স্বাগত ঘোষ: আপনি কী কিং রজার (রজার ফেডেরার) এবং নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট টিমের সমর্থক? তাহলে রবিবার রাতের শোক কাটিয়ে সোমবার সকালে অফিসে যাওয়াটা আপনার কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়কই বটে। আর রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় আপনি যদি জোকার (নোভাক জকোভিচ) আর মর্গ্যানব্রিগেডকে সমর্থন করে থাকেন, তাহলে সোমের সকালে রিফ্রেশমেন্টকে সঙ্গী করে অফিসে বসের বকুনি শুনতেও হয়তো মন্দ লাগবে না আপনার।

ভারত বিশ্বকাপ ফাইনালে নেই বলে তো আর ছুটির সন্ধ্যায় কফি মাগে চুমুক দিতে দিতে ফেডেরার-জকোভিচ দ্বৈরথ মিস করা যায় না। কিংবা সেমিফাইনালে গাপ্তিলের ম্যাজিক্যাল থ্রো ভারতকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিয়েছে বলে তো আর লর্ডসে ফাইনাল খেলতে নামা ইংল্যান্ড কিংবা নিউজিল্যান্ড কারও কৃতিত্বকেই খাটো করা যায় না। তাই দুই তুল্যমূল্য লড়াই দেখার অপেক্ষায় রবির সন্ধ্যায় ক্রীড়া অনুরাগীদের সব চোখ ছিল টেলিভিশনের পর্দায়। আর পরিবর্তে তারা যা পেলেন, তার জন্য ভুলে যাওয়া যায় সেমিফাইনালে কোহলির দলের চূড়ান্ত ফ্লপ শো।

অল-ইংল্যান্ড ক্লাবের সেন্টার কোর্টে নির্ণায়ক সেটে যখন ফেডেরার বা জকোভিচ কেউ কাউকে এক ইঞ্চিও জমি ছাড়ছেন না, উলটোদিকে তখন অভিজাত লর্ডসে প্রথমবার বিশ্বজয়ের স্বাদ পেতে মাটি কামড়ে লড়াই করছেন বেন স্টোকস-জোস বাটলাররা। বারদুয়েক তো ফেডেরার প্রায় কব্জা করেই নিয়েছিলেন তাঁর নবম গ্র্যান্ড স্ল্যাম। কিন্তু পঞ্চমবার অল-ইংল্যান্ড ক্লাবে খেতাব জয়ের লক্ষ্যে জকোভিচও ছিলেন অবিচল। সুইস-সার্বিয়ানের লড়াই দেখতে দেখতে অল-ইংল্যান্ড ক্লাবের তুলনায় কখনও কখনও ফিকে লাগছিল ঐতিহ্যের লর্ডসকে।

আরও পড়ুন: সুপার ওভারে জিতে লর্ডসে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড

কিন্তু ম্যাট হেনরি-ট্রেন্ট বোল্টের সামনে বেন স্টোকসের নাছোড় লড়াইও তখন সমানভাবে চোখ টানছে অনুরাগীদের। মহা ফ্যাসাদে ক্রীড়া অনুরাগীরা। কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবেন বুঝে উঠতে উঠতেই ফেডেরারের সামনে জোড়া ম্যাচ পয়েন্ট বাঁচিয়ে নির্ণায়ক সেট ১২-১২ তে নিয়ে গিয়েছেন জকোভিচ। অগত্যা টাই ভাঙার খেলায় বৃথা যাবে কারও অদম্য লড়াই, কেউ ফের বসবেন উইম্বলডনের মসনদে। নাহ, শেষ অবধি বছর বত্রিশের জোকারের কাছে মাথা নোয়ালেন বছর সাঁইত্রিশের ফেডেক্স। নবম উইম্বলডন খেতাব তথা ২১ তম গ্র্যান্ড স্ল্যামের অপেক্ষা আরও দীর্ঘায়িত হল সুইস কিংবদন্তির। অন্যদিকে টানা দ্বিতীয়বার সর্বমোট পঞ্চমবারের জন্য উইম্বলডন খেতাব জিতে অল-ইংল্যান্ড ক্লাবের সেন্টার কোর্টের মাটির স্বাদ পরখ করে নিলেন সার্বিয়ান জকোভিচ।

কাট টু লর্ডস। শেষ ল্যাপে স্টোকসের অদম্য লড়াই কী মাঠে মারা যাবে? ভারত ম্যাচের কার্বন কপি তুলে ধরে নিউজিল্যান্ডকে অধরা মাধুরী এনে দেবেন ফার্গুসন-বোল্টরা। চতুর্থবার ফাইনালে উঠেও গ্রাহাম গুচের ইংল্যান্ডের মতই তীরে এসে তরী ডুববে মর্গ্যানের ইংল্যান্ডের? এইসব ভাবতে ভাবতেই শেষ তিন বলে ইংল্যান্ডের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়াল ৯ রান। অন্তিম ওভারের চতুর্থ বল ডিপ মিড মিড উইকেটে ঠেলে দু’রানের চেষ্টায় স্টোকস। ব্যাট হাতে ব্যর্থ হলেও আগের ম্যাচের মত ফের সরাসরি থ্রোয়ে স্টোকসকে ফেরাতে উদ্যত হলেন তিনি। কিন্তু হায়! গাপ্তিলের থ্রো স্টোকসের ব্যাটে লেগে চলে গেল সীমানার বাইরে। ধর্মসেনা ছ’রানের সিগন্যাল দিতেই ইংল্যান্ডের প্রয়োজন দাঁড়াল ২ বলে ৩ রানে।

আরও পড়ুন: ম্যারাথন ফাইনালে ফেডেরারকে হারিয়ে উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন জকোভিচ

না, এরপরেও নির্ধারিত ৫০ ওভারে নিষ্পত্তি হয়নি বিগ ফাইনালের। অল-ইংল্যান্ড ক্লাবের অতি-নাটকীয়তা বজায় রেখে ঐতিহ্যের লর্ডসে মেগা ফাইনাল গড়ায় সুপার ওভারে। ক্রিকেট বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে যা প্রথমবার। ফেডেরার-জকোভিচের ম্যারাথন ফাইনালের রেশ ধরে লর্ডসের সুপার ওভারে গিয়েও টাই হওয়া ম্যাচ নিষ্পত্তি হয় বাউন্ডারির নিরিখে। উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে অন্যতম সেরা রাতের সাক্ষী রইলেন ক্রীড়া অনুরাগীরা।

তবে ম্যাচ শেষে মাঠেই গাপ্তিলের মূর্ছা যাওয়া কিংবা সবার প্রিয় কেন উইলিয়ামসনের ট্র্যাজিক হিরো রয়ে যাবার দৃশ্য বাতলে দিতে পারে বেদনার নয়া সংজ্ঞা। যদিও টুর্নামেন্ট সেরা কিউয়ি অধিনায়কই। তবু ৪ ঘন্টা ৫৭ মিনিটের লড়াই শেষে ফেডেরারের খালি হাত আর কেন উইলিয়ামসনের মন্দ ভাগ্য কোথাও সমার্থক হয়েই রয়ে গেল আর নিঃশব্দে বলে গেল ‘খেলার ময়দানও কোথাও যেন বড়ই নিষ্ঠুর’।