নিখিলেশ রায়চৌধুরীঃ  দিন দুই আগে একটি ইংরেজি সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছিল, মাদকাসক্ত ছাত্রদের নেশা ছাড়াতে পুলিশ নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে৷ মূলত, যারা সমাজে উচ্চশিক্ষার জন্য চেষ্টা করছে তাদের মধ্যে ড্রাগের নেশা খুব বেড়ে যাওয়ায় পুলিশ-প্রশাসন উদ্বিগ্ন৷ আর সে কারণেই তারা একটি নতুন পদক্ষেপের কথা ভেবেছে৷
ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি ম্যানেজমেন্টের মতো শিক্ষাক্ষেত্রে যারা জড়িত তাদের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা নতুন কোনও ঘটনা নয়৷

অন্তত কলকাতা তথা বাংলার ক্ষেত্রে তো বটেই৷ ব্যাপারটা অন্তত ১৯৭০-এর দশক থেকেই নিরন্তর ঘটে চলেছে৷ অনেক আগে, বিশেষ করে ঊনবিংশ শতকে এই ধরনের প্রবণতা কলকাতায় দেখা যেত৷ তখনও গাঁজা-আফিম, চণ্ডু-চরস থেকে শুরু করে মদ্যপান– সব নেশার অভিষেক ঘটত কলেজ এবং হস্টেলের হাত ধরে৷ যদিও তার পিছনে কিছুটা অ্যাডভেঞ্চার কাজ করত৷ কলেজে পড়তে এসে কীভাবে মধ্য কলকাতায় গুলিখোরদের আড্ডায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গিয়ে পড়েছিলেন, তার সরস বর্ণনা তিনি নিজেই দিয়ে গিয়েছেন৷ পরবর্তীকালে মদ্যপ ছেলের ইয়াং বেঙ্গলি ঘুসি খেয়ে কীভাবে বাবা অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন, সে কথাও হুতোম প্যাঁচার নকশায় লিখে গিয়েছেন কালীপ্রসন্ন সিংহ৷

কিন্তু সত্তরের দশক মুক্তির দশক বলে ধরে নিয়ে যে উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম মাদকাসক্তির পথ অনুসরণ করেছিল তাদের মাদকাসক্তির লক্ষ্যটা ঠিক কী ছিল সে কথা তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন৷ কারণ, এখনকার যে তরুণ প্রজন্ম ওই পথ ধরছে তাদের অনেকেরই বাপ-কাকা-জ্যাঠা ছিলেন সেই সত্তরের দশক মুক্তির দশকের নওজোয়ান৷ তাঁদের তো তরুণ প্রজন্মকে বোঝানো উচিত ছিল যে, এই ড্রাগের নেশা কতখানি সর্বনেশে৷
একটা সময় যখন প্রায় বেকার অবস্থায় কফি হাউসে আড্ডা মারতে যেতাম তখন অনেক ব্রিলিয়ান্ট উচ্চশিক্ষিত দাদার মুখেই শুনতাম, মাদকসেবন করলে নাকি মনোযোগ বাড়ে, রাত জেগে পড়তে সুবিধা হয়৷ যদিও এক সময় রেড়ির তেল কিংবা কড়া তামাক আর নস্যতেই যে সেই কাজ চলত, তা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিংবা স্বামী বিবেকানন্দের জীবনই বলে দেয়৷

আসলে, এক সময় যাঁরা মাদক নিতেন কিংবা সত্তরের দশক মুক্তির দশক বলে আগুন ছড়াতেন তাঁরা অনেকেই এখন বিদেশে কর্মরত এবং সফল৷ এমনকী তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এখনও প্রত্যক্ষে কিংবা পরোক্ষে মাদক সেবনে ছাত্রদলকে উৎসাহ জোগান৷ এদের কাঠগড়ায় তুলবে কে?

