প্রসেনজিৎ চৌধুরী: তিনিও কি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দুর্নাম কুড়িয়ে নেবেন ? অন্তত ত্রিপুরা পঞ্চায়েত নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে এমনই প্রশ্নে নীরব বঙ্গ বিজেপি। তিনি-বিপ্লব দেব। ‘চলো পাল্টাই’ স্লোগান দিয়ে দীর্ঘ দু দশকের বেশি চলা বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। ক্ষমতায় বিজেপি-আইপিএফটি জোট। বিরোধী হয়েছে বামেরা তথা সিপিএম।

এরপরেই আসে লোকসভা নির্বাচন। এই রাজ্যের মাত্র দুটি কেন্দ্রে বিরাট রিগিং ও ভোট লুঠের অভিযোগে ত্রিপুরা ফের উঠে এসেছিল জাতীয় রাজনীতির আলোচনায়। এবার ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন ঘিরে আরও একবার বিতর্কের কেন্দ্রে বিজেপি শাসিত বাংলা ও ককবরক ভাষীদের এই রাজ্য। বিরোধী বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের অভিযোগ, বিজেপি জবরদস্তি করে ভোট লুঠ করেছে। এর ফলে রাজ্যের মাত্র ১৪ শতাংশ আসনে ভোট হবে। যা গণতন্ত্রের পক্ষে বিরাট ধাক্কা।

ইতিমধ্যেই ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের প্রায় ৮৬ শতাংশ আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন শাসক জোটের প্রার্থীরা। ত্রিপুরার গ্রাম থেকে গ্রামান্তর এখন গেরুয়া রঙের প্রলেপ। এইখানেই অভিযোগ প্রবল। ত্রিপুরার বাম ও কংগ্রেস মহলের দাবি, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস যেভাবে গত পঞ্চায়েত ভোট লুঠ করেছিল, সেই একই কায়দায় বিজেপি ত্রিপুরায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মরিয়া।

খোদ মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব বারে বারে বিজেপির হয়ে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী জনসভা করেছেন। তুলোধোনা করেছেন মমতার। দাবি করেছেন নিজের রাজ্যে সুশাসনের। কিন্তু ত্রিপুরার বাস্তব ছবিটা অন্যরকম। নির্বাচন কমিশনের হিসেব বলে দিয়েছে সেখানেও মমতার ছায়া আঁকড়ে ধরে ভোট বৈতরণী পার হতে চান বিপ্লববাবু।
শনিবার এমনই পরিস্থিতিতে ত্রিপুরায় ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন। রাজ্য নির্বাচন কমিশনের তথ্য-

⦁ মোট ৬৬৪৬টি আসন। ৯৯৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে।
⦁ ৫৯১টি গ্রাম পঞ্চায়েতের ৬১১১টি আসন। ভোট হবে ৮৩৩টি আসনে।
⦁ ৩৫টি পঞ্চায়েত সমিতির আসন সংখ্যা ৪১৯টি। ভোট হবে ৮২টি আসনে।
⦁ ৮টি জেলা পরিষদের ১১৬টি আসন। ভোট হবে ৭৯টি আসনে।

এদিকে লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকেই একাধিক গ্রামে বিরোধীদের উপর হামলায় অভিযুক্ত বিজেপি। আগরতলা সংলগ্ন এলাকাতেও আক্রান্ত একদা বাঘ সিপিএম। আক্রান্ত কংগ্রেস। মৃত্যু হয়েছে কয়েকজনের। কোথাও কোথাও বিজেপির গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে ঝরেছে রক্ত।

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার কলকাতায় জানিয়েছিলেন- ত্রিপুরাকে গণহত্যার ল্যাবরেটরিতে পরিণত করা হয়েছে। ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা মহারাজা প্রদ্যোৎ কিশোর দেববর্মাও রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আর শরিক দল হয়েও লোকসভায় বিজেপির বিরুদ্ধে প্রার্থী দেওয়া আইপিএফটি প্রধান এনসি দেববর্মা বীতশ্রদ্ধ বলেই দাবি সরকারের অন্দরমহলে। তিনি রাজস্বমন্ত্রী। ফলে বিতর্ক বেড়েছে আরও।

সিপিএম দীর্ঘ দু দশকের বেশি ত্রিপুরায় শাসন চালিয়েছে। উঠেছে একাধিক অভিযোগ। কিন্তু মানিক সরকারের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ছিল তাদের বর্ম। নির্বাচনে পরাজয় হতেই দলের ভিতরেই শুরু হয় চাপা অসন্তোষ। সিপিএম নেতৃত্বের বক্তব্য, মনিকবাবু প্রধান বিরোধী নেতা। তিনি রাজপথেই আন্দোলন চালাচ্ছেন।

লোকসভা নির্বাচনের ফল গিয়েছে প্রত্যাশিতভাবেই বিজেপির অনুকূলে। রাজ্যের দুটি আসনেই জয়ী গেরুয়া প্রার্থীরা। তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, দুটি কেন্দ্রেই কংগ্রেস উঠে এসেছে দ্বিতীয় স্থানে। তিন নম্বরে নেমে গিয়েছে বামেরা। পঞ্চায়েত নির্বাচনেও কি একই ছবি ধরা পড়বে ? এই প্রশ্ন ঘুরছে আগরতলায় সিপিএম রাজ্য দফতর থেকে কলকাতার আলিমুদ্দিন স্ট্রিট ও দিল্লির একেজি ভবনে।  অন্যদিকে বিজেপির পক্ষে কাঁটা নির্বাচন বিহীন বিপুল জয়। পশ্চিমবঙ্গে যে কারণে বিজেপি বারে বারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেয়, সেই একই অভিযোগে বিদ্ধ হচ্ছেন বিপ্লব দেব।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)