শান্তনু পাঁজা, পর্যটন ব্যবসায়ী

আজ কলকাতা ২৪x৭ পোর্টালে একটা এমন কিছু নিয়ে লেখার আমন্ত্রণ পেলাম, যেটা একইসঙ্গে একটু আনন্দ আর একটু বেশি দুঃখ বয়ে নিয়ে আসল।

কিছু মাস আগে ইউরোপে ছিলাম। যেহেতু আমার একটি ট্যুর ট্রাভেলসের ব্যবসা আছে, তাই টুরিস্ট নিয়ে ইউরোপে আমাকে প্রায়ই যেতে হয়। আমার পার্সোনালি এই নিয়ে তিনবার ইউরোপ যাওয়া হলো। শুরু করেছিলাম ফ্রান্স থেকে আর শেষ করেছিলাম ইতালি দিয়ে।

সেই ইতালি এখন মৃত্যুপুরী-ওই দেশে আমার বন্ধুরা কেমন আছে-বলতে ভয় হয়। করোনাভাইরাস রুখতে লকডাউনের নির্জন বর্ধমানের রাতে ভয়টা আরো জড়িয়ে ধরে।

মাস কয়েক আগে দুবাই হয়ে যখন প্যারিস পৌঁছাই তখন সেখানকার সময় রাত ৮টা । ইমিগ্রেশন পর্ব শেষ করে এয়ারপোর্টের বাইরে বেরিয়ে দেখি মুম্বইয়ের ছেলে আমার খুব প্রিয় বন্ধু সইফ খান দাঁড়িয়ে। ওর সাথে আমরা প্যারিসের হোটেলে চলে গেলাম। সেই হোটেলে আমার আর এক বাংলাদেশি বন্ধু ফাহিমা নিপা জব করে।

প্যারিস। এই সাজানো গোছানো নগরীও করোনা আতঙ্কে জর্জরিত। আমি দেখেছিলাম জনচঞ্চল প্যারিস। বিভিন্ন দেশের প্রচুর লোকের ভিড়। হাসছে খেলছে, গল্প করছে। শুধু ইংরাজি বা ফরাসি ভাষী নয়। বিভিন্ন ভাষাভাষির জায়গা হল ইউরোপ।

আমরা ফ্রান্স ঘুরে বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ও সুইজারল্যান্ড পেরিয়ে ১০ দিন বাদে ইতালি ঢুকেছিলাম। আমার এই লেখাটির বিষয় হলো করোনা ভাইরাস অ্যাটাকের আগে ও পরে ইতালি।

দিনটি ছিল মে মাসের ২৩ তারিখ। সুইজারল্যান্ডের চিয়াসো শহর থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে ইতালির সীমান্ত পার করি দুপুরে। পা দিলাম বোলোগনা শহরে। জমজমাট শহর। কত লোক রাস্তায়। সবাই যে যার নিজের কাজে ব্যাস্ত।

একটা কথা বলি আগে, ইউরোপের বাকি দেশগুলোর মতো কিন্তু অতটা ঠাণ্ডা আবহাওয়া নয় ইতালির। বরঞ্চ একটু গরমই বলা যেতে পারে। জ্যাকেট খুলে দিতে হয় আমাদের।

ইতালিতে ঢোকার আগে আমাদের ট্রাভেলারদের একটি কথা পইপই করে বলে দিয়েছিলাম, যা হল ইতালিতে সব চেয়ে বেশি মাফিয়া আর পকেটমারের হম্বিতম্বি। তাই নিজের লাগেজ ও পাসপোর্ট সাবধানে রাখতে হয়।

ইতালির কোনো শহরে, বড় বাস বা টুরিস্ট গাড়ি ঢুকতে দেওয়া হয়না। ট্রাভেলারদের মোটামুটি হেঁটে বিভিন্ন শহর সফর করতে হয়। ইউরোপের বাকি শহরগুলিতে প্যারিস ছাড়া যেমন লোকসংখ্যা ঘনত্ব তেমন একটা বেশি নয়, ইতালির শহরগুলিতে কিন্তু ঠিক তার উল্টো। রাস্তায় ব্যাস্ততা চোখে পড়ার মতো। সাজানো গোছানো শহর। রেস্তোরাঁগুলো এতটাই সুন্দর যে চিন্তার বাইরে।

রাস্তার ধারে কেউ হয়ত গিটার নিয়ে গান গাইছেন, কেউ ড্রাম বাজাচ্ছে,কেউ পায়রাদের খাওয়াচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগই হাটছেন। জীবনের রূপ চঞ্চলময়। চঞ্চলতার ভাস্কর্য ইতালির ভগবান যেন কুঁদে কুঁদে তৈরি করেছেন। সেই ইতালি এখন স্তব্ধ। মৃত্যুর হিম ছোঁয়া তার সর্বত্র।

রাজধানী রোম থেকে ফ্লোরেন্সের দূরত্ব বেশি নয়। এক ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া যায়। সুন্দর শহর। জনসংখ্যার ঘনত্ব যদিও বেশি, তবে রোমের মতো অতটা ঘিঞ্জি নয়।