সত্তরের দশকে এই কলকাতায় যে মাদক সেবনের ধুম পড়েছিল তার পিছনে অনেকাংশেই ছিল পপ ও হিপি কালচার৷ এলএসডি-র তখন দারুণ রমরমা৷ বহু বছর বাদে, ২০০০ সালের পর সেই এলএসডি-কেই আবার ঘুরে আসতে দেখা যায় ভারতে৷ তবে সেটা মূলত বেঙ্গালুরু ও তার আশপাশে৷ তা নিয়ে ‘দ্য উইক’ পত্রিকার এক সাংবাদিক একটি অসাধারণ প্রতিবেদন লিখেছিলেন৷ যার শুরুটাই ছিল এ রকম৷ ভারতের উদীয়মান আইটি নগরীতে এক লাস্যময়ী প্রৌঢ়ার আবির্ভাব ঘটেছে৷ বহু বছর আগে সে ভারতের বড় বড় শহরে দাপটে রাজত্ব করেছিল৷ নতুন করে সেই লাস্যময়ী প্রৌঢ়ার ফিরে আসার পর দেখা যাচ্ছে– যৌবন অতিক্রান্ত হলেও সেই এলএসডি এখনও ছড়ি ঘোরানোর যথেষ্ট ক্ষমতা ধরে৷

এখন প্রশ্ন হল, সেই সত্তরের দশকের পর ওই মাদকের এদেশে আবার পুনরাবির্ভাব ঘটল ঠিক কোন পথে? বেঙ্গালুরু বহু দিন ধরেই এদেশে দাউদ ইব্রাহিমের নেটওয়ার্কের একটি উল্লেখযোগ্য ঘাঁটি৷ এক সময় দাউদের প্রিয় কোনও কোনও মক্ষিরানির বাংলো-বাগানবাড়ি ছিল বেঙ্গালুরুতে৷ এলএসডি-র পুনরায় উদয় হওয়ার পিছনে সে রকমই কোনও নেটওয়ার্ক ২০০০ সালের পরে কাজ করেনি তো?

মাদকের চোরাচালানের পথটা এমনই যে, একজন-দুজন পেডলারকে ধরে গোটা নেটওয়ার্ক খুঁজে বের করা দুষ্কর৷ বিদেশেও যেমন, এখানেও তেমন৷ মূল অপরাধী যারা তাদের দাপট এতটাই যে, এ নিয়ে তদন্ত এগলেই তারা প্রমাণ লোপাট করতে ইতস্তত করে না৷ আর সেক্ষেত্রে কাউকে মেরে ফেলা তো তাদের কাছে জলভাত৷
পুলিশ যদি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই মাদকাসক্তির প্রবণতা কমিয়ে আনতে উদ্যোগী হয়, সেটা অবশ্যই ভালো লক্ষণ৷ কিন্তু তারা কি এই মাদক চোরাচালানের লাইনটাকে একেবারে মুড়িয়ে ফেলতে পারবে? বিশেষ করে যেখানে এই মাদকের কারবারের সঙ্গে বিনোদন জগতের একটি বড় অংশের স্বার্থ জড়িয়ে আছে?

একটা সময় আফগান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যখন মাদক চোরাচালানের কারবার এশিয়া-ইউরোপে ফুলেফেঁপে উঠেছিল তখন তার রুটটি গিয়েছিল মধ্য এশিয়া হয়ে৷ তুরস্ক ছিল সেই চোরাকারবারের একটি বড় ঘাঁটি৷ অনেকটা প্রাচীন সিল্ক রুটের ধাঁচে৷ এখন নতুন করে যে মাদকের জাল ভারতে ছড়িয়েছে তা কোন দিক থেকে ঢুকে কোথায় কোথায় ছড়াচ্ছে সে সম্পর্কে জানলেও পুলিশ কি তার সবটা প্রকাশ্যে আনতে পারবে?

তারা হয়তো এখানে ওখানে কিছু ফাটল বন্ধ করতে পারবে৷ কিন্তু যা যা করলে এই লাইন চিরতরে বন্ধ হতে পারে, সেটা করার মতো ক্ষমতা যে তাদের নেই–পুলিশও সেটা জানে৷ মাদকের কারবার বন্ধ করতে ভারতে তো আর ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট দুতার্তের কায়দায় নিধনপর্ব চালানো সম্ভব নয়৷