ফাইল ছবি

মৌমিতা পোদ্দার, কলকাতা: একটা মহামারীর কোপ। যা বদলে দিয়েছে গোটা বিশ্বের স্বাভাবিক ছন্দটাকেই। ভেঙে দিয়েছে অর্থনীতির কোমর। থমকে গিয়েছে গতির চাকা। মারণ ব্যাধির থাবায় আজ পর্যদস্তু অবস্থা সারা ভূবিশ্বের লক্ষ, লক্ষ মানুষের।

গত বছর ডিসেম্বর মাসের শেষদিকে চিন থেকে শুরু হওয়া অদৃশ্য করোনার দাপট ধীরে-ধীরে গ্রাস করে ফেলেছে গোটা বিশ্বকে। পৃথিবী জুড়ে অব্যাহত করোনার কালো ছায়া। সংক্রমণ রুখতে চলছে দফায় দফায় লকডাউন। আর এই লকডাউনের কারণে রুটিরুজিতে টান পড়েছে অসংখ্য দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের।
আর এই অবস্থা শুধু অসহায় দিনমজুরদের নয়। লকডাউনের কবলে পড়ে চরম দুর্দশায় দিন কাটাছে সমাজের সবথেকে বেশী অবহেলিত এক শ্রেণীর মানুষেরা।

যারা শুধুমাত্র পুরুষের যৌন চাহিদা মেটাতেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ভোগ শেষে টাকার বিনিময়ে ছুঁড়ে ফেলা দেওয়া হয় ভোগ্যপণ্যটিকে। বাবুরা কখনও খোঁজ নিয়েও দেখেন না রক্ত মাংসের নীচে থাকা ওদের হৃদয়ের খবর। ফলে আজও সমাজের চোখে পতিতায় রয়ে গিয়েছে ওরা। যৌনপল্লির ঘরের চার দেওয়াল আর বাবুদের যৌন চাহিদা মেটানোয় যেন ওদের একমাত্র ভবিতব্য।

বাবুদের মনোরঞ্জনের চাহিদা মেটাতে তাঁদের কেউবা এখানে এসেছে স্ব-ইচ্ছায় আবার কেউবা টাকার কামানোর ধান্দায়। কিন্তু এই তিনমাস ব্যাপী লকডাউনের দিন গুলিতে কেমন আছে ওরা? করোনার সংক্রমণ এড়াতে এখন বাবুরাও পতিতাপল্লিতে ঢুঁ মারাও বন্ধ করে দিয়েছেন। যার ফলে দীর্ঘদিনের অভ্যাস আর রুটিরুজিতে কোপ বসিয়েছে করোনা নামের এক অদৃশ্য অতিমারী।

পনেরো বছর ধরেই এই যৌন পল্লির পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিল লায়লা(নাম পরিবর্তীত)। প্রতিদিন কম করে পাঁচ থেকে সাত জন খরিদ্দারও জুটে যেত। খরিদ্দারের দেওয়া টাকায় মাস গেলে ইনকাম হত প্রায় পঁচিশ ত্রিশ হাজার। কিন্তু করোনার ছোবলে সে সব এখন অতীত। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে পড়েছে ভাঁটা। সংক্রমণের ভয়ে আসেন না কোনও খরিদ্দার। ফলে এখন যেন মাছি তাড়ানোর উপক্রম লায়লার।

তবে শুধু এই অবস্থা লায়লার একা নয়। করোনার চোখরাঙানিতে একই অবস্থা কলকাতার সোনাগাছির প্রায় সাত হাজার যৌনকর্মীর।

অতি সম্প্রতি এই বিষয়ের উপর একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল, ‘ইয়েল স্কুল অফ মেডিসিন অ্যান্ড হার্ভাড মেডিকেল স্কুলের’ গবেষকরা। তাঁদের সেই গবেষণার রিপোর্টে উঠে এসেছে করোনা কারনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের যৌনপল্লির কর্মীদের দুর্দশার ছবি। সমীক্ষায় বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন,লকডাউনের কারণে ভারতের যৌনপল্লি গুলি একটানা বন্ধ রাখলে পরিস্থিতি কেমন হবে।

