প্রস্তরখণ্ডটির ওজন প্রায় ৬ কিলোগ্রাম। প্রতিবছর স্নানযাত্রার দিন এটিকে স্নান করানো হয়। বর্তমানে এটি রক্ষিত আছে একটি রূপোর সিন্দুকের মধ্যে। প্রস্তরখণ্ডটি সাধারণ ভক্তের দেখা নিষিদ্ধ। এই ভাবে বহু প্রাচীন রীতিনীতি মেনে আজও কালীর মন্দিরে সতীঅংশের স্নান করানো হয় পুণ্যতিথিতে।

 

রাসমণির দক্ষিণেশ্বর প্রতিষ্ঠা ও এই স্নান যাত্রার দিনেই। কীভাবে? ইতিহাস বলছে ভারতের তথা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র এই দক্ষিণেশ্বর মন্দির-যার প্রতিষ্ঠাত্রী পুণ্যশ্লোকা রাণি রাসমণি। ২৪৩ বঙ্গাব্দে (১৮৩৬ খ্রিঃ ৯ জুন) মাত্র ৫৩ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন রাসমণির স্বামী রাজচন্দ্র। তখন রাসমণির বয়স ৪৪ বছর। তারপরেই রাণি রাসমণির দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি এবং বৈধব্য জীবনের শুরু। তখনই রাণি রাসমণির লোকমাতা হয়ে ওঠার পদক্ষেপের সূত্রপাত বলে চিহ্নিত করা যায়। এর আগে রাসমণি তাঁর নিজের জন্মস্থান কৃমারহট্ট হালিসহরেও মন্দিরের জন্য জমির খোঁজ করেছিলেন। কুমারহট্ট হালিসহর ছিল প্রসিদ্ধ শাক্তভূমি। রাসমণি তাই তাঁর পিতৃভূমিতেই প্রথম মন্দির গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ প্রধান এই হালিসহরের গোঁড়া সমাজপতিরা তাঁর ইচ্ছের মান দেননি। রাসমণি দেবী তাঁর স্বামীর স্মৃতিতে দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির তৈরী করেন, যা তাঁর জীবনের সবথেকে উল্লেখযোগ্য কাজ। বাংলার ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ধারক বাহক এই দক্ষিণেশ্বর মন্দির।

 

রাণি রাসমণি মন্দির স্থাপনের জন্য বারাণসী সমতুল্য গঙ্গার পশ্চিমদিকে বালী, উত্তরপাড়া প্রভৃতি অঞ্চলে জমি সংগ্রহের চেষ্টা করেন, কিন্তু ঐ অঞ্চলের “দম আনি”, “ছয় আনি” জমিদাররা রাণির প্রচুর অর্থের বিনিময়েও কোন জমি বিক্রয় করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন নি। অগত্যা রানী রাসমণি গঙ্গার পূর্বখূলে দক্ষিণেম্বরে মন্দির নির্মান করেন।

 

জানা যায় সেবার রাসমণি দেবী অন্নপূর্ণা দর্শনে কাশীযাত্রার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। রাসমণি দেবীও জলপথে কাশীযাত্রায় স্থির করায়, সেই মতন ২৫ খানি নৌকা, ৬ মাসের উপযোগী দ্রব্যাদি, দাস-দাসী, দ্বারবান প্রভৃতি সঙ্গে নেসবার ব্যবস্থা করেন। এইভাবে ২৫টি বজরা প্রস্তুত করেন। পরের দিন কাশীযাত্রার সঙ্কল্প নিয়ে তিনি রাত্রে নিজের ঘরে শুতে যান। সেই রাতেই তিনি স্বপ্নাদিষ্ট হন। স্বপ্নে তাঁকে জগতজননী বলেন –“কাশী যাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই, ভাগীরথীর তীরে মনোরম স্থানে আমার মুর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা ও ভোগের ব্যবস্থা করো। আমি ঐ মূর্তিতেই আবির্ভৃতা হয়ে তোমার নিত্যপূজা গ্রহণ করবো।“ স্বপ্নাদেশের পর রানী শয্যা ত্যাগ করে তিনি প্রগাঢ় ভক্তিভরে জগন্মাতার উদ্দেশ্যে প্রণাম করেন এবং তাঁর আদেশ কাশীযাত্রা বন্ধ রেখে প্রতিমা তৈরীতে বদ্ধপরিকর হন এবং তাতে সফলও হন।

