মালদহঃ বিএসএফের কমান্ডেন্টের বাড়িতে সিবিআই অভিযানের পরই রাজ্যজুড়ে সরগরম গরু পাচার। উঠে আসছে কুখ্যাত গরু পাচারকারী ও হাওলা টেডার এনামুল হকের নাম। এনামুলের হাদিস এখনও না পাওয়া গেলেও তার আরেক সহযোগী মালদহ-মুর্শিদাবাদ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই পাচারের কাজ দাপিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে হাজি মাস্তান ওরফে হুন্ডি হাজী।

এই খবর গত ছয় মাস আগেই সামনে আসে। আর সেই ঘটনায় এখন বাস্তবে সিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসছে। লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে কিভাবে এনামুল হক ওরফে খুদু মিয়া গরু পাচারের সিন্ডিকেট চালাচ্ছে তারই প্রমাণ। প্রসঙ্গত, যে বিএসএফ কমান্ডেন্ট সতীশ কুমারের বাড়ি তল্লাশি চালিয়েছে সিবিআই।

সেই বিএসএফ কমান্ড্যান্ট ২০১৭-১৮ সাল নাগাদ মালদহের বৈষ্ণবনগরের ৩৬ নম্বর ব্যাটেলিয়ানে কমান্ডেন্ট পদে কর্মরত ছিলেন। অন্যতম গরু পাচার প্রবণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত এই ৩৬ ব্যাটেলিয়ান। মালদহ জেলার বৈষ্ণবনগর থানার সব্দালপুর থেকে মুর্শিদাবাদ জেলা লালগোলা থানার খাণ্ডোয়া পর্যন্ত এর এলাকা ছিল।

বিস্তীর্ণ এলাকা কাঁটাতার হীন। সেই সময়ে মালদহের শোভাপুর,পারদেনা পুর মুর্শিদাবাদ জেলার নিমতিতা, চাঁদনী চক, খান্ডুয়া দিয়ে গরু বাংলাদেশে পাচার হত। এখনও একই কায়দায় পাচার হয়। তবে তার প্রবণতা অনেকটা কমেছে। ভরা বর্ষার সময় গঙ্গা নদী পার করে এই গরুগুলি বাংলাদেশের বাখের আলী, জহরপুর, জহুর টেক এই সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে যেত।

উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, বিহার ও ঝাড়খন্ড থেকে মূলত গরু নিয়ে আসা হয় বীরভূম জেলার ইলামবাজারে। সেখানে ছোট ছোট গাড়ি করে গরুগুলি মুর্শিদাবাদের নিমতিতার মহলদার পাড়া, ও মালদহের বৈষ্ণবনগর থানার চালাক পাড়া এলাকায় জমা করা হয়।

সেখানে গরু গুলির গায়ে বিভিন্ন দালালদের কোড নম্বর বসানো হয়। কোথাও লেখা থাকে নুর, কোথাও লেখা থাকে রামজান, আবার কোথাও বা কাজল আবার কোথাও কোথাও গায়ের নম্বর থাকে।

রাতের অন্ধকারে ভারতীয় ও বাংলাদেশী রাখালদের মারফত গঙ্গা নদী দিয়ে এই গরু গুলি বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাচার করে দেওয়া হয়। সেই বিএসএফের বহরমপুর সেক্টরে কর্মরত জিবিইউ ম্যাথু নামে এক কমান্ডেন্টকে কয়েক কোটি টাকা সহ দক্ষিণ ভারতের এর্নাকুলাম থেকে সিবিআই গ্রেফতার করে।

সেখানে জেরা করে উঠে আসে প্রথম কুখ্যাত হাওলা ট্রেডার গরু পাচারকারী এনামুল হকের নাম। পরে সিবিআই এনামুলকে গ্রেফতার করলেও সে জামিনে ছাড়া পেয়ে যায়। এরপর থেকে সে বেপাত্তা! প্রচুর তার সম্পত্তি। মুর্শিদাবাদ জেলায় কারখানা রয়েছে বেশ কয়েকটি। কলকাতায় প্রচুর সম্পত্তি রয়েছে।

তার তিন ভাগ্নে ওল্টু,বিল্টু,কাল্টু মারফত আরবের টাকা তার কাছে পৌঁছায়। ঠিক সীমান্তের ওপারে এনামুলের আরেক সহযোগী হাজি মস্তান এই কারবারের অন্যতম। এই কারবারের সাথে যুক্ত রয়েছে দুই দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাদের প্রশ্রয় এই কারবার চলে।

মালদহের বিজেপির সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, কোনও বিএসএফ আধিকারিক যদি গরু পাচারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে সিবিআই অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেবে তার বিরুদ্ধে। এতগুলো থানা পেরিয়ে সীমান্তে গরু গুলি এসে পৌঁছয়। পুলিশ প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন মদত না থাকলে, প্রশাসকগণের মদত না থাকলে এভাবে পাচার করা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে কংগ্রেসের জেলার সহ-সভাপতি কালী সাধন রায় বলেন, কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দল থাকবে। তাদের প্রশ্রয় ছাড়া কোন সময় গরু পাচার সম্ভব নয়। কয়েকজন বিএসএফের আধিকারিককে গ্রেফতার করে এই সমস্যার সমাধান হবে না বলেই মনে করেন এই কংগ্রেস নেতা।

সাধনবাবু বলেন, তিন ধরনের এই অপরাধের প্রথম হল পাচার আর দ্বিতীয় হল পশুদের উপর অমানবিক অত্যাচার। তিন নম্বর হলো ছোট ছোট নাবালকদের এই কাজে যুক্ত করা। কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দল থাকবে তারা যৌথ উদ্যোগে ব্যবস্থা না নিলে এনামুল হকের মতন ও হুন্ডি হাজির মতন আড়ালে আবডালে বসে সীমান্ত এলাকার গরিব মানুষের দারিদ্র্যেতার সুযোগ নিয়ে এই কারবার চালিয়ে যাবে।

যদিও বিজেপি কংগ্রেসের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তৃণমূলের মালদহ জেলার মুখপাত্র। তিনি বলেন, রাজ্যের শাসকদলের ও রাজ্য প্রশাসনের কেউ এর সঙ্গে যুক্ত নয়। কেন্দ্র সরকারের নিয়ন্ত্রিত সিবিআই যাদের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে তারা সবাই বিএসএফের অফিসার। বিএসএফ সক্রিয় থাকলে কোন ভাবে কোন গরু পাচার সম্ভব নয়।

প্রশ্ন অনেক-এর বিশেষ পর্ব 'দশভূজা'য় মুখোমুখি ঝুলন গোস্বামী।