সান লোরেঞ্জো সেন্ট্রাল মার্কেট, মেডিসি চ্যাপেল, ব্যাসিলিকা অফ সান লোরেঞ্জো, পিয়াজা ডেল ডু মো, বারজেলো প্যালেস, স্ট্র মার্কেট, এবং দুর্দান্ত পিসা শহর-অসাধারণ সব যায়গা। সবাই ঘুরছে , হাসছে, সহ গল্প করছে- এক অসাধারণ জীবন শৈলীর চিত্র ধরা পড়ে। দেখে মনে হচ্ছে জীবনের আনন্দ যেন এরাই জানে।
আমার ইতালিয়ান বন্ধু মার্কাস সুবেরা সারাক্ষণ আমার সাথে ছিল। ও একটু বেশি বকে বটে, তবে তার আনন্দটাও আমাদের থেকে অনেকটা বেশি। এনজয় করতে পারে। মার্কাসের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ওর সাথেই থাকে। ও ডিভোর্সি। সীমান্তের বোলোগনা শহর থেকেই ও আমার পিছু ছাড়েনি।

যখন আমরা ব্যাসিলিকার সামনে পৌঁছলাম, মার্কাস দুটো খেলনা কিনল। জিজ্ঞাসা করাতে বলল, একটা ওর তিন বছরের মেয়ে লিসার জন্য আর একটা পাঁচ বছরের ছেলে মার্সেলোর জন্য। চোখে কতো স্বপ্ন ওর। বলছিল মেয়েকে পাইলট বানাবে। ছেলেকে ডাক্তার । মুখে সব সময় হাসি।

যাই হোক এরপর আমরা গোলাম পিসা। সেখানে আবার একটা দুর্ঘটনা ঘটল। আমার এক ট্রাভেলারের মানি ব্যাগ গেল চুরি। টাকা পয়সা ছিল, তবে পাসপোর্ট না থাকায় সেটা বেঁচে গিয়েছিল।

পরের দিন আমি মার্কাস আর সবাই মিলে গেলাম রোম কলেসিয়াম দেখতে। এর সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে রোমান যোদ্ধা মনে হচ্ছিল। মনে পড়ছিল গ্লাডিয়েটরদের সেই যুদ্ধের কথা। প্রচুর ভিড়। শুধু আমাদের মতো বিদেশি নয়, ইতালিয়ানরাও প্রচুর। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ঘুরছেন। হঠাৎ দেখি একটি ছেলে রাস্তার ধারে বসে ড্রাম বাজিয়ে চলেছে আপন মনে। জীবনের মানে এরাই জানে। এরাই পারে জীবনকে উপভোগ করতে।
সম্রাট ভেসপাসিয়ানের সময় তৈরি এই কলোসিয়াম। গ্লাডিয়েটর যুদ্ধ এখানেই হতো। থিয়েটারের জন্ম এখান থেকেই। তার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, পৃথিবী কীভাবে সৃষ্টি হলো।

সেখান থেকে আমরা চলে যাই ভ্যাটিকান সিটি। পৃথিবীর সব থেকে ছোট দেশ। খ্রিষ্টান ধর্মের পীঠস্থান। পোপ এখানেই থাকেন। প্রচুর লোক। লাইন দিয়ে ভিতরে ঢুকতে হলো। প্রাচীরে ঘেরা। অতি সুন্দর কারুকার্য ভ্যাটিকানের গির্জাগুলি। পরের দিন আমাদের যাত্রা শেষ।

এয়ারপোর্টে মার্কাস এসেছিল আমাকে বিদায় জানাতে । জড়িয়ে ধরল। স্বপ্ন মাখা চোখদুটো ছলছল করছিল বুঝতে পারলাম।

দু মাস আগে আমার শেষ ওর সাথে ফোনে কথা হয়েছে। এখন আর ওকে ফোনে পাই না। আমার বাড়ির লোক বলে, ও নাকি আর বেঁচে নেই। জানিনা লিজা ও মার্সেলো কেমন আছে।

টিভিতে দেখি ইতালির বিভিন্ন শহরের রাস্তা, রোমের রাস্তা, ফ্লোরেন্সের রাস্তা খাঁ খাঁ করছে। মানুষ নেই। মহামারি করোনার প্রকোপে ইতালির আজ শেষ দশা। প্রায় ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আমাদের কথা অনুযায়ী ওই দেশে হয়ত এত গাড়ি নেই, যত লাশ আছে।

বন্ধু সইদকে ফোন করেছিলাম। ও রোমেই থাকে। ওর কাকার রেস্তোরাঁ আছে। আমার কোনো ট্যুর
পেলে আমায় হেল্প করে। জানতে চেয়েছিলাম মার্কাসের কথা। কেমন আছে এখন ও,লিসা-মার্সেলো কেমন আছে…

সইদ বলল-দাদা আমি নিজে বাঁচতে ব্যাস্ত, মার্কাসের খবর নেওয়ার সময় নেই। অথচ ওরা দুজনেই খুব ভালো বন্ধু। ইতালির প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে হতাশা ব্যক্ত করেছেন যে তাদের দেশের চিকিৎসা পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে।

করোনা ছোবলে মার্কাসের সেই জনচঞ্চল ইতালি এখন মৃত্যুর দেশ। মার্কাসের খবর জানি না। পাইনি। করোনার জীবাণু যখন ঝিমিয়ে পড়বে, তার পরে যদি কোনোদিন ফের ইতালি যাই-আমি কি মার্কাসের হাসি দেখতে পাব, জানি না।

দ্রুত করোনা মুক্ত হোক দুনিয়া-এটুকুই বলতে পারি।