অনিন্দসুন্দর মা ভবতারিণীর কষ্টিপাথরের মূর্তি তৈরী করেছিলেন বর্ধমান জেলার দাঁইহাটের অধিবাসী নবীন ভাস্কর। দক্ষিণেশ্বরের নবরত্ন মন্দির বাংলার শিল্পকলার এক অপূর্ব নিদর্শন।। মন্দিরের উচ্চতা একশো ফুট। গর্ভগৃহে কালো পাথোরের বেদির ওপর রুপোর প্রস্ফুটিত শতদল। চারকোণে রুপোর স্তম্ভ। মা এখানে বেনারসী শাড়ি পরিহিতা,ত্রিনয়নী শ্যামাকালী। সারাগায়ে অসংখ্য স্বর্ণরৌপ্য অলংকার। বামদিকের একটি হাতে নৃমণ্ড ও অপরটিতে অসি। ডানদিকের দুটি হাতে বরাভয় মুদ্রা পদতলে শ্বেতপাথরের শিব। বছরে তিনদিন বড় পূজা হয় দক্ষিণেশ্বরে। দীপান্বিতা, রটন্তী ফলহারিণী কালীপূজো।শাস্ত্রমতে কালীপুজো করতে যেসব উপাচার লাগে সবই থাকে শুধু থাকে না কারণ। যেহেতু ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের কারণ ছাড়াই পূজা করতেন।মায়ের মন্দিরের উত্তরে রাধাকৃষ্ণদেবের মন্দির। উল্টোদিকে সারি দিয়ে বারোটি শিব মন্দির। তিন মন্দির তিন ধরনের স্থাপত্য। ভবতারিণীর নবরত্ন মন্দির, দ্বাদশ শিবমন্দির আটচালা মন্দির এবং রাধাকান্তের মন্দির ইউরোপীয় ধাঁচের। দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে রাণি রাসমণি সফল করেছিলেন তাঁর সর্বধর্ম-সমন্বয়ের স্বপ্ন। শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মের এক মহামিলন তীর্থ। ধর্মের এই তিন ধারাকে এককরা উদারতা হলেও এমন দুঃসাহসের কাজ সম্ভব হয়েছিল রাসমণির অতুলনীয় প্রতিভার জন্যই। মন্দির সম্পূর্ণ হওয়ার পর মূর্তি প্রতিষ্ঠার দিন খুঁজছিলেন রানী। এমন সময় মায়ের প্রত্যাদেশ-“যত শীঘ্র পারিস আমাকে প্রতিষ্ঠা কর।”

 

এরপরেই দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির নামেই প্রসিদ্ধ মন্দির নির্মান শুরু হয় ১৮৪৭-৪৮ সালে এবং সমাপ্তি হয় ১৮৫৪ সালে। এসে গেল দেবী প্রতিষ্ঠার দিন। অপরূপ সাজে সাজানো হল গোটা মন্দির চত্বর। বড়ো বড়ো ঝাড়বাতি দিয়ে মোহময়ী করে তোলা হয় বিশাল নাটমন্দির। দেবী বেনারসী পরিহিতা। দেবীর গলায় চিক, মুক্তোর সাতনরী হার, সোনার মুন্ডমালা। কানে কানপাসা, ঝুমকো চৌদানী। নাকে নথ ও নোলক। নীচের বামহাতে ধরা নৃমুণ্ড, উর্ধ্ব বামহাতে অসি, ডানহাতে বরাভয়। রাণিমা মনের মতন করে মাকে সাজিয়েছিলেন। এবার রাণি সংকল্পে বাধা পড়ল। সকল কাজ ঠিকমতো শেষ হওয়ার পর, রাসমণি যখন মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং দেবীকে অন্নভোগ দেওয়ার জন্য সচেষ্ট তখনও তিনি জাতিতে শূদ্র হওয়ায় সামাজিক প্রথা অনুযায়ী কোন ব্রাহ্মণই এমনকি রাণির নিজের গুরুদেবও মন্দির প্রতিষ্ঠা ও দেবীকে ভোগ দিতে রাজি হলেন না। সেইজন্য রাণি বিভিন্ন চতুষ্পাঠীর পণ্ডিতদের কাছে বিষয়টির শাস্ত্রনুযায়ী বিধান জানবার জন্য অনুরোধ করায় সবাই এই কাজকে অশাস্ত্রীয় বলেন। একমাত্র কলকাতার ঝামাপুকুর চতুষ্পাঠীর পণ্ডিত রামকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন প্রতিষ্ঠার আগে যদি কোন ব্রাহ্মণকে ঐ মন্দির দান করা যায় এবং সেই ব্রাহ্মণ যদি ঐ মন্দিরে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেন তবে তা অশাস্ত্রীয় হবে না। এই বিধান দেওয়ায় রামকুমারকে বহু গোঁড়া ব্রাহ্মণ অভিযোগ করতে শুরু করেন, সেই কথা তিনি গ্রাহ্য করতে রাজি ছিলেন না। সেই সময় রাসমণি রামকুমারকেই এই কাজ করার জন্য আহ্বান করেন, রামকুমারও সেই কাজে ব্রতী হর এবং অপরিণত কনিষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীরামকৃষ্ণ (তৎকালীন গদাধর) কে নিয়ে রাসমণির ইচ্ছানুয়ায়ী ১২৬২ বঙ্গাব্দের ১৮ জ্যৈষ্ঠ, বৃহস্পতিবার, স্নানযাত্রার দিন (১৮৫৫ সালে) মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়।

Proshno Onek II First Episode II Kolorob TV