গবেষকরা জানিয়েছেন, টানা লকডাউন তুলে নেওয়ার পরও ভারতের মতো জনবহুল দেশের বিভিন্ন প্রান্তের যৌনপল্লির দরজা বন্ধ থাকবে। যার ফলে টানা ৩৬ দিনে সেখানে করোনার পরিস্থিতিও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

যদিও এই সব রিপোর্টে ধার ধারেন না সোনাগাছির যৌনকর্মীরা। দূর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সমরজিৎ জানারও এসবে কিচ্ছু যায় আসে না। করোনার কোপে কীভাবে খরিদ্দারে গমগম করা সোনাগাছির ছবিটা পালটে গিয়েছে তা নিজে চোখেই দেখছেন তিনি। শুধু তাই নয়, করোনার কারনে সোনাগাছির ছায়া এড়াতে ভার্চুয়াল সেক্সেই মজেছে অনেকে।

ভিডিও কল, অনলাইন চ্যাটেই আজ দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছেন বাবুরা। লকডাউনের প্রথম দিকে এই ভার্চুয়াল সেক্সের সংখ্যাটা কম থাকলেও দিন যত গড়িয়েছে ততই একঘেয়েমি কাটাতে অনলাইন সেক্সেই মজেছেন যৌনকর্মী ও খরিদ্দারেরা।এরফলে ঘন্টার পর ঘন্টা অনলাইন সেক্সে চ্যাটে মশগুল হয়ে পড়েছেন কলকাতার সোনাগাছির যৌনকর্মীরা।

দূর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির প্রেসিডেন্ট বিশাখা লস্কর বলেন, ” করোনা সংক্রমণের ভয়ে এখন সবাই শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে নারাজ। ফলে বেড়েছে ফোন সেক্সের চাহিদা। এখানের প্রায় ১৩০ জন যৌনকর্মীর মধ্যে ৯৫ জনই অনলাইন সেক্সে মজেছে।”

তিনি আরও বলেন, “এখন যা পরিস্থিতি তাতে আধ ঘন্টা ভিডিও চ্যাটের জন্য ৫০০টাকা।” আবার অনেকেই ব্যাংকের মাধ্যমেও অনলাইন মানি ট্রান্সফারও করছেন তবে এই সুযোগে অনেকেই আবার ঠকিয়েও দিছেন। কিছুটা আক্ষেপের সুরেই বললেন তিনি।

ওই মহিলা সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট মহাশ্বেতা মুখোপাধ্যায় বলেন,”নোট বন্দির সময়ও খুবই খারাপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল সোনাগাছির যৌনকর্মীরা। কলকাতার সোনাগাছিতে প্রায় সাত হাজার যৌনকর্মী রয়েছ। তবে লকডাউনের কারণে গায়েব হয়ে গিয়েছে তিন হাজার কর্মী। পেট চালাতে অন্য পথ খুঁজে নিয়েছেন তাঁরা।

মহাশ্বেতা মুখোপাধ্যায়ের কথায়, “যারা রয়েছে একসময় তাঁদের মাসিক আয় ছিল পঁচিশ ত্রিশ হাজার। লকডাউনে সে সব কবেই উধাও হয়ে গিয়েছে। সংসার চালাতে এখন ওরা শাকসবজি ফল বেচেই কোনওরকমে দিন গুজরান করছে। আর এদের মধ্যে যারা এখানেই রয়ে গিয়েছে তাঁদের সবসময় রেডি থাকতে হয় ভার্চুয়াল জগতে সেক্স চ্যাট আদান, প্রদানের জন্য।”

সব মিলিয়ে বলা চলে, দীর্ঘমেয়াদি লকাডাউনের কারণে চরম দূর্দশা নেমে এসেছে যৌনকর্মীদের জীবনেও। এই অবস্থায় সরকার তাঁদের দিকে মুখ তুলে না চাইলে অদূর ভবিষ্যৎ-এ আরও অশনীসংকেত বয়ে আসতে পারে পৃথিবীতে।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