ফাইল ছবি

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: কালো স্কার্ফে মাথা ঢাকা৷ চোখে ছিল বিদ্যুৎ ঝলক ও আবেগের টান৷ আবেগটা অন্য খানে-তিনি ‘মাতৃভূমি’তে পাড়া দিতে পেরেছেন৷ ভিড়ে ঠাসা সাংবাদিক সম্মেলন কক্ষে তখন বাংলাদেশের সব সংবাদ মাধ্যমের ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছিলেন ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ অঞ্জু ঘোষ৷ ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিকেলে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি) কর্তৃক আয়োজিত সেই সাংবাদিক সম্মেলনে দীর্ঘ ২২ বছর পর তাঁকে ঢাকায় দেখা গিয়েছিল৷ বাংলাদেশের সর্বকালীন জনপ্রিয় বাণিজ্যিক ছবির নায়িকা এখন বিজেপির কর্মী৷ তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্কের জবাবে বিজেপির তরফে কলকাতায় জন্মের প্রমাণপত্র দাখিল করা হয়েছে৷ তাতে দেখা যাচ্ছে ১৯৬৬ সালে এই অভিনেত্রীর জন্ম৷

কিন্তু সেদিন অঞ্জু ঘোষ ঢাকার সেই সাংবাদিক সম্মেলনে খোলাখুলি জানিয়েছিলেন- “আমাকে যে এতদিন পর মনে রেখেছেন আমার অবাক লাগছে। আজকে যে আমি মাতৃভূমিতে পাড়া দিতে পেরেছি কোন উদ্দেশ্য নয়, কোন ছবি করতে আসা বা শিল্পীরা কেমন আছে তা দেখতেও নয়, আমার কাছে একটা তীর্থে পাড়া দেয়ার মতো উপলব্ধি হচ্ছে।”

আবেগতাড়িত ছিলেন তিনি-‘মাতৃভূমি’-তে ফেরার আবেগ তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়েছিল বারে বারে৷ প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের বহু চলচ্চিত্রের নায়িকা তিনি৷ একের পর এক মঞ্চ সফল অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত৷ তবু অঞ্জু ঘোষ বাংলাদেশ ছেড়ে এসেছিলেন৷ এখন থাকেন কলকাতায়৷ সম্প্রতি তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন৷ প্রশ্ন উঠেছে, একজন বাংলাদেশি নাগরিককে কেন বিজেপি টেনে নিল৷ বিজেপি নথি প্রকাশ করে দেখিয়েছে অঞ্জু ঘোষ বাংলাদেশি নন তাঁর জন্ম কলকাতায় ৷ কিন্তু ঢাকায় গিয়ে এই অভিনেত্রী বলেছিলেন মাতৃভূমিতে এসেছি৷ অন্য দেশকে কেন ‘মাতৃভূমি’ মনে করেন অঞ্জু ঘোষ তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হচ্ছে৷

অঞ্জু ঘোষ সম্পর্কে আগেই বাংলাদেশের একাধিক সংবাদ মাধ্যমে লেখা হয়েছে- তাঁর আসল নাম অঞ্জলি ঘোষ৷ জন্ম ফরিদপুরে৷ চট্টগ্রামে গিয়ে মঞ্চ সফল অভিনেত্রী হিসেবে সুপরিচিত হন তিনি৷ পরে চলচ্চিত্রে নামেন৷ আশির দশকে একের পর এক বাংলাদেশি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি৷ তবে সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর অভিনীত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ সর্বকালীন লাভদায়ক ছবি হিসেবে নজির তৈরি করেছে৷

লোকসভা নির্বাচনের সময় বাংলাদেশি অভিনেতা ফিরদৌস ও গাজি নুরকে নিয়ে প্রচারের অভিযোগ ওঠে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে৷ এই বিতর্কে বিজেপির যুক্তি ছিল ভিনদেশিদের দিয়ে কী করে ভারতে রাজনৈতিক প্রচার সম্ভব ? বিতর্কের জেরে তড়িঘড়ি দুই অভিনেতাকে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়৷ এবার অঞ্জু ঘোষের মতো অভিনেত্রীকে দলে টানায় তৃণমূল কংগ্রেসও বিজেপির বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগে বিঁধতে শুরু করেছে৷

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি অঞ্জু ঘোষ সম্পর্কে তথ্য দিয়ে দেখিয়েছে- তাঁর জন্ম কলকাতার একটি নার্সিং হোমে৷ আর গত বছর ঢাকার এফডিসি-তে সাংবাদিক সম্মেলনে অঞ্জু ঘোষ বলেছিলেন- দু’দিনের জন্য বাংলাদেশ ছেড়ে গিয়ে মায়ের অনুরোধে ও পারিবারিক কারণে সেখানেই থেকে যেতে হয়েছে। তিনি আরও বলেছিলেন, “কোন ক্ষোভ নেই, অভিমান নেই। আরে এটা তো আমার দেশ, এখান থেকে নি:শ্বাস নিয়ে গেছি ওখানে ছাড়ছি। আমি বাঙাল, ওখানে আমাকে এটা শুনতে হয়।”

ঢাকায় সেই সাংবাদিক সম্মেলনে অঞ্জু ঘোষের পাশেই ছিলেন ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ ছবির নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন৷ দীর্ঘদিন পরে তাঁর নায়িকার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আবেগতাড়িত ছিলেন ইলিয়াস৷ ১৯৮৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল সাড়া জাগানো এই ছবি৷ ইলিয়াস ও অঞ্জু অভিনীত ছবির পরিচালক তোজাম্মেল হক বকুল৷ পরে সেই ছবি ‘বেদের মেয়ে জোৎস্না’ নামে পশ্চিমবঙ্গেও প্রদর্শিত হয়৷ এখানে অঞ্জু ঘোষের বিপরীতে নায়ক ছিলেন চিরঞ্জিত৷ বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন অঞ্জু ঘোষ৷

ঢাকার সেই সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশের অন্যতম রাজেশ ফিল্মের কর্ণধার নাদের খান ইলিয়াস কাঞ্চন ও অঞ্জু ঘোষকে নিয়ে ‘জোছনা কেন বনবাসে’ শিরোনামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তাব রেখেছিলেন। সেই প্রস্তাবেও আবেগতাড়িত হয়েছিলেন অঞ্জুদেবী৷ ধরা গলায় সহমত জানিয়েছিলেন